২০ আগস্ট ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে কিলিং স্কোয়াড

  • পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের নীতি নির্ধারক মহলের সঙ্গে উর্ধতন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দীর্ঘ বৈঠক

শংকর কুমার দে ॥ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামানো হয়েছে উগ্রপন্থী ধর্মান্ধ জঙ্গী গোষ্ঠী জেএমবি, হুজি, হিযবুত, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ জঙ্গী সংগঠনগুলোর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত প্রশিক্ষিত কিলিং স্কোয়াড। প্রগতিশীল প্রকাশক, লেখক, ব্লগার তো বটেই, এমনকি লেখক, কবি, সাংবাদিক, অভিনেতা, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের কিলিং মিশনের টার্গেট। নাশকতা ও হামলার আশঙ্কায় বিমানবন্দর, কারাগার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের আলোচনা হয়েছে। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের আলোচনায় সরকারের বিরোধিতায় রাজনৈতিক কারণে কিলিং স্কোয়াডকে বিএনপি-জামায়াতের উগ্রপন্থী গ্রুপের মদদ দেয়ার অভিযোগ তুলে তা মোকাবেলার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, আতঙ্ক উদ্বেগ সৃষ্টি ও দেশ-বিদেশের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এসব ঘটনায় জড়িত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।

কিলিং স্কোয়াডের সদস্যদের চিহ্নিত করে হতাহত বন্ধের কার্যকর পথ খুঁজে না পেয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বুধবার আবারও রাজধানীর আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে কর্তব্যরত পুলিশ দলের ওপর হামলা চালিয়ে একই কায়দায় দুর্বৃত্তরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এক পুলিশকে খুন ও অপর পাঁচ পুলিশকে আহত করে মোটরসাইকেলযোগে উধাও হয়ে গেছে। এই ঘটনার পর সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উর্ধতন কর্মকর্তারা দীর্ঘ বৈঠক ও আলোচনায় মিলিত হয়েছেন। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের বৈঠকেও প্রশ্ন উঠেছে, হচ্ছেটা কী? এই অশুভ শক্তির মোকাবেলার উপায় কী? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দক্ষ ও পর্যাপ্ত সোর্সের অভাব, নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত অদক্ষতা, ব্যর্থতায় সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলও ত্যক্ত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ। সরকারের উচ্চপর্যায় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক ও আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সূত্রগুলো জানান, কোন বিচ্ছিন ঘটনা নয়, একই কায়দায় বুধবারও রাজধানীর আশুলিয়ায় পুলিশের চেকপোস্টে কর্তব্যরত পুলিশ দলের ওপর হামলা চালিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করার পর এক পুলিশ খুন ও আরও পাঁচ পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। যেই সব সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা কারা, তাদের প্রকৃত পরিচয় তা চিহ্নিত ও উদ্ঘাটনই করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দারা। মাত্র দুই দিন আগে একই কায়দায় রাজধানীর মোহাম্মাদপুরে তিন প্রকাশক, লেখক ও ব্লগারকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম ও শাহবাগে প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে খুন করেছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। রাজধানীর মোহাম্মাদপুরে ও শাহবাগের ঘটনার জের না কাটতেই আবারও রাজধানীর আশুলিয়ায় কর্তব্যরত পুলিশ চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে কুপিয়ে পুলিশ হত্যা ও জখম করার ঘটনায় পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত যৌথ ও পৃথক বৈঠকে একের পর এক হত্যাকা- ও হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানান, এর আগে রাজধানীর দারুস সালাম রোডে কর্তব্যরত এক পুলিশ কর্মকর্তাকে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং হত্যাকা- ঘটার সময়ে হাতেনাতে মাসুদ রানা নামে একজন জামায়াতÑশিবির কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার মেস থেকে গ্রেনেড, বিস্ফোরক দ্রব্যসহ উগ্র ধর্মান্ধ প্রচারণার লিফলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তার দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বলা হয়, তারাই হত্যা, হামলা, নাশকতার সঙ্গে জড়িত। জড়িতরাই যদি গ্রেফতার হয়, তাহলে ওই ঘটনার এক দিনের মাথায় আবার পুরান ঢাকার হোসেনী দালানের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময়ে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এই ঘটনা ঘটে কিভাবে? তাহলে গ্রেফতার করা হলো কাদের? এর আগে হত্যা করা হলো রাজধানীর গুলশানে ও রংপুরে দুই বিদেশীকে। হত্যার চেষ্টা করা হলো পাবনায় এক যাজককেও। কিন্তু বুধবার দিনের বেলায় প্রকাশ্যে কয়েকটি মোটরসাইকেলযোগে এসে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা রাজধানীর আশুলিয়ার চেকপোস্টে কর্তব্যরত একাধিক পুলিশের চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে খুন ও জখম করে চলে যাওয়ার ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় সরকারের ওপর মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, প্রগতিশীল প্রকাশক, লেখক, ব্লগার, ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর হামলা, খুনের ঘটনার পর আবার আল কায়েদার উপমহাদেশ শাখা আনসারুল্লাহ বা আনসার আল ইসলাম নামের জঙ্গী গোষ্ঠী দায় স্বীকার করে ট্যুইট বার্তায় বিবৃতি পাঠানো হচ্ছে। এসব ঘটনা দেশের চেয়ে বিদেশের সংবাদ মাধ্যম বিশেষ করে প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করার ঘটনা ঘটছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে দেশের ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা সম্ভব, তবে একটু সময়ের প্রয়োজন হবে।

