২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যানজট সবখানেই

যানজট সবখানেই
  • রাস্তা দখল করে অবৈধ স্থাপনা;###;গুরুত্বপূর্ণ সব মহাসড়কে অরাজকতা ;###;যত্রতত্র অবৈধ টার্মিনাল, হাটবাজার ্রউচ্ছেদে মূল বাধা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা;###;চলছে ১৮ লাখ অনুমোদিত যান

রাজন ভট্টাচার্য ॥ দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে অরাজকতার শেষ নেই। রাস্তা দখল করে অবৈধ টার্মিনাল, হাটবাজারসহ একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। যানজটের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় যাচ্ছে রাস্তায়। তিন ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিতে লাগছে ছয় ঘণ্টার বেশি। রাজধানী থেকে দেশের ৮০ রুটে যানবাহন চলাচল করছে। সব রুটে এ রকম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীসহ পরিবহন মালিক শ্রমিকদের। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহাসড়ক থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে মূল প্রতিবন্ধকতা হলো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বাধা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়া না হলে আন্তর্জাতিক মানদ-ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। পাশপাশি যাত্রীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগের সমাধানও মিলবে না। তাই যে কোন মূল্যে মহাসড়কের রাস্তার দু’পাশে দেয়াল নির্মাণের পরামর্শ তাদের। সেই সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

অনুমোদনহীন যানবাহন চলছেই ॥ নানা আলোচনা-সমালোচনার মুখে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্সাসহ অনুমোদনহীন যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে। এক আগস্ট থেকে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ নিয়ে সারাদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের অব্যাহত চাপের মুখে অনেকটাই পিছু হটতে শুরু করে সরকার। একপর্যায়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, এসব পরিবহন সকালে দুই ঘণ্টা সিএনজি সরবরাহের জন্য মহাসড়কে উঠতে পারবে। পরবর্তীতে বলা হয়, দেশের ২২টি মহাসড়কে এসব পরিবহন চলাচল করতে পারবে না। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের অভিযোগ সব মহাসড়কেই অনুমোদনহীন যানবাহন চলছে!

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৮ লাখ নসিমন, করিমন, ভটভটি বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। যার একটিও সরকারীভাবে অনুমোদিত নয়। ৩ লক্ষাধিক ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক মহাসড়কে চলতে দিয়ে কোন অবস্থাতেই নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে প্রতি ১০ হাজার যানবাহনের মধ্যে ৮৬ দশমিক ৬টি যানবাহন প্রতিবছর মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ছে। এই পরিসংখ্যানে নিহতের সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১৬৯ জন। দুর্ঘটনার কারণে দেশের ২ শতাংশ জিডিপি ক্ষতি হচ্ছে।

এক লাখ কিলোমিটার সড়ক ॥ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানদ-ের সড়ক একটিও নেই। মূলত এ কারণেই এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। তবুও সরকারের পক্ষ থেকে এই সমস্যা দূর করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এলজিইডি ও সড়ক জনপথ অধিদফতর মিলে মোট সড়কের পরিমাণ এক লাখ কিলোমিটারের বেশি। এর মধ্যে সারাদেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক রয়েছে ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের অধীনে সারাদেশে সড়কের পরিমাণ ২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৬ হাজার ৪৪৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ১০৫ কিলোমিটার। জেলা সড়ক রয়েছে ১০ হাজার ৬০৬ কিলোমিটার। সারাদেশের জাতীয় আঞ্চলিক ও জেলাওয়ারী ৮৩৩টি মহাসড়ক রয়েছে। পাকা সড়ক আছে ১৮ হাজার ৭৭২ কিলোমিটার, কাঁচা সড়ক ৬৪৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা ও চলাচলের ক্ষেত্রে জাতীয় মহাসড়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

যানবাহন নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই ॥ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় নয় লাখ ১৩ হাজার ৬২২টি অনুমোদিত যানবাহন চলাচল করছে। সারাদেশে অনুমোদিত পরিবহনের সংখ্যা ২৩ লাখ সাত হাজার ৯৫৭টি। সড়কের ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী রাজধানীতে দুই লাখের বেশি যানবাহন চলাচল করতে পারে না। তাছাড়া রাজধানীর মোট সড়কের অর্ধেকের বেশি দখল। এসব কারণে নগরজুড়ে যেমন যানজট হচ্ছে। তেমনি রাজধানীর ১৩টি প্রবেশ মুখ ও বের হওয়ার স্থানগুলোতে যানজটের যেন শেষ নেই। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সবাই আইন মেনে চললে এবং অবৈধ পরিবহন নিয়ন্ত্রণসহ রাস্তা ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করা গেলে অর্ধেক যানজট কমিয়ে আনা সম্ভব।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দখলের উৎসব ॥ মহাখালী থেকে গাজীপুরে চৌরাস্তা যেতে যত সময় লাগে এর চেয়ে কম সময় লাগে ময়মনসিংহ যেতে। অর্থাৎ মহাখালী থেকে গাজীপুর যেতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় খবর নিত্য দিনের ঘটনা। উপায়হীন যাত্রীরাও এ বিষয়টি অনেকটাই যেন মানিয়ে নিয়েছেন। এই হাইওয়ের রাস্তার দু’পাশে বাজার, বাস ও ট্রাক টার্মিনাল রয়েছে। গাজীপুর চৌরাস্তায় পুলিশের উপস্থিতিতে দিনভর রাস্তার ওপর বাজার। দীর্ঘ সময় বিভিন্ন গন্তব্যের বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানোর চিত্র প্রতিদিনের। স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের জন্য লেগুনা, মেক্সির কমতি নেই। সামনে এগিয়ে গেলে, ভালুকা, মাওনা, সিডস্টোর, আরএকে সিরামিকস পয়েন্ট, ত্রিশালসহ অন্তত ২০টি পয়েন্টে স্বাভাবিক গতিতে বাস চলতে পারে না।

এছাড়া ময়মনসিংহের চরপাড়া পয়েন্টে চলছে সড়ক দখলের মহোৎসব। এর ফলে চার লেন সড়কটি সরু হয়ে দুই লেন সড়কে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের দু’পাশ দখল করে এলোপাতাড়িভাবে গড়ে উঠেছে হরেক রকমের দোকান। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উল্টো দিকের সুন্দর ফুটপাথও চলে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কব্জায়। ফলে এখানে দিন দিন যানজট তো বাড়ছেই, হেঁটে চলারও জো নেই। পথচারী ও যাত্রীদের পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। ঘটছে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও।

অধুনালুপ্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৬ জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আরামদায়ক, সহজতর, নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করতে ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া মোড় থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ৮৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ৯শ’ ২ কোটি ২২ লাখ ৩৭ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেয়া হয়। ইতোমধ্যে এ মহাসড়কের ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে অথচ প্রকল্পের দু’পাশে চলছে বাজার, টার্মিনালসহ নানা স্থাপনা। এতে হাইওয়ের মানদ- নষ্ট হচ্ছে।

জাতীয় মহাসড়কের মানদ- রক্ষার কেউ নেই ॥ প্রকৌশলীরা বলছেন, আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানদ-ের কোন রাস্তা নেই। বাস্তবতা হলো- সম্প্রতি মানদ- নিশ্চিত করেই রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। মান অনুযায়ী প্রতিটি লেনের রাস্তার প্রশস্ত হতে হবে তিন দশমিক ৬৫ মিটার। অর্থাৎ ১২ ফিট। দুই লেনের মহাসড়ক হলে এর প্রশস্ত হবে ২৪ ফিট। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ মহাসড়কগুলো এই মানদ-ে নির্মাণ করার কথা জানিয়েছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রাস্তার দু’পাশে আট ফুট করে ১৬ ফুট জায়গায় কোন ধরনের স্থাপনা হতে পারবে না। এটি রাস্তার শোল্ডার হিসেবে থাকবে। একেক চাকার জন্য আট টন ওজন নির্ধারণ করে রাস্তা করা হচ্ছে। অর্থাৎ চার চাকার ট্রাকের ক্ষেত্রে ৩২ টন মালামাল পরিবহন করা যাবে। তবে এই মানদ- রক্ষার দায়িত্ব পালনে তেমন কেউ নেই।

জানতে চাইলে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাওয়েদ আলম জনকণ্ঠ’কে বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী আমাদের দেশে রাস্তা নির্মাণ শুরু হলেও এর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। ফলে রাস্তায় হাটবাজার বসছে। দখল হচ্ছে রাস্তার শোল্ডার পর্যন্ত। এ কারণে একদিকে যেমন দ্রুত রাস্তা নষ্ট হচ্ছে। তেমনি দুর্ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। যাত্রী ভোগান্তি তো সব সময়ের ঘটনা।

যন্ত্রণার নাম বাবুবাজার-সোয়ারীঘাট ॥ ফরিদপুর-মাওয়া, খুলনাসহ বিভিন্ন রুটের বাস গাবতলী থেকে বাবুবাজার-সোয়ারীঘাট রুট দিয়ে যাতায়াত করে। যাত্রী ও চালকদের জন্য সহজ এই রাস্তাটি কঠিনে পরিণত হয়েছে। আরও কঠিন ভাষায় বলছে, রাস্তাটি এখন যাত্রী ও চালকদের কাছে আতঙ্কের নাম। প্রত্যয় ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল করিম জনকণ্ঠ’কে বলেন, বাবুবাজার বেড়িবাঁধের রাস্তাটি এখন যানজটের বিষফোঁড়া হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে গাড়ি রাখা, বাজার, অবৈধ দোকানপাটের কারণে অনেক সময় তিন থেকে চারঘণ্টা জামে আটকে থাকতে হয়। এছাড়াও আমিনবাজার-বাইপাইল-নবীনগর-চন্দ্রা পয়েন্ট তো যানজটের জন্য খ্যাত।

সকল হাইওয়েতে যানজট ॥ পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী রাজধানী ঢাকা থেকে ৮০টির বেশি রুটে নিয়মিত বাস চলাচল করে। সকল রুটেই দিন দিন যানজটের মাত্রা বাড়ছে। কোন কোন রুটে রাস্তায় সময় যাচ্ছে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত। গন্তব্যে পৌঁছাতে যত সময় লাগে এর চেয়ে বেশি সময়ক্ষেপণ হয় রাস্তার যানজটের কারণে। পরিবহন মালিকরা বলছেন, ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে যানজটের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ সহাসড়কটি চার লেনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও অন্য সড়কগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দুর্ভোগের মাত্রা সমান। এর কারণ হিসেবে চালকরা জানিয়েছেন, সড়কের পরিধি যত বাড়ছে দখলের প্রতিযোগিতাও বাড়ছে তাল মিলিয়ে। বিশেষ করে ঢাকা ময়মনসিংহের রাস্তার প্রায় ৯০ ভাগ অংশে দখলের চিত্র লক্ষ্য করা যায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহাখালী আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম জনকণ্ঠ’কে বলেন, এই টার্মিনাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪০টি রুটে বাস চলাচল করে। দখল, হাটবাজার, অবৈধ টার্মিনালসহ নানা অরাজকতার কারণে দেশের সব হাইওয়েতে যানজটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমরা অনেকবার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বিভিন্ন সড়কে দেখা যায়, অর্ধেক রাস্তা পর্যন্ত দখলে থাকে। আশুলিয়া চন্দ্রা এলাকার যানজট নিয়ে যুগের পর যুগ আলোচনা হলেও সমস্যা তিমিরেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ জনকণ্ঠ’কে বলেন, দেশের বিভিন্ন হাইওয়েতে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চলছে অথচ সরকার বলছে, এসব পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি সিলেটে গিয়ে এ দৃশ্য দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তিনি আরও বলেন, রাস্তার দু’পাশে দখল করে বাজারসহ নানা স্থাপনা হচ্ছে পুলিশ প্রশাসনের চোখের সামনেই। সড়ক বিভাগ এ ব্যাপারে কিছু বলছে না। সবাই দেখেও না দেখার ভান করলে যাত্রীসহ পরিবহন মালিক শ্রমিকদের দুর্ভোগ কোনদিনই লাঘব হবে না।

সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ বৈঠকে মহাসড়কের দু’পাশের রাস্তা দখলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও দুর্ভোগের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলেও মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন হয় না। যে যার মতো করে দখল ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সিলেট রুটেও একটু পর পর হাট-বাজার। রাস্তা দখল করে নিয়মিত বাজার বসছে। মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত সকল মহাসড়কের পাশে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানান এই পরিবহন নেতা।

বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি রুস্তম আলী জনকণ্ঠ’কে বলেন, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুট ও চট্টগ্রাম মহাসড়কে রাস্তার দু’পাশে দখলের উৎসব চলছে। একটু পর পর বাজারসহ স’ মিলের শেষ নেই। রাস্তার ওপর রাখা হচ্ছে কাঠ। অবৈধ টার্মিনাল তো আছেই। এসব সমস্যা দূর করতে দ্রুত সরকারের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ ট্যাঙ্ক লরি মালিক সমিতির নেতা রেজাউল ইসলাম জনকণ্ঠ’কে বলেন, ভুলতা-গাউছিয়া পয়েন্টে রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ গাড়ি আর বাজারের কারণে যানজট লেগেই থাকে। কাঞ্চন ব্রিজ দিয়ে চলাচল করা গাড়ির কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। চট্টগ্রাম মহাসড়কে গৌরিপুর পয়েন্টে বাজার বসে। সোনারগাঁও পয়েন্টে অবৈধ পার্কিং, ছোট ছোট বিভিন্ন গাড়ির সারিবদ্ধ লাইন তো আছেই। মাওয়া রুটে বাজারের কারণেও চলাচলে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা ব্রিজের সরঞ্জামাদি রাস্তায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না।

বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ॥ প্রকৌশলী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হলেও এর সুফল মিলছে না। মহাসড়ক নির্মাণের পর পরই রাস্তার পাশে অনুমোদন ছাড়াই ইচ্ছেমতো বাজার বসানো হচ্ছে। এসব বাজারকে কেন্দ্র করে হচ্ছে দোকান। স্থায়ী স্থাপনারও কমতি নেই। তারপর বাস, ট্রাক, অটোরিক্সা, ব্যাটারিচালিত বাইক থেকে শুরু করে নানা ধরনের পরিবহনের আনাগোনা। টার্মিনাল। সব মিলিয়ে বাজার এক সময়ে রাস্তা পর্যন্ত আসে। দিন দিন বাড়ে জনদুর্ভোগের মাত্রা। যানজট স্থায়ী রূপ নেয়। এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, আন্তর্জাতিক মানের সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে যে কোন মূল্যে হাইওয়ে থেকে বাজার উচ্ছেদ করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর আদলে মহাসড়কের দু’পাশে দিতে হবে দেয়াল। ফিডার রোডের সব গাড়ি যেন কোন অবস্থাতেই হাইওয়েতে উঠতে না পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে লোক ওঠানো বন্ধ করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি আইন মেনে গাড়ি চলছে কিনা তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কে সিসিটিভি স্থাপনের পরামর্শ অনেকের।

যদিও যানজট নিরসন ও পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আশুলিয়া-চন্দ্রা পয়েন্টে প্রায় দুই বছর আগে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব প্রযুক্তি মনিটরিং করা এমনকি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ারও কেউ নেই। ফলে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে গেছে। ঢাকা সেনানিবাসের পুরো এলাকা আনা হয়েছে সিসি ক্যামেরার আওতায়। এতে এই এলাকায় কোন গাড়ি আইন অমান্য করে চললে দ্রুত ধরা পড়ে এবং চালকের বিরুদ্ধে নেয়া হয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাসড়কেও প্রযুক্তিগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে যানজট নিরসনের পাশাপাশি পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে জনদুর্ভোগ যেমন কমবে, তেমনি কমবে সড়ক দুর্ঘটনা। উপকৃত হবেন পরিবহন সেক্টরের সংশ্লিষ্টরাও।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সড়ক-মহাসড়ক থেকে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী কাজ শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সড়ক-মহাসড়ক বিভাগ। কিছুদিন যেতে না যেতেই এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, রাজনৈতিক কারণে সড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ সম্ভব নয়। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনৈতিক চাপই মূল বাধা। এতে ভোটের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এর পর পরই সরকার উদ্যোগ বাস্তবায়ন থেকে পিছু হটে।