১৯ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কারাগারে জঙ্গী সংশ্লিষ্ট বন্দীদের রেডিও সরবরাহ নিষিদ্ধ

কারাগারে জঙ্গী সংশ্লিষ্ট বন্দীদের রেডিও সরবরাহ নিষিদ্ধ
  • সব জেলখানায় বাড়তি নিরাপত্তা

মশিউর রহমান খান ॥ কারাগারে বন্দী অবস্থায়ও বসে নেই আটক জঙ্গীরা। সংগঠন গোছাতে ও নিজেদের মতাদর্শ প্রচারে কারাগারের ভেতর থেকেই সক্রিয় হতে চেষ্টা করছে তারা। কারাগারে বসেই বাইরের জগত নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বর্তমানে তারা ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির প্রতি ঝুঁকছে। কারা অধিদফতরও জঙ্গীদের থাকা, খাওয়া, চলাফেরায় নজরদারি আগের যে কোন সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি করেছে। পাশাপাশি দেশের যে সকল কারাগারে জঙ্গী আটক রয়েছে তাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। অতি সহজে বহনযোগ্য ও কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে কারাভ্যন্তরে নেয়া সহজ। জঙ্গীরা মেমোরি কার্ড, পেনড্রাইভ, ইউএসবি পোর্টসহ আধুনিক ও ক্ষুদ্রাকৃতির প্রযুক্তি যন্ত্রের প্রতি ঝুঁকছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়াতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এসব জঙ্গী। জঙ্গীদের অপতৎপরতা প্রতিরোধে কারা অধিদফতর থেকে দেশের সকল কারাভ্যন্তরে বন্দীদের জন্য সাময়িকভাবে রেডিও নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া জঙ্গীদের প্রতি নজরদারি জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। এর পাশপাশি কারাভ্যন্তরে খোলা সার্কিট বা যে কোন প্রকার প্রযুক্তি পণ্য প্রবেশে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) আনসারউল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহরীর, হরকাতুল জিহাদের শাহাদাত-ই-আল হিকমা, জাগ্রত মুসলিম বাংলাদেশ (জেএমজেবি)সহ বেশ কয়েকটি জঙ্গী সংগঠনের নেতারা আটক রয়েছেন।

কারা সূত্র জানায়, এক সময় জঙ্গীরা কারাগারে হাতে লেখা চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। এতে করে বিভিন্ন সময় কারা কর্তৃপক্ষের হাতে এসব চিরকুট ধরা পড়ায় ও অল্প কথায় মনের পরিপূর্ণভাব প্রকাশ করতে না পারায় নিজেদের মাঝে যোগাযোগ রক্ষায় তারা নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এরই অংশ হিসেবে জঙ্গীরা মোবাইল ফোনে কথা বলা, জিহাদী ভিডিও দেখার জন্য মেমোরি কার্ডে দেশী বিদেশী জিহাদী ভিডিও সংগ্রহ করার চেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে। কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে কোন মূল্যে মোবাইল ফোন সংগ্রহ করছে। এছাড়া চিরকুটে কারাগারের বাইরে তথ্য আদান-প্রদান করতে বিভিন্ন কৌশলে তারা হাজতি বা কয়েদিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে। জঙ্গী সহযোগী এসব আসামিরা আদালতে হাজিরা দেয়ার সময় নির্দিষ্ট লোকের মাধ্যমে জঙ্গীদের নানা খবর সংগ্রহ করে কারাভ্যন্তরে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। কারা কর্তৃপক্ষ এসব জঙ্গীর ব্যাপারে কঠোর হওয়ায় খবর আনলেও তাদের সঙ্গে সাধারণ বন্দীদের যোগাযোগ নিষিদ্ধ থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এরপরও তৎপরতা থেমে নেই এসব জঙ্গীর। বিভিন্ন পদ্ধতিতে বাইরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা ও নিজের দলকে গোছানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তারা। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে কারাভ্যন্তরে বন্দীদের বিভিন্ন কৌশলে মোবাইল ফোন, মেমোরি কার্ড, সিমকার্ডসহ মাদক বহনের কিছু নতুন নতুন কৌশল পদ্ধতি ও উদ্ধার করা জিনিসপত্র সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। যা আদালত থেকে ফেরার পথে আসামিদের কাছ থেকে তল্লাশি করে পাওয়া যায় বলে জানানো হয়।

সূত্র জানায়, কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে বন্দী থাকায় তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিজেদের মতাদর্শ ধরে রাখতে ও বাইরের কর্মীদের বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করতে মোবাইল ফোনের বিকল্প নেই। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন কৌশলে কারাভ্যন্তরে মোবাইল ফোন প্রবেশ করাচ্ছে। ভিডিও দেখা যায় এমন মোবাইল ফোন তারা সংগ্রহ করছে। ফলে তারা মেমোরি কার্ডে বিভিন্ন জিহাদী ভিডিও সংগ্রহ করছে। এসব ভিডিও অতি গোপনে দেখে কারাভ্যন্তরে নিজেদের আদর্শকে সতেজ রাখতে চেষ্টা করছে।

কারাসূত্র জানায়, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের এক জঙ্গীর কাছ থেকে নকিয়া ১১০০ মডেলের একটি মোবাইল ফোন, চারটি মোবাইল ফোন সিমকার্ড, একটি মাইক্রো এসডি মেমোরি কার্ড ও দুটি ইউএসবি মেমোরি কার্ড রিডার পোর্ট উদ্ধার করেছে। তবে ইউএসবি পোর্টগুলোর সার্কিট খোলা ছিল। এসব খোলা সার্কিট কোন কাজে ব্যবহার হতে পারে তা সুস্পষ্ট ধারণা করতে পারছে না কারা কর্তৃপক্ষ। কারা কর্তৃপক্ষের মেমোরি কার্ডে ভিডিও পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে ইসলামী টিভির জাকির নায়েকের জিহাদী বক্তব্য সংশ্লিষ্ট ভিডিও রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাদের দলীয় ও জিহাদী মনোভাবের মাওলানাদের ওয়াজ মাহফিলের ভিডিও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে কয়েকটি নাটক ও কিছু জিহাদী গান। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ দেশের সকল কারাগারের ভেতর বন্দীর জন্য সার্কিট সংশ্লিষ্ট হওয়ায় রেডিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। আপাতত কোন বন্দীকেই কারা কর্তৃপক্ষ রেডিও তথা কোন প্রকার তথ্য প্রযুক্তিপণ্য দিচ্ছে না। আটক জঙ্গী কারাগারের অভ্যন্তরে ও বাইরে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। কারাসূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও নারায়ণগঞ্জ কারাগারে মোট ৩৯ জঙ্গী আটক রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের ২৭ ও নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে ১২ জঙ্গী আটক রয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষও জঙ্গীদের প্রতি নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। অতি গুরুত্বের সঙ্গে তাদের কর্মকা- পর্যবেক্ষণ করছে বলে কারাসূত্রে জানা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ কারাসূত্র জানায়, এই কারাগারে আটক জেএমবি সদস্য দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ কারাগারেই বন্দী রয়েছেন। উক্ত জেএমবি সদস্য আদালত থেকে মামলায় হাজিরা শেষে কারাগারে ফেরার পথে কারা নিয়মানুযায়ী তাকে তল্লাশি চালায় কর্তৃপক্ষ। তল্লাশিতে তার কাছ থেকে নকিয়া মোবাইল ফোন, দুটি ইউএসবি যুক্ত খোলা সার্কিট পায়। এরপর কারা কর্তৃপক্ষ উক্ত বন্দীসহ সকল জঙ্গীর ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করে। নারায়ণগঞ্জ কারাগারে আটক জঙ্গী বন্দীদের শোবার স্থান ও শৌচাগার ছাড়া সকল স্থান এমনকি সেলের বারান্দাও সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারির আওতায় রয়েছে। এছাড়া তাদের সঙ্গে কোন বন্দী বা কারারক্ষীকে পর্যন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলতে বা কথা বলতে দেয়া হয় না। অপর একটি সূত্র জানায়, জেলা কারাগার হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ কারাগারের প্রতিটি সেলে ৩ থেকে ৫ জঙ্গীকে আটক রাখা হয়। এর সুবাদে তারা নিজেদের মাঝে মতবিনিময়সহ বিভিন্ন প্রকার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। তবে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে প্রতিটি জঙ্গী বন্দীর জন্য পৃথক সেলের ব্যবস্থা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার হালিমা আক্তার জনকণ্ঠকে বলেন, কারাগারে আটক বন্দীদের মাঝে কেউ কেউ মোবাইল ফোন, চিঠি বা বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ এসব জঙ্গীর কক্ষ নিয়মিত তল্লাশি করে। এরই অংশ হিসেবে কয়েকদিন আগে আদালত থেকে হাজিরা শেষে ফেরত এক জেএমবি জঙ্গীর কাছ থেকে আমরা একটি মোবাইল ফোন, চারটি মোবাইল সিমকার্ড, একটি মেমোরি কার্ড, দুটি খোলা ইউএসবি মেমোরি কার্ড রিডার উদ্ধার করেছি। যা কারা অধিদফতরে জমা দেয়া হয়েছে। এসব মেমোরি কার্ডে জিহাদী ভিডিও, ওয়াজ মাহফিল ও জিহাদী গান রয়েছে। তাছাড়া আটক সকল জঙ্গীকে আমরা কঠোর নজরদারিতে রেখেছি। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা কারাগারের আটক বন্দীর জন্য কোন প্রকার রেডিও সাময়িকভাবে নিষেধ করেছি। এর পাশাপাশি সকল প্রকার প্রযুক্তি পণ্য প্রবেশে অতি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। নিরাপত্তা বৃদ্ধির পাশাপাশি জঙ্গীদের আরও বেশি নজরদারি আওতায় আনা হয়েছে।

নির্বাচিত সংবাদ