পুলিশের এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, মৃত্যুদ-াদেশ সাজাপ্রাপ্ত দুই যুদ্ধাপরাধী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা চৌধুরী) ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ-াদেশ রায় কার্যকর করার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার পক্ষের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের ওপর হামলা হওয়ার আশঙ্কা থেকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা করছি, যা ইতোমধ্যেই মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীর বিচার বন্ধ, বিচারের রায় ঘোষণার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা, ফাঁড়ি ও অস্ত্র লুট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ হামলা ও নাশকতা চালানোর ঘটনা যেভাবে মোকাবেলা করা হয়েছে। মোকাবেলা করা হয়েছে বিগত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বন্ধ ও বাতিলের দাবিতে পেট্রোলবোমার আগুন লাগিয়ে হত্যা, নাশকতার ঘটনাও। একটু সময় নিলেও সম্প্রতি প্রগতিশীল প্রকাশক, লেখক, ব্লগার, পুলিশ হত্যা, তাজিয়া মিছিলে গ্রেনেড হামলার ঘটনার মোকাবেলা করা হবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলের একজন বলেন, রাজধানীর আশুলিয়ায় কর্তব্যরত পুলিশ খুন ও জখমের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলেও পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সমালোচনা করে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ও গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা কোন ঘটনা ঘটলেই ফাঁপা বুলি আওড়ায় আর সরকারের নীতি-নির্ধারক মহলে তোষামোদ, তদ্বির করে নিজেদের গা বাঁচিয়ে এমনভাবে কথা বলে চলছেন যেন, অপরাধী-দুর্বৃত্তদের ধরে ফেলা হচ্ছে, সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাচ্ছে। তারপরই দেখা যাচ্ছে, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে একের পর এক হত্যা, হামলা, নাশকতার ঘটনা ঘটিয়ে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আর ধরাও পড়ছে না। একের পর এক এসব ঘটনা ঘটলেও একই গোষ্ঠী কাদের নির্দেশে কারা এই ধরনের কিলিং স্কোয়ার্ড নামিয়ে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সামর্থ্যরে অভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তার প্রশ্নটি তোলা হচ্ছে। তবে এসব ঘটনা মোকাবেলা করতে একটু সময় নেবে, তবে কিলিং স্কোয়াডের হতাহতের ঘটনা বেশি দিন টেনে নিয়ে যেতে দেয়া হবে না।