২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দীপনের কাছে কে চলে যাবে, শুধু তার স্ত্রী না সভ্যতাও ? - স্বদেশ রায়

পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ তুলে দেয়া হচ্ছে, না জাতির কাঁধে, না সভ্যতার কাঁধে- গত ক’দিনে এর উত্তর খুঁজে পাইনি। দীপনের জীবনসঙ্গিনী যখন মৃতদেহ জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘আমি প্রমিজ করছি, আমি শীঘ্র তোমার কাছে চলে আসব।’ জানি না কোন সুস্থ মানুষ এ লাইন পড়ার পরে আর সুস্থ থাকতে পারে কিনা? দীপনের শোকাতুর স্ত্রীর এ কথা শুধু কি একজন জীবনসঙ্গিনীর কথা এ মুহূর্তে, না আরও কিছু? খুব শীঘ্র কি এ সমাজ থেকে দীপনের জীবনসাথী তার কাছে চলে যাবে, না সভ্যতাও চলে যাবে? চারপাশের সব কিছুই কি প্রমাণ করছে না পেঁচার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী আকাশ থেকে চাঁদ চলে যাচ্ছে। অন্ধকার নেমে আসছে পেঁচার শিকার ধরার সঙ্গী হিসেবে।

দীপনের মৃত্যুর পরে প্রকাশকরা অর্ধ দিবস তাদের প্রকাশনা সংস্থা বন্ধ রেখেছিলেন। কেউ কেউ বই পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু এর থেকেও ভয়াবহ সংবাদ প্রকাশ করে বিবিসি। সেখানে কয়েকজন প্রকাশক বলছেন, তারা বই প্রকাশ কমিয়ে দেবেন। একজন বলছেন, তার আশা ছিল এ বছর চল্লিশটি প্রকাশ করবে কিন্তু এখন বাস্তবতা দেখে মনে করছেন বিশটি বই প্রকাশ করবেন। আমলাতন্ত্রের বেড়াজালে পড়ে দেশে বিদেশী বই আমদানিতে নানান ট্যাক্স। যা বিদেশী বই আমদানিকে সীমিত নয়, একেবারে মাইক্রোসকোপিক পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। অর্থমন্ত্রী নিজে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি হয়ত আমলাদের কাছ থেকে একটি ‘সুচিন্তিত’ মতামত পেয়েছেন। কিন্তু আমলাদের মতো অত দেশপ্রেমিক বা সমাজ নিয়ে চিন্তা করার যোগ্য নই। তাই সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয়েছে অর্থমন্ত্রীর সৎ উদ্দেশ্য হেরে গেছে। বিদেশী বই সুলভে মেলার অর্থাৎ জ্ঞান আহরণের এ পথটি যে খুলবে ভবিষ্যতে- এ আশার প্রদীপ নিভে গেছে। বাকি ছিল দেশীয় বই। চাপাতির আঘাতে তা অর্ধেকে আসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

মানুষ কঠিন পাথর কেটে কেটে বই লিখে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে, গাছের বাকলে বই লিখে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে। সে কত লক্ষ বছর আগের কথা। আর এখন বই ছাড়া একটি সমাজ! মানুষের মনের ভিতর জেগে ওঠা সব প্রশ্ন, সব উত্তর খোঁজার আকাক্সক্ষা প্রকাশিত হয় যে মাধ্যমে সেই বই ছাড়া একটি সমাজ- সে কতটা ভয়ঙ্কর, কত অচেনা কালো অন্ধকার একটি রাত্রি! আর এ রাতের অবসান হতে যে কত সহস্র বছর লাগে- যদি সে রাত আসে! সে রাত আসার পদধ্বনি নয়, আকাশের কোনাজুড়ে সেই অচেনা অন্ধকারই নেমে এসেছে। আগের বেশ কয়েকটি হত্যা ও একজন দীপন হত্যাকে তাই কোন হত্যাকা- বলে দেখার আর কোন সুযোগ নেই। আসলে অচেনা এক অন্ধকার দিয়ে সমাজকে গ্রাস করার জন্যে বিশাল মুখের এক অন্ধকার গহ্বর এগিয়ে আসছে।

রাষ্ট্র ও সরকার সচেষ্ট হলে একজন দীপন হত্যার বিচার দ্রুত করতে পারবে। শুধু এই বিচার দিয়ে সভ্যতাকে গিলে ফেলতে যে অন্ধকার এগিয়ে আসছে তাকে কি ঠেকানো যাবে? যাবে না। সমাজকেই ঠেকাতে হবে এ অন্ধকারের ছায়ামূর্তির মতো ভয়াবহ জীবটিকে। কিন্তু তার আগে রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রমাণ করতে হবে তার অস্তিত্ব। ১ নবেম্বর শনিবার রাজধানীতে যা ঘটেছে, তা কিন্তু ওই দিনের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারের অস্থিত্বের ওপর অনেকখানি চ্যালেঞ্জ। এ সত্য রাষ্ট্র ও সরকারকে মানতে হবে। তা যদি না মানে তাহলে রাষ্ট্র সমাজ ভবিষ্যতে তার অস্তিত্বকে শক্তিশালী করতে সমস্যার মুখে পড়বে। আমেরিকায় ৯/১১-এ যা ঘটেছিল তা সেদিন আমেরিকার রাষ্ট্র, সরকার ও তাদের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ সিকিউরিটিকে শুধু চ্যালেঞ্জ করেনি, অনেকটা অর্থহীন বলে প্রমাণ করেছিল। বাংলাদেশেও ২০১৩ থেকে বার বার এভাবে রাষ্ট্র ও সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। আমেরিকায় যেমন আল কায়েদা প্রকাশ্যে করেছিল- এখানেও কিন্তু নানান নামে জামায়াত ও বিএনপি করছে। ১ নবেম্বর রাজধানী ঢাকায় যা ঘটল তা শুধু ধারাবাহিকতা মাত্র।

এখন প্রশ্ন, সরকার কেন পারছে না? ১ নবেম্বর রাজধানীতে যা ঘটেছে, এর পরে সরকার শতভাগ প্রতিরোধ করতে পারছে এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং সরকারের বিজ্ঞ আইনমন্ত্রী যে কথা বলেছেন তাই অনেকখানি সত্য। তিনি বলেছেন, সমাজে যে বিচার না পাবার একটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, এটাকে কাটিয়ে উঠে আমাদের বিচার পাবার নিশ্চয়তা দিতে হবে। সেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। আইনমন্ত্রী প্রকৃত বিষয়টি অনেকখানি তার আইনের ভাষার মতো করে খুব সংক্ষিপ্ত আকারে বলেছেন। কিন্তু তার এ কথাটি অনেক বিস্তৃত। কারণ, বাংলাদেশের সমাজে এই বিচার না পাবার সংস্কৃতি স্থায়ী হয়ে গেছে। এখান থেকে সমাজকে, রাষ্ট্রকে বের করে আনতে হবে। বিচার না পাবার এ সংস্কৃতি শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের ভিতর দিয়ে। ১৯৭৫-এর পনেরো আগস্টের হত্যা, ৩ নবেম্বরের জেল হত্যা, ৭ নবেম্বরের সেনাবাহিনীর অফিসার, তাদের স্ত্রী হত্যা, এর পরে ২১টি তথাকথিত সামরিক অভ্যুত্থানের নামে সেনাবাহিনী হত্যা, এয়ারফোর্স মেসে গণহত্যা থেকে শুরু করে ২০১৩ সালের পেট্রোলবোমা মেরে পুলিশ ও সাধারণ মানুষ পুড়িয়ে হত্যা থেকে শুরু করে আজ এ দীপন হত্যা, টুটুলদের ওপর আক্রমণ- সবই একটি ধারাবাহিকতা। আর এর আগে রয়েছে ১৯৭১-এর বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ মানুষ হত্যা।

১৯৭৫’র ১৫ আগস্ট থেকে এ হত্যাকা- শুরু হয় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে। বর্তমানে এ হত্যাকা-গুলো জামায়াত-বিএনপি তাদের জঙ্গী গ্রুপ দিয়ে করাচ্ছে। এখানে জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে অনেক বড় শক্তি আছে। এই বড় বড় শক্তি জামায়াত-বিএনপিকে সামনে রেখে এই যা করাচ্ছে তা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব যারা দিয়েছিলেন, তা তিনি বাংলাদেশের নেতা হন আর ভারতের নেতা হন- তাদের সকলকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করলে। সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যসহ লিখতে গেলে অনেক বড় আকারে লিখতে হবে। তাই বিস্তারিত এখানে নয়। তবে সত্য হলো, কেউ বেঁচে থাকতে পারেননি। তারা এই নেতাদের হত্যা করেছে শুধু প্রতিশোধ নেবার জন্যে নয়। এ ভূখ-ে তাদের আধিপত্য রাখার জন্যে। কারণ, বাংলাদেশ ইজ এ ল্যান্ড বেলেসড বাই জিওগ্রাফি। এর ভৌগোলিক অবস্থানই এ দেশকে অনেকটা আপনা মাংসে হরিণী বৈরী করে তুলেছে।

তাই ভূ-খ-ের ওপর তাদের আধিপত্য দরকার। এ জন্য তারা পঁচাত্তর থেকে ধারাবাহিক হত্যা করে চলেছে। নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করেছে। মেধাশূন্য করার চেষ্টা করেছে হত্যা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। বাঙালী ফিনিক্স পাখির মতো ভস্মের ভিতর দিয়ে জেগে ওঠে। তাই এখন তাদের মূল চেষ্টা বাঙালীর সমাজটাকে অচেনা অন্ধকার দিয়ে গ্রাস করা। আর বর্তমান নেতৃত্ব অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে ধ্বংস করা। যে কারণে শেখ হাসিনার যদি একটি হাত কাটা পড়ে তারা খুশি হয়। তাদের ভিতর বিজয়ের উদ্দীপনা জাগে। যেমন ছোট্ট একটি উদাহরণ, যেদিন সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেয়া হয়েছিল, সেদিন কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের মুখ উজ্জ¦ল হয়ে উঠেছিল। এরাই কিন্তু আফগানিস্তান, নাইজিরিয়া, সিরিয়ায় সভ্যতা ধ্বংস করার জন্যে নামিয়ে দিয়েছে তাদের সৃষ্ট শক্তিকে। বাংলাদেশকেও তারা বুঝেছে, এখানে সভ্যতাকে ধ্বংস করতে না পারলে পুরো আধিপত্য নেয়া যাবে না। যে কারণে তারা আমাদের সামাজিক চিন্তা ও আচরণের জগতসহ একটি সমাজের সার্বিক কাঠামোকে বদল করে দেবার মিশন নিয়ে নেমেছে। তেমনিভাবে তারা বদল করার কাজে নেমেছে মনোজাগতিক কাঠামোকে। সমাজ ও মনোজগতের যাবতীয় সুকুমার বৃত্তিগুলো, সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার চিন্তার স্নায়ুগুলোকে তারা ভোঁতা করে দেবার, নষ্ট করে দেবার কাজে নেমেছে।

যে কারণে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ বেড়েছে কিন্তু শিক্ষা এগোয়নি, বরং যে শিক্ষার মাধ্যমে সভ্যতা এগোয় তার ওপর আঘাত এসেছে। সংস্কৃতি এগোয়নি। বরং তাকে স্থবির করে রাখা হয়েছে। কারণ, তারা তো শুধু চাপাতি নিয়ে ঘুরছে না। তারা সরকারেও আছে, নীতি নির্ধারণীতেও আছে। তাছাড়া সোশ্যাল ও মেন্টাল ডেমোগ্রাফি বদলে যাওয়ায়, তারা অবচেতনভাবে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে লোভের কাছে, অর্থের কাছে- সাময়িক ক্ষমতার দম্ভ, অর্থহীন প্রচারসহ নানান স্থূল উপাদানের কাছে। এ নিয়ে বেশি লেখার নেই। সমাজের চারপাশে এমনকি নিজের মনকেও একটু গভীরভাবে বিচার করলে বোঝা যাবে কতটা বদলে গেছি আমরা।

আর এভাবে বদলে গেছি বলে দীপনের মৃতদেহ কিন্তু এ সমাজের কাঁধে খুব ভারবাহী হয়নি। যে হত্যাকা-ের ভিতর দিয়ে একটি সমাজে বই প্রকাশ অর্থাৎ জ্ঞান বিস্তারের মাধ্যম কমে যাচ্ছে, সে মৃতদেহ কিন্তু এ সমাজের কাঁধে খুব ভার চাপাতে পারেনি। যে ছিন্ন মস্তকের রক্ত সেই কীবোর্ডকে রক্তাক্ত করেছে যে কীবোর্ড জ্ঞানের প্রবাহকে সচল রাখে অথচ কিছু কিছু রাজনীতিকের কথা পরোক্ষভাবে ওই ছিন্নমস্তককে যেভাবে আরও আঘাত করেছে তা শুধু লজ্জার নয়, ভেবে দেখারও যে, সমাজ, মানসিকতা কোথায় যাচ্ছে?

আর কোন সমাজে যখন এই মৃতদেহগুলো পাখির পালকের মতো হাল্কা হয়ে যায়, পাহাড়ের মতো চেপে বসে না, তখন বুঝতে হবে ওই সমাজের অনেক স্নায়ু বিকল হয়ে গেছে। এই বিকল স্নায়ুর সমাজকে রক্ষা করতে প্রয়োজন অনেক বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের। অনেক বড় সামাজিক আন্দোলনের। কিন্তু সেই আন্দোলন শুরু ও তার নেতা কোনটাই দৃশ্যমান নয়, উঁকিও দিচ্ছে না। যদি শীঘ্র এর কোন কিছু উঁকি না দেয়, যদি এ আন্দোলন না হয়, তাহলে দেখা যাবে আরও অন্ধকার। যে অন্ধকারে বর্তমানে নাইজিরিয়ায় যে বইহীন, সুরহীন একটি সমাজ তৈরির পৈশাচিক নখ দেখা যাচ্ছে অমনি নখের দাপাদাপিই শুধু থাকবে। আর তারপর! তারপর বুড়ি চাঁদ যাবে বেনোজলে ভেসে। কেবল আঁধারই তখন জীবনের সবকিছু- যেমন পেঁচার। তাই এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন, শীঘ্রই দীপনের কাছে কে চলে যাবে, শুধু তার স্ত্রী না সভ্যতাও?

swadeshroy@gmail.com