১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিকশিত হচ্ছে কুটির শিল্প ॥ অর্থনীতিতে বছরে অবদান সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা

  • কুটির শিল্পের সংখ্যা ৮ লাখের ওপরে ;###;কর্মসংস্থান হয়েছে ৩০ লাখ ;###;বিসিকের শিল্পনগরী রয়েছে ৭৪

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ নীরবে নিভৃতে বিকশিত হচ্ছে কুটির শিল্প। স্বল্প শিক্ষিতদের হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে এ খাত। দেশের অর্থনীতিতে রাখছে বিশেষ অবদান। কিন্তু বিশাল এ খাত এতদিন ছিল জানার বাইরেই। ফলে এক ধরনের নিভৃতে প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কুটির শিল্পের অবদান ৩১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা। মোট কুটির শিল্পের সংখ্যা ৮ লাখ ৩০ হাজার ৩০৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২৯ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের। এ হিসাবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে শ্রমিকদের মাসিক গড় বেতন ৩ হাজার ১৩০ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপের প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নেয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। এসব বাস্তবায়িত হলে কুটির শিল্পসহ মধ্য ও বড় শিল্পের এক কথায় ম্যানুফ্যাকচারিং খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কুটির শিল্পের অগ্রগতি বিষয়ে সম্প্রতি শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প খাতের অবদান ২০ দশমিক ১৭ ভাগ। আর এই খাতের প্রবৃদ্ধির হার ১০ দশমিক ৩২ ভাগ। এর মাঝে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের প্রবৃদ্ধি হার ১০ দশমিক ৭০ ভাগ। এতে এটাই প্রমাণিত হয় দেশ দ্রুত শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা অচিরেই মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যাব। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্র জানায়, শিল্পনীতি ২০১০ এর আলোকে সারাদেশে মোট ১ হাজার ১৭১টি পিএসইউতে দশের কম জনবল বিশিষ্ট কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ১৫১টি পিএসইউ ছিল পকেট টাইপ। অর্থাৎ যেখানে একই জাতীয় পণ্য উৎপাদন বা সেবা কর্ম করা হয়। কুটির শিল্প জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মোট ৮ লাখ ৩০ হাজারটি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শহরের তুলনায় পল্লী অঞ্চলে কুটির শিল্প বেশি। আবার দেখা গেছে কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের ৯৬ শতাংশ একক ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং ৩ শতাংশ অংশীদারিত্বমূলক। অন্যদিকে কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এসএসপি পাসের নিচে রয়েছে ৮৩ শতাংশ মালিক। এসএসসি ও এইচএসসি পর্যন্ত ১৫ শতাংশ এবং মাত্র ২ শতাংশ ডিগ্রী বা তার অধিক। কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু ৩৫ শতাংশ রেজিস্টারভুক্ত এবং ৬৫ শতাংশ রেজিস্টারভুক্ত নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতে মোট উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্য ৩৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর বাবদ পরিশোধ করতে হয় ২৪ কোটি টাকা। অন্যান্য ব্যয় বাদ দিয়ে এ খাতে সার্বিক মূল্য সংযোজন হয় ৩১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকার। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই পরিমাণ অর্থ যোগ হয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাত থেকে।

জরিপের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ বিভাগে ক্ষুদ্র শিল্পের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ১১২, যা সারাদেশের ৩০ শতাংশের বেশি। আর সিলেট বিভাগে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ২৭ হাজার ৭৯১। এ বিভাগেই সবচেয়ে কম ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ৫১ হাজার ৪৭০টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ লাখ ১৫ হাজার ৯৬৮টি, খুলনা বিভাগে ১ লাখ ২২ হাজার ৮৭টি, রাজশাহী বিভাগে ১ লাখ ৩০ হাজার ১৩৩টি এবং রংপুর বিভাগে ৮২ হাজার ৭৪৪টি ক্ষুদ্রশিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জমি ও ভবন বাদ দিয়ে এ সব প্রতিষ্ঠানের পুঁজি ৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের উন্নতি করতে হবে। এক্ষেত্রে কৌশলগুলো হচ্ছে শিল্পায়ন ও বহুমাত্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেশি মাত্রায় অঙ্গীভূত করার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সহায়তা করতে হবে। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উল্লেখযোগ্য কর্ম সম্পাদনে সক্ষম ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে একটি পরিপক্ব শিল্প ব্যবস্থায় পৌঁছানো। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণকে সর্বাধিক সুযোগ দিতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে শূন্যকর সুবিধা প্রদান এবং শিল্পায়নের প্রবৃদ্ধি অর্জনে সম্পদ ও উপাদান হিসেবে প্রযুক্তির উদ্ভাবনে দেশীয় গবেষণাকে উৎসাহীতকরণ ও গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি করতে হবে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, আগামী পাঁচ বছরে কুটির শিল্পসহ মধ্য ও বড় শিল্প খাতে প্রণোদনা দেয়া, সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও কর রেয়াত সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কেননা কুটির শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি রয়েছে। শ্রমঘন শিল্প হিসেবে এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। এসব শিল্প উন্নয়নে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পণ্যের মান বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী পাঁচ বছরে কুটির শিল্পসহ শিল্প খাতের আরও অনেক বেশি বিকাশ ঘটবে।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিসিক দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭৪টি শিল্পনগরী স্থাপন করেছে। বিসিকের এসব শিল্পনগরীতে চার হাজার ২শ’ ৫৯টি শিল্প-কারখানা উৎপাদনরত আছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ রফতানিমুখী শিল্প-কারখানার সংখ্যা ৯৫০টি। এসব শিল্প ইউনিটে ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৯ হাজার ৩ শত আশি কোটি টাকা। বর্তমানে এসব শিল্প-কারখানায় মোট ৫ লাখ ৫০ হাজার লোক কর্মরত আছে। অন্যদিকে এসব শিল্পনগরীর শিল্প-কারখানাগুলোতে উল্লিখিত সময়ে ৪৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হয়েছে। যা বিগত বছরের তুলনায় এক হাজার ৪শ’ কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৫৯১ কোটি টাকার পণ্য ছিল রফতানিযোগ্য। যা পূর্বের বছরের তুলনায় ৮৪৫ কোটি টাকা বেশি। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসব শিল্প নগরী থেকে সরকার ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে। তার আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪শ’ ৯৯ কোটি টাকা। এর ফলে বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের (ম্যানুফ্যাকচারিং) প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। যার মধ্যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। বিগত বছরের চেয়ে তা ৪ দশমিক ৩৭ ভাগ বেশি।

শিল্প সচিব মোশারফ হোসেন ভূইয়া সম্প্রতি বলেন, এই খাতের আরও বিকাশের জন্য পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সেবামূল্যের ভিত্তিতে পণ্যের উপযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে। যাতে চীনের মতো বাংলাদেশের উৎপাদিত শিল্প পণ্য বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারে। এ লক্ষ্য অর্জনে বিসিককে শিল্পোদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত উদ্যোক্তাদের মাঝে সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদনের সঙ্গে জড়িতদের দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান আহমদ হোসেন খান সম্প্রতি জানান, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বিসিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ৬ হাজার ৬২৪ জনকে এবং দক্ষতা উন্নয়নে ৩ হাজার ১৬৪ জনকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বিসিকের ১৮টি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ ছিল ৩৬ কোটি ৪৬৩ লাখ টাকা, যার বিপরীতে ৩২ কোটি ৩১৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। উল্লিখিত ১৮টি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের কর্মকা-ের অগ্রগতির হার ছিল ৮৯ শতাংশ।