২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকি বন্ধুদের হাজিরের আর্জি জানিয়ে এবার ভিডিও বার্তা প্রচার

  • সাকার নতুন ষড়যন্ত্র

আরাফাত মুন্না ॥ যুদ্ধাপরাধী বিচার চলাকালে নানা কা- ঘটিয়ে আলোচিত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী এবার এই বিচার প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করতে নতুন ষড়যন্ত্রে নেমেছেন। রিভিউতে পাকিস্তানী বন্ধুদের হাজিরের আর্জি জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে এবার তাদের ভিডিওবার্তা প্রচার করছেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। আইনে সুযোগ না থাকায় রিভিউ আবেদনের শুনানিতে সাক্ষী হাজিরে সাকার দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দেয় সুপ্রীমকোর্ট। এরপরই এই ভিডিওবার্তা প্রচার শুরু করেছে স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি।

যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতারের পর থেকে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে কখনও বিচারকদের কটাক্ষ করে আবার কখনও সাক্ষীদের ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছেন সাকা চৌধুরী। এই বিচারপ্রক্রিয়া ঘিরে ষড়যন্ত্রও কম করেননি এই যুদ্ধাপরাধী। ট্রাইব্যুনালে রায় প্রকাশের আগের দিন যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তাদানকারী কয়েকটি ওয়েবসাইটে আকস্মিকভাবে রায়ের কথিত কপি প্রকাশের ঘটনাও ঘটিয়েছেন। সুপ্রীমকোর্ট থেকে চূড়ান্ত সাজা হওয়ার পর রিভিউতে এসে পাকিস্তানী সাক্ষী হাজিরের আর্জি জানান সাকা। যদিও আইনে এমন কোন বিধান নেই।

সে সময় সাকার আইনজীবীরা দাবি করেছিলেন ওই সাক্ষীরা বলবে, যে সময়ের অপরাধের জন্য তাকে সাজা দেয়া হয়েছে ওই সময় তিনি দেশেই ছিলেন না। সাকার আইনজীবীদের এমন বক্তব্যের পর যারা সাকাকে রাউজান, জগৎমল্লপাড়াসহ গুডস হিলে নির্যাতন করতে দেখেছে সেই দেশী সাক্ষীরা বলছেন, নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে বসে আছি ৪৪ বছর ধরে, আজ শুনতে হবে সাকা দেশে ছিল না! এ ভীষণ লজ্জার! আর প্রসিকিউশন বলছে, যারা টাকা খাইয়ে রায়ের খসড়া চুরি করে নিয়ে যেতে পারে তারা নিত্যনতুন সাক্ষী হাজির করতে পারবে না এমন নয়। এসবই ষড়যন্ত্রের অংশ। পরে আইনে ওই সুযোগ না থাকায় গত ২ নবেম্বর সুপ্রীমকোর্ট সাকার ওই আবেদন খারিজ করে দেয়।

রিভিউতে সাক্ষী হাজিরের আবেদন খারিজের পরই ভিডিওবার্তা প্রচারে নামে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। ফেসবুকে ‘জাস্টিস ফর চৌধুরী’ নামে পেজ বানিয়ে সেই সাক্ষীদের ভিডিও ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ‘সাকা চৌধুরী মার্চের শেষ থেকে বাংলাদেশে ছিলেন না এবং পাকিস্তানের করাচী থেকে লাহোর হয়ে সরাসরি লন্ডন চলে গিয়েছিলেন। তাই ১৯৭১ সালে মার্চের পর তার বাংলাদেশে থাকার প্রশ্নই আসে না।’ যদিও ওই সময়ে সাকা চৌধুরী দেশে থেকে অত্যাচার নির্যাতন চালিয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর জবানবন্দীতে উঠে এসেছে।

স্বাধীনতাবিরোধী ওই চক্রটি এই ভিডিওবার্তা প্রচারের প্রক্রিয়ায় তারা ব্যবহার করছে ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগটিকে। যে কোন নিউজ আপডেট দেয়ার ক্ষেত্রে তারা লিংক হিসেবে সেই ব্লগকেই ব্যবহার করছেন। এমনকি ওই ব্লগে দেয়া কমেন্টে বাংলাদেশে একজন ‘ইনোসেন্ট পার্সন’কে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে; এমন মন্তব্যও রয়েছে। যদিও, যে কোন প্রচারমাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে ভুল/মিথ্যা তথ্য দেয়া আইনত বেআইনী হিসেবে উল্লেখ করছেন আইন বিশ্লেষকরা।

প্রথম ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মিয়া সুমরো যিনি ১৯৭১ সালে মার্চের শেষে ও এপ্রিলে করাচীতে থাকার সময় থেকে সাকার বন্ধু; সাকার সঙ্গে তার লাহোরে দেখা হয়। তিনি দাবি করছেন, সাকা সেখানে গ্রীষ্মকালটা থেকে লন্ডন চলে যান।

সাকার পক্ষে সাক্ষী দিতে চাওয়া আরেকজন ডন নিউজপেপার গ্রুপের প্রকাশক অম্বার হারুন সায়গল। তিনিও একইভাবে দাবি করেন, করাচী থেকে লাহোর যাওয়ার আগে তিন সপ্তাহের মতো তার কাছে সাকা ছিলেন এবং তাতে এটাই প্রমাণিত হয় যে চৌধুরীকে ঘিরে ১৯৭১ সালের এপ্রিলের যেসব অপরাধের কথা বলা হচ্ছে সেখানে তিনি ছিলেন না।

যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন যারা তারা বলছেন, চূড়ান্ত বিচারে মৃত্যুদ-াদেশ হওয়ার পর থেকে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছেন এবং এর জন্য পাকিস্তানের কাঁধে ভর করেছেন। সাকার পক্ষে যা-ই কিছু লেখা হচ্ছে তার সঙ্গে বিস্তারিত যে লিঙ্ক দেয়া হচ্ছে তাতে ক্লিক করলে খুলছে ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগ। ডেভিড বার্গম্যানের বরাত দিয়ে জাস্টিস ফর চৌধুরী নামে ফেসবুকের এক পোস্টে লেখা আছে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যে কোথাও উপস্থিত ছিলেন না সেটা প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই তাকে ফাঁসি দেয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, প্রসিকিউশনের ৪১ সাক্ষীর বিপরীতে তাকে মাত্র চার সাক্ষী দিতে দেয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট খান আসাদুজ্জামান মাসুম বলেন, এ ঘটনা থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে বার্গম্যানের যে সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে সেটা আরও স্পষ্ট হয়। তার রিপোর্টের কাঁধে চেপে এসব মানবতাবিরোধী অপরাধী পার পেতে চাইছে। এটা অন্তত তার মতো সাংবাদিকের বোঝা উচিত ছিল। তিনি বুঝেও না বোঝার কাজ করছেন।

সাকাকে অনুপস্থিত প্রমাণের সুযোগ না দেয়াটাকে মিথ্যা তথ্য বলে প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম জনকণ্ঠকে বলেন, ট্রাইব্যুনাল বার বার বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব প্রসিকিউশনের। আমরা প্রমাণ না করতে পারলে ভিন্ন বিষয় ছিল। মাননীয় উচ্চ আদালতও বলেছেন আমরা অকাট্য যুক্তি, সাক্ষী ও দলিলপত্র হাজির করতে পেরেছি যার বিপরীতে তারা সামান্য একটা সার্টিফিকেটও আনতে পারেননি। এসব করার মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেই মন্তব্য করেন ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর।

পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির ইশহাক খান খাকওয়ানি পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে সাকার ক্লাসমেট ছিলেন এবং পাকিস্তান ও লন্ডন মিলিয়ে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর তারা একসঙ্গেই ছিলেন বলে দাবি করেন। পুরো সময়টা চৌধুরী বাংলাদেশের বাইরে ছিল বলেও দাবি তার। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর তুরীন আফরোজ জনকণ্ঠকে বলেন, খেয়াল করে দেখুন তারা একটার পর একটা সাজিয়েছে এমনভাবে, মার্চের শেষ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোটামুটি এদের দিয়ে বলিয়ে নেয়া গেছে তারা একসঙ্গে ছিল। এ বিষয়ে আর কথা বলারই দরকার নেই, কেননা আপীল বিভাগ বিষয়টির সুরাহা করে দিয়েছেন।

ভিডিওবার্তার বিষয়ে তুরীন আফরোজ বলেন, আদালতের বাইরে কেবল ডিফেন্স নয়, আমাদের সাক্ষীরাও অনেক কথা বলতে পারেন কিন্তু তার কোনটাই এভিডেন্স হিসেবে গণ্য হবে না যতক্ষণ না তারা আদালতে শপথ নিয়ে এই সাক্ষী হাজির করবে। যখন সুযোগ ছিল তখন কেন তারা এসব উপস্থাপনের চেষ্টা করলেন না? তিনি আরও বলেন, এখানে বেশ কয়েকবার ডেভিড বার্গম্যানের ব্লগকে বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যিনি কিনা নিজেই ট্রাইব্যুনালে অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক হত্যা ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ-াদেশ পাওয়া বিএনপির শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন কাদের বাহিনীর (নিজস্ব বাহিনী) প্রধান স্বঘোষিত ‘ব্রিগেডিয়ার’ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। চলতি বছরের ২৯ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপীল বিভাগের বেঞ্চ ঐতিহাসিক এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে সুপ্রীমকোর্ট। ৭ নম্বর অভিযোগ থেকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়। ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে সাজা বহাল রাখা হয়েছে সুপ্রীমকোর্টