২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবার পুলিশ হত্যা

আবার পুলিশ হত্যা
  • যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে এ হত্যা- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী;###;সিনেমার স্টাইলে হামলা

গাফফার খান চৌধুরী/সৌমিত্র মানব ॥ এক প্রকাশককে হত্যা এবং এক প্রকাশক ও দুই লেখককে হতাচেষ্টার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও একই কায়দায় বুধবার সকালে ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় দিনদুপুরে এক পুলিশকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। ২০১২ ও ১৩ সালে এমনিভাবে করা হয়েছিল পুলিশ হত্যা। মোটরসাইকেলযোগে ফিল্মি স্টাইলে হামলা চালানো হয়। হামলায় আহত হন ৪ পুলিশ সদস্য। ইতোপূর্বে গাবতলীতে চেকপোস্টে তল্লাশিকালে একই কায়দায় ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে। একের পর এক এমন ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে সতর্কতার বিষয়েও। সন্দেহভাজন ২ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই স্বাধীনতাবিরোধীরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে।

বুধবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে সাভারের আশুলিয়া থানাধীন নন্দনপার্ক এলাকার নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে ঘটনাটি ঘটে। ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের জন্য চেকপোস্ট বসিয়ে নন্দনপার্কের সামনে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ঢাকা জেলা পুলিশের অধীন আশুলিয়া থানা পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের সদস্যরা সেখানে সন্দেহভাজন যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি করছিলেন। শুভেচ্ছা হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টের সামনে মহাসড়কের চেকপোস্টে তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন শিল্প পুলিশের ৫ কনস্টেবল। এরা হচ্ছেন, মুকুল হোসেন, নুরে আলম সিদ্দিক, হারুনুজ্জামান, ইমরান ও ইমরান হোসেন। ঘটনাস্থলে আশুলিয়ার থানার এসআই একরাম হোসেনেরও দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। তিনি খানিকটা দেরিতে চেকপোস্টে পৌঁছান।

যথারীতি চেকপোস্ট চলছিল। ২টি মোটরসাইকেলযোগে ৩ জন করে ৬ জন চেকপোস্টের কাছে যায়। তারা মোটরসাইকেল দাঁড় করায়। তবে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বন্ধ করে না। তারা পুলিশ সদস্যদের কাছে রহিমকে তা জানতে চায়। আচমকা এমন প্রশ্নে মুকুল চট করে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। চোখের পলকে মোটরসাইকেল আরোহীরা চাপাতি দিয়ে প্রথমে মুকুলের ঘাড়ে ও বুকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এরপর নুরে আলমের হাতে ও বুকে একইভাবে ছুরিকাঘাত করে। পাশাপাশি অন্য পুলিশ সদস্যদের ওপরও একই কায়দায় হামলা চালায়। আচমকা এমন হামলায় পুলিশ সদস্যরা নিজেদের অস্ত্র ফেলে দৌড়ে শুভেচ্ছা হোটেলে ঢুকে পড়েন। এমন সুযোগে হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ফিল্মিস্টাইলে দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। আচমকা এমন ঘটনায় আশপাশের এলাকায় রীতিমতো ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। দ্রুত মানুষজন সরে যায়। মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে যায় আশপাশের সমস্ত দোকানপাট।

আহতদের চিৎকারে স্থানীয় জনতা ও পুলিশ দ্রুত তাদের উদ্ধার করে। প্রথমে তাদের স্থানীয় ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে তাদের সাভার এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মুকুলের মৃত্যু হয়।

নিহত মুকুল কৃষক পরিবারের ছেলে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর সংসারের হাল ধরতে প্রায় ৫ বছর আগে পুলিশে যোগ দেন। চার ভাইবোনের বড়। নিহতের বাড়ি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার রহবল পূর্বপাড়া গ্রামে। বুধবার রাতে পারিবারিক গোরস্তানে সমাহিত করার কথা রয়েছে মুকুলকে।

আহত এক সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন ২ জনের মধ্যে নুরে আলম সিদ্দিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

শিল্প পুলিশ-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাওসার শিকদার জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশুলিয়া ও সাভারের প্রত্যেকটি পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়তি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী চা দোকানি আবুল হোসেনসহ অনেকেই জানান, হামলার পর আহত পুলিশ সদস্যরা প্রায় ১০ মিনিট রাস্তায় পড়েছিলেন। হামলাকারীরা দু’টি মোটরসাইকেলে ছিল। একটি মেরুন ও আরেকটি কালো রঙের। আশুলিয়া থানার ওসি মহসিনুল কাদির বলেন, ঘটনাটি ঘটে পালাবদলের সময়। পালাবদলের সময় ছিল সকাল ৮টা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ হতাহতদের দেখার পর সাংবাদিকদের বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ও শাস্তিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য একটি জঙ্গীচক্র এ ধরনের অপতৎপরতা চালাচ্ছে। গত কয়েক মাসে ব্লগার-প্রকাশকদের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে, পুলিশের ওপর একই কায়দায় হামলা হয়েছে। মূলত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই স্বাধীনতাবিরোধীরা এমন নাশকতা চালাচ্ছে। চেকপোস্টে পুলিশ সদস্যদের পালাবদলের সময় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের নতুন দল গাড়ি থেকে নামার সময় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

পুলিশ কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ও তাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই এমন হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন নামে একই গোষ্ঠী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তারা কখনও আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, কখনও আইএস, কখনও বা আল কায়েদা ইত্যাদি নাম ব্যবহার করে অপকর্ম চালাচ্ছে। তারা আলাদা আলাদা নাম ব্যবহার করলেও আসলে এক।

অতিরিক্ত আইজিপি জাভেদ পাটোয়ারী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, ঢাকার গাবতলীতে পুলিশকে ছুরিকাঘাতে ও আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া এলাকার দু’টি ঘটনাই একইভাবে ঘটিয়েছে জঙ্গীরা। হত্যাকারীরা প্রশিক্ষিত। এ ব্যাপারে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফুল আজিম বলেন, হত্যাকারীরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। খুব দ্রুত তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় নাসির ও সাখাওয়াত নামে সন্দেহভাজন ২ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলী আমিনবাজার ব্রিজের ঢালে চেকপোস্টে ব্যাগ তল্লাশিকালে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় দারুস সালাম থানার এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে। হত্যাকা- শেষে পালানোর সময় গ্রেফতার হয় বগুড়া জেলার আদমদিঘী উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাথী মাসুদ রানা। হত্যাকারী কামাল একই উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি। ঘটনার পর থেকেই সে পলাতক। তাকে আজও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এমন ঘটনার পর গত ২৩ অক্টোবর রাতে পুরান ঢাকার হোসেনী দালানে বোমা হামলায় ২ জনের মৃত্যু ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত মাসুদ রানার তথ্যমতে, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে ৫টি হ্যান্ডগ্রেনেডসহ এক জামায়াত নেতা ও দুই শিবির কর্মী গ্রেফতার হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত গ্রেনেড ও হোসেনী দালানে ব্যবহৃত গ্রেনেড এক ও অভিন্ন। দুইটি ঘটনা একসূত্রে গাঁথা বলে তদন্তকারীরা দাবি করছেন।

এমন ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ৩১ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মাদপুর থানাধীন লালমাটিয়া সি ব্লকের ৮/১৩ নম্বর ৫ তলা বাড়ির চতুর্থ তলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুলি চালিয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল (৫০), লেখক এবং ব্লগার প্রকৌশলী তারেক রহিম (৪২) ও রণদীপম বসুকে (৪০) হত্যাচেষ্টা করা হয়।

প্রায় একই সময়ে রাজধানীর শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে (৪০) ঘাড় ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

তদন্তকারীরা বলছেন, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ-ে দ-িত করেন। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক প্রকৌশলী ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন, ওই বছরের ৯ মে বুয়েটের ছাত্রলীগ নেতা ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপ, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী লেখক ড. অভিজিত রায়, ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হাতিরঝিল বেগুনবাড়ীতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ, ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানে নিজ বাসায় ব্লগার নীলাদ্রী চ্যাটার্জী নিলয়, ৫ অক্টোবর ঢাকার বাড্ডায় বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা খিজির খানকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

এছাড়া ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্ব ত্রাণকর্তা দাবিদার লুৎফোর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিরসহ (৩০) ৬ জনকে ছুরিকাঘাতে ও গলা কেটে এবং ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে হত্যা করা হয়। এছাড়া সম্প্রতি গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা ও রংপুরে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে হত্যা করা হয়।

তদন্তকারীরা বলছেন, রাজীব থেকে শুরু করে সর্বশেষ সাভারে কনস্টেবল হত্যার ঘটনা একসূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনার পেছনে স্বাধীনতাবিরোধীরা ছাড়াও বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট।