১৮ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিন

  • দীপন হত্যার বিচার দাবিতে রাজধানীতে বিভিন্ন প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি আহ্বান ;###;আজ গণজাগরণ মঞ্চের কফিন মিছিল, কাল প্রজন্ম চত্বরে সমাবেশ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ প্রকাশক, লেখক, ব্লগারসহ একের পর এক মানুষ হত্যা ও হামলার ঘটনায় রাজধানীসহ সারাদেশে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। সকল কর্মসূচী থেকেই উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর আক্রমণ মোকাবেলায় সকলের ঐক্যবদ্ধ থাকাও জরুরী বলে মনে করেন তারা। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে পৃথক পৃথক কর্মসূচী থেকে। এদিকে প্রকাশক হত্যা ও লেখকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে কফিন মিছিল করবে গণজাগরণ মঞ্চ। আগামীকাল শুক্রবার প্রজন্ম চত্বরে সমাবেশের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

নারী সাংবাদিক কেন্দ্র ॥ জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলসহ তিন লেখক-প্রকাশকের ওপর হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্র। বুধবার রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সমাবেশে এ দাবি জানানো হয়। সংগঠনের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনুর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএফইউজে’র সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি ড. মাহফুজা খানম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব মীর, আকতার জাহান প্রমুখ। বক্তারা বলেন, একাত্তরে এদেশের সৃষ্টিশীল মানুষদের হত্যা করা হয়েছিল। বর্তমানে তরুণদের সৃষ্টিশীল কর্মকা- রুখতে তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। এভাবে সমাজ চলতে পারে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিক্রিয়াশীলদের রুখতে হবে। এ সময় প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা।

শাবিতে মিছিল সমাবেশ ॥ প্রকাশক ও লেখকদের ওপর হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালিত হয়েছে। এতে অংশ নিয়ে অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেছেন, ব্লগার-লেখক-প্রকাশক হত্যাকারীদের ধরতে সরকার নির্লিপ্ত। এ ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষকদের’ র‌্যালি ও সমাবেশে তিনি আরও বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না, আমাদের সরকার এত নির্লিপ্ত কেন। এ ব্যাপারে আমাদের কারও কোন সন্দেহ নেই যে, সরকার এদের ধরার ব্যাপারে আন্তরিক না। যদি আন্তরিক হতো, তবে সরকার এদের ধরতে পারত।

অভিজিত থেকে শুরু করে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের কাউকেই ধরতে পারেনি সরকার। আমি এটাকে বিশ্লেষণ করি এভাবে যে, কোন একটা কারণে সরকার মনে করে এদের ধরার দরকার নেই। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তারা হচ্ছে ব্লগার। ব্লগার শব্দটা একটা অভিশপ্ত শব্দে পরিণত হয়েছে। সরকারের মনোভাবকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা (ব্লগার) হচ্ছে নাস্তিক, কাজেই, তারা তাদের নিজেদের দোষে মারা যাচ্ছে। আমি কেন (সরকার) তাদের ধরে খামাখা ওদের (সন্ত্রাসী) বিরাগভাজন হব।’ এটাই হলো আমাদের সরকারের সেন্টিমেন্ট। সরকার আন্তরিক না, সরকার আন্তরিক হলে কখনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতেন না এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

একই দিনে, একই সময়ে দুইজন প্রকাশককে আক্রমণ করা হয়েছে, এরপরও এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেন কিভাবে। হয় আমি বিচ্ছিন্ন’র মানে জানি না, নাহলে উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) বিচ্ছিন্ন’র মানে জানেন না।

আমার একটাই অনুরোধ, সরকার যদি চায় তবে হত্যাকারীদের ধরতে পারবে। কাজেই সরকারকে চাইতে হবে, এদের যেন ধরা যায়।’

তিনি বলেন, এখন সরকারের একটাই কাজ, ব্লগারদের উপদেশ দেয়া, ‘তোমরা বাড়াবাড়ি করো, লেখো,’ যেন খুন করাটা অপরাধ না, ব্লগে তারা যা লেখে তাই অপরাধ। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, এই দেশ কি আমরা চেয়েছিলাম? কেউ যদি বলে সে নাস্তিক, তবে তার শাস্তি সৃষ্টিকর্তা দেবেন। ড. সামসুল আলমের সভাপতিত্বে এবং ড. মস্তাবুর রহমানের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হক, অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম, ড. দ্বীপেন দেবনাথ, ড. মুহম্মদ ইউনুছ, ড. নাজিয়া চৌধুরী প্রমুখ।

এদিকে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী আহমেদুর রশিদ চৌধুরী টুটুল, কবি তারেক রহিম ও লেখক রণদীপম বসুকে কুপিয়ে আহত করার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পাবনা জেলা শাখার কর্মীরা। শহরের আব্দুল হামিদ সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক আব্দুল মতিন খান, ভাস্কর চৌধুরী, আবুল ফাত্তাহ, সাইদুর রহমান, অধ্যাপক আসাদুজ্জামান খোকন ও সুমন। বক্তারা অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

আজ কফিন মিছিল ॥ প্রকাশক, লেখক, ব্লগারসহ একের পর এক মানুষ হত্যার প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার ১১টায় শাহবাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে কফিন মিছিল করবে গণজাগরণ মঞ্চ। এ সময় ৬ ব্লগার হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে ৬টি প্রতীকী কফিন বহন করবে তারা। মঙ্গলবার গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বানে অর্ধদিবস হরতাল শেষের আগ মুহূর্তে মঞ্চের মুখপাত্র ডাঃ ইমরান এইচ সরকার এ কর্মসূচী ঘোষণা করেন। একই দাবিতে শুক্রবার বিকেল ৩টায় শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল হবে। ইমরান এইচ সরকার বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ৬ জন ব্লগার হত্যার প্রতিবাদে ৬টি কফিন এবং পরবর্তী টার্গেট কে- লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে গণজাগরণ মঞ্চ। শুক্রবার বিকেল ৩টায় রয়েছে শাহবাগে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল। সরকার জিরো টলারেন্সে এসে জঙ্গী দমন করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। অবিলম্বে খুনীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলত শাস্তির দাবি জানান তিনি।

ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখক, প্রকাশক, ব্লগার, রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর সংঘটিত হত্যা, হামলা, হত্যার হুমকি এবং বাংলাদেশকে ঘিরে জঙ্গীবাদী অপতৎপরতা রুখতে আগামী ৬ নবেম্বর শুক্রবার বিকেল ৩টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সমাবেশ’ এবং মশাল মিছিল আয়োজন করেছে জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চা। এ সমাবেশে উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সভাপতিত্বে করবেন জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চার আহ্বায়ক সাংবাদিক আবেদ খান। সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-ছাত্র-যুব-শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সাংবাদিক, ব্লগার, সংস্কৃতি কর্মী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ বিশিষ্ট জনেরা বক্তব্য রাখবেন। সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল বের হবে। সমাবেশে দল-মত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল মানুষকে হাতে হাত ধরে অংশগ্রহণ করার অনুরোধ জানিয়েছেন জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ মোর্চার আহ্বায়ক আবেদ খান।

ব্লগার-প্রকাশক হত্যাকা-ে জড়িত থাকার পেছনে সন্দেহের তালিকায় বিএনপি-জামায়াত শীর্ষে রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের বক্তব্য ও এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতির মাধ্যমে বোঝা যায়, এ হত্যাকা-ের সঙ্গে কারা জড়িত! এসব হত্যাকা-কে ঘিরে সন্দেহের যে তালিকা রয়েছে, এতে বিএনপি-জামায়াতের নেতারা শীর্ষে। বুধবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে এক হয়ে কাজের আহ্বান জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন। বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। কিন্তু একটি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছে। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।