১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শুদ্ধস্বরে হামলার ঘটনায় ভবনের ৩ জন নজরদারিতে

  • দীপনের ঘাতকদের শনাক্তের চেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলার ঘটনার সঙ্গে বাড়ির ৩ জনের যোগসূত্র থাকতে পারে। সন্দেহভাজন ৩ জনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। হামলার সময় ওই বাড়িতে শতাধিক মানুষের উপস্থিতি ছিল। এত মানুষের মধ্যে হামলার পর হামলাকারীদের নির্বিঘেœ পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি রীতিমতো সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। বাড়ির কেউ হামলায় এবং হামলাকারীদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করতে পারে। এমন সন্দেহের তালিকায় রয়েছে বাড়ির ওই ৩ জন। তাদের গতিবিধির ওপর বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। বুধবার ওই বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

একই দিন জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফীন দীপন হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে তৎপরতা চলছে। তবে তদন্তকারীরা বলছেন হত্যাকারী হিসেবে এখন পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত বা আটক করা যায়নি বলে তদন্তকারীদের দাবি। এদিকে দীপনের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম ফজলুল হককেও মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। বুধবারও প্রকাশক দীপন হত্যা এবং প্রকাশক ও দুই লেখকের ওপর হামলায় ঘটনায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে প্রকাশকরা। তারা সন্দেহভাজন হত্যাকারী হিসেবে ৬ জনের বিষয়ে সন্দেহ করছেন বলে দাবি করেছেন।

গত ৩১ অক্টোবর দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন লালমাটিয়া সি ব্লকের ৮/১৩ নম্বর ৫তলা বাড়ির চতুর্থ তলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুলি চালিয়ে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল (৫০), লেখক এবং ব্লগার প্রকৌশলী তারেক রহিম (৪২) ও রন দীপম বসুকে (৪০) হত্যার চেষ্টা করা হয়।

প্রায় একই সময়ে রাজধানীর শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে (৪০) ঘাড় ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। দুই ঘটনা ঘটানোর পরে দুটি জায়গায়ই হামলাকারীরা বাইর থেকে তালা লাগিয়ে চলে যায়।

শুদ্ধস্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যাকা-ের শিকার মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা লেখক, প্রকৌশলী ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক অভিজিত রায়ের লেখা ‘সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ ও ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ এবং দীপনের মালিকানাধীন জাগৃতি প্রকাশনী থেকে একই লেখকের লেখা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামক বইটি প্রকাশিত হয়।

সরেজমিনে মোহাম্মদপুরের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িটিতে যে কেউ অনায়াসে যাতায়াত করতে পারে। দুটি গেট প্রায় সময়ই খোলা থাকে। মূলত দুটি বাড়ি এক জায়গায় তৈরি করা হয়। দুই ভাই আজহারুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম মালিক। তাঁরা বাড়িতে থাকেন না। বাড়ি দুটির সার্বিক দায়িত্বে রয়েছে দুজন কেয়ারটেকার। যাদের কেউই ঠিকমতো বাড়িতে বসবাস করেন না। উত্তর দিকের যে বাড়িটিতে ঘটনাটি ঘটেছে সেটির মালিক রফিকুল ইসলাম। ৫ মাস আগে তাঁর বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাবুল শিকদারকে (৪৭)। তিনি ২ মাস ধরে তারই ছেলে আল আমিনকে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। তাদের বাড়ি বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া থানাধীন বাসাইল গ্রামে।

আল আমিন (২০) জনকণ্ঠকে বলেন, ঘটনার সময় আমি ছাদে ট্যাঙ্কিতে পানি ভরছিলাম। তখন দুপুর সোয়া ২টা থেকে আড়াইটার মত্ োবাজে। আচমকা নিচ থেকে চিৎকারের শব্দ আসতে থাকে। নিচে কোচিং সেন্টারের ছেলেমেয়েরা চিৎকার-চেঁচামেচি করতে পারে ভেবে বিষয়টি তেমন আমলে নেইনি। একটু পরে একজন জানালা দিয়ে রক্তাক্ত হাত বের করে পাশের বাড়ির বাসিন্দাদের তাদের বাঁচানোর জন্য কাকুতি মিনতি করেন। চারতলায় গিয়ে দেখি, দরজায় একটি চাইনিজ তালা দেয়া। ভেতর থেকে বাঁচানোর জন্য কাকুতি মিনতি করা হচ্ছিল। এ সময় পুলিশকে খবর দেয়ার প্রস্তুতি নেই। পরে পুলিশের সহায়তায় দরজা ভাঙ্গা হয়। দেখা যায়, দুজন চেয়ারে বসে আছেন। তারা রক্তাক্ত। অপরজন নিচে ফ্লোরে লাল সোফার সামনে পড়ে আছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আল আমিনের দাবি, আমি কোন হামলাকারীকে দেখিনি। আগৈলঝাড়া ও রায়েরবাজার এতিমখানায় পড়াশোনা করেছি। তবে ভাল করে পড়াশোনা করতে পারিনি। পড়াশোনা না করায় মামার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় দোকানদারি করে বেড়াই। তার মামা বিভিন্ন মেলায় শুকনো কেক, বিস্কুট বিক্রি করে থাকেন।

পিতার অবর্তমানে আমি ২ মাস ধরে বাড়িটিতে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছি। আল আমিনের পিতাও এমনটাই দাবি করেছেন। ঘটনার আগে বা পরে ওই বাড়িতে সন্দেহভাজন কোন লোকের ঘোরাফেরাও তাদের চোখে পড়েনি।

বাড়িটির ছাদে বসবাসকারী ইজাজ (৩০) জনকণ্ঠকে বলেন, তিনি চিৎকার শুনে সেখানে যান। পরে আহতদের পুলিশের সঙ্গে থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। এর বেশি তিনি আর কিছুই জানেন না। তিনি তেমন পড়াশোনা করেননি। মাদ্রাসা লাইনে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর ওই বাড়ির অদূরেই টেইলার্সের দোকান দিয়েছেন।

বাড়িটির নিচতলায় থাকা ঘটনাস্থলের অদূরে মিনার মসজিদের খাদেম সবুজ (৩০)। ঘটনার সময় তিনি বাসায়ই ছিলেন না। ঘটনার পর তিনি লোকমুখে শুনে বাড়ি গিয়ে বিষয়টি জানতে পারেন।

ওই বাড়িতে মিনার মসজিদ ও এতিমখানার একজন শিক্ষকও বসবাস করেন। ফারুক নামের ওই শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িটিতে ২টি কোচিং সেন্টার ও অন্তত ১০-১২টি বিভিন্ন অফিস রয়েছে। কোচিং সেন্টারে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অন্তত ৮০ জন। এ ছাড়া বাড়িতে কয়েকটি পরিবার বসবাস করে। সব মিলিয়ে বাড়িতে ঘটনার সময় শতাধিক লোক ছিল বলে কেয়ারটেকার আল আমিন জানান।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এত মানুষের উপস্থিতির মধ্যে হামলা এবং হামলার পর হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে বাড়ির লোকজনের যোগসূত্র থাকা বিচিত্র নয়। তারা বাড়িটিতে বসবাসরত ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। বেশ কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা সন্দেহের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।

আর দীপন হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে সংগৃহীত সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অনেককেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে দুটি ঘটনা প্রায় একই সময়ে ঘটানো হয়েছে। নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচিত সংবাদ