২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যানজট নিরসন ॥ তিন লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন!

  • ড. আর এম দেবনাথ

রাজধানীতে যানজট একটা বিরাট সমস্যা। এ নিয়ে আর কোন বিতর্ক নেই। বিতর্ক হচ্ছে কীভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যায়। সমাধানের একটা পথের কথা কয়েকদিন আগে একটি কাগজে পড়লাম। এতে বলা হয়েছে, রাজধানীর যানজট নিরসনে তিন লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ দরকার। সরকার এর জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) সংশোধন করেছে। আগামী ২০ বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার সড়ক ও একপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চালু হবে পাঁচ মেট্রোরেল ও দুটি বাস রেপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। খবরটিতে বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথ উন্নয়ন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের প্রয়োজন হবে। এর জন্য ২০ বছরে তিন লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ দরকার হবে। বলা বাহুল্য, বিশাল ব্যয়ে ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের এক উদ্যোগ গ্রহণ করতে সরকার আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে কারও কোন আপত্তি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্যত্র। আগামী দিনে যা হবার হবে, যা করার সরকার করবে। এই বলে কী বর্তমানের করণীয় বাদ থাকবে? নিশ্চয় নয়। পরিষ্কার কয়েকটা জিনিস দেখতে পাচ্ছি। ঢাকা শহরের যানজটের কথা উঠলেই সবাই বলেন, ঢাকার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা অত্যধিক। তাই প্রাইভেট গাড়ি কেনায় ব্যাংকের ঋণ দেয়া উচিত নয়। অধিকন্তু প্রাইভেট কারে কম দামে গ্যাস সরবরাহ করা উচিত নয়। ঐসব কারের ক্ষেত্রে ট্যাক্স বেশি হওয়া দরকার ইত্যাদি ইত্যাদি। ও, আরেকটা কথা বলা হয়। বলা হয়, বিদেশে বড় বড় শহরে রাস্তার পরিমাণ বেশি। সেই তুলনায় আমাদের রাস্তার পরিমাণ কম। এসব শুনে শুনে আমার মাঝে মাঝে মাথা খারাপ হয়ে যায়। ছোট্ট দেশ, এখানে জায়গা কম, শহরেও তাই রাস্তা কমই থাকার কথা। তবু ধরা যাক নর্থ-সাউথ রোডের কথা। এর প্রশস্ততা কম? বিশাল প্রশস্ততা। কয়েকটা গাড়ি সমান্তরালভাবে চলতে পারে উভয় দিকে। কিন্তু সেটা কী হয়? না, তা হয় না। কেন? এর উত্তর আমার দেয়ার দরকার নেই। ফুটপাথ দখল-সেখানে দোকান, চলে মোটরসাইকেল। ফুটপাথের পরেও রাস্তা দোকান, ফলের দোকান, নানা রকমের হকার। ভ্যানগাড়ি, দোকানের মালামাল, রিক্সা স্ট্যান্ড, বাস-ট্রাকের আস্তানা। এরপর তো আর রাস্তা থাকে না। যতটুকু থাকে তার উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল। চারদিকে শুধু রিক্সা, যা তুলে দেয়ার কথা উঠলেই রাজনৈতিক নেতারা কর্মসংস্থানের কথা বলেন। একই অবস্থা নওয়াবপুর রোড়ের। ঐ রোড তো দোকানদারদের দখলে বহুকাল ধরে। এক সময় ঐ রাস্তা দিয়ে মুড়ির টিনের মতো বাস চলত- খারাপ চলত না। ধীরে ধীরে ঐ রাস্তা দোকানদার, হকার, রিক্সাওয়ালা ও ভ্যানগাড়িওয়ালা দখল করে নিয়েছে। গুলিস্তানের দুই দিকের অবস্থা কী? মতিঝিলের রাস্তার অবস্থা কী? ঢাকার অন্যত্র অবস্থা কী? মাঝে মাঝে আমি মৎস্য ভবন দিয়ে আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানে যাই। বিশাল রাস্তা। কিন্তু যাওয়ার কোন উপায় নেই। আবার মাঝে মাঝে দেখি রাস্তা ফাঁকা। এক টানে আজিজ সুপার মার্কেট যাওয়া যায়। এসব দেখে কী মনে হয়? সমস্যাটি কী শুধুই রাস্তা ছোট হওয়া, সমস্যাটা কী শুধুই গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়া, আমার তা মনে হয় না। গাড়ির সংখ্যা বেশি, তা কমানো দরকার। এটা কোন বিষয় নয়। সরকার চাইলে তা হ্রাস করা সম্ভব অল্প আয়াসে। কিন্তু সারা ঢাকা শহরে রিক্সাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, হকাররা যে বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করে রেখেছে এই সম্পর্কে কী আমরা কিছুই বলব না। ফুটপাথে যে অবলীলাক্রমে মোটরসাইকেল চলে সেই সম্পর্কে আমরা কিছুই বলব না। একই রুটে যে শত বাস কোম্পানির গাড়ি চলে নেই সম্পর্কে আমরা কিছুই বলব না। রাস্তাঘাট যে হকার ও ভ্যানগাড়িওয়ালারা দখল করে রেখেছে সেই সম্পর্কে কী আমরা কিছুই বলব না। যে কোন রাস্তায় কোন প্রাইভেট গাড়িতে বসে সামনে তাকালেই দেখা যায় গাড়ি আর গাড়ি;কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে যা বোঝায় তা নেই। যত বড় শহর তাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেই, তা কেমনে হয়। অথচ হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস- সস্তায় সুলভে ভাড়ার বাস পাওয়া গেলে বহু লোক প্রাইভেট গাড়ি রেখে ঐ বাসেই চলাচল করবে। আজ থেকে দুই দশক আগে কলকাতায় আমি দেখেছি লোকের প্রাইভেট গাড়ি আছে, অথচ তারা চলছে ট্রামে অথবা বাসে। নানা রকমের বাস, নানা রকমের মিনিবাস, নানা ভাড়ার মিনিবাস। যে কোন একটা মাধ্যমেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া যায়। এই ব্যবস্থা কী ঢাকায় আমরা করতে পেরেছি? নিশ্চয়ই নয়। মতিঝিল থেকে উত্তরা মানুষ প্রাইভটকারে কেন যাবে? এক সময় মতিঝিল থেকে বিআরটিসির ভাল বাস সার্ভিস ছিল। অনেকে তাতে চড়ত। আজকাল সম্ভবত তা নেই। মতিঝিল থেকে উত্তরা যেতে কত সময় লাগে? কেউ জানে না। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা, কেউ জানে না। ট্রাফিক সিগন্যাল কাজ করে না। লালবাতি জ্বললেও গাড়ি যায়, সবুজ হলেও যায়। গাড়ি চলে উল্টো দিক দিয়ে। উল্টো দিক দিয়ে চলা গাড়ির মধ্যে সরকারী গাড়ি আছে, পুলিশের গাড়ি আছে। প্রভাশালীদের গাড়ি আছে। এসব দেখলেই বোঝা যায় অসহায় লোকদের জন্য পুলিশী আইন, প্রভাবশালীদের ক্ষেত্রে কোন আইন নেই।

ঢাকা শহরের যানজট একটু নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলেই সাদামাটা চোখেই বোঝা যায় এই শহরের যানজট সমস্যা যতটুকু, যা রাস্তার অভাবে হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে ট্রাফিক আইন অমান্যতার কারণে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিকের কোন শৃঙ্খলাই রক্ষিত হয় না। এই শহর বস্তুত ‘ফ্রি আর অল’। আমার মনে হয় সামান্য একটু শৃঙ্খলা রক্ষা করলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। শহরের ভেতরেই আছে ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। যে গাড়ি শহরের ভেতরে সমানে সাইরেন বাজাচ্ছে, হর্ন বাজাচ্ছে, যে গাড়ি শহরের ভেতরে ইচ্ছামতো চলাচল করছে, সেই গাড়ি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ঢুকলেই সাজা। নির্দিষ্ট গতিবেগে ঐ গাড়ি চলে, ট্রাফিক আইন মানে, লাইন ধরে চলে। এটা কীভাবে হয়? উদাহরণ আরও আছে। আমরা ঢাকা শহরেই দেখেছি সেনাবাহিনীকে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে। তখন দেখেছি রাস্তায় কোন যানজট নেই। শৃঙ্খলার সঙ্গে চলছে গাড়ি। লোকের কোন অভিযোগও নেই। কেউ দেরিতে অফিসে যাচ্ছে না। কেউ বলছে না গাড়ি পাইনি। এটা কী করে সম্ভব। এমন কি মাঝে মাঝে যখন কড়াকড়ি করা হয়, ফিটনেস চেক করা হয়, গাড়ির লাইসেন্স, কাগজপত্র চেক করা হয় তখন দেখা যায় রাস্তা একদম ফাঁকা। আরামে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া যায়। অথচ কেউ বলে না যে গাড়ি নেই- সেইজন্য অফিসে যেতে পারিনি। এসব তো চোখের সামনের ঘটনা।

ওপরে যা বললাম তা কী একান্তই অসত্য কথা, তা কী একান্তই অতি কথন? আমার মনে হয় না। আমরা কেউ ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা বললাম না, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কথা বললাম না, খালি বলছি হাজার হাজার কোটির পরিকল্পনার কথা। ঐ সব বড় বড় পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমি কোন মন্তব্য করতে চাই না। ঐ সব হোক; কিন্তু রুটিন কাজগুলো কেন হবে না। রিক্সা তুলে দিলে ঢাকা শহরের সর্বনাশ হবে- এ কথা কেমনে আমরা বলি। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা না করে আমরা যে একজন নিম্নবিত্ত মহিলাকে তার ছেলে বা মেয়েকে রিক্সায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য করছি এটা কী অন্যায় নয়? উইলস লিটল ফ্লাইওয়ার স্কুল থেকে মালিবাগে যেতে ঐ মহিলাকে দুপুর বেলায় ৪০-৫০ টাকা গুনতে হয়। এই টাকার বাড়ি কোথায়? আমি মনে করি একটু শৃঙ্খলা আসলে, নিয়মিত পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়। বড় বড় পরিকল্পনা যাদের ভীষণ ‘দরকার’ তারা তা করুন কোন আপত্তি নেই কিন্তু দৈনন্দিন শৃঙ্খলা রাস্তায় প্রযোজ্য করতে বাধা কোথায়? শত হোক ভ্যানগাড়িওয়ালা, রিক্সাওয়ালা ও হকার সকল রাস্তায় রেখে তিলোত্তমা ঢাকা শহর করা সম্ভব নয়। সব চেয়ে বড় কথা, সর্বগ্রাসী ঢাকা শহরকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে দেয়াটাও কাজের কথা নয়।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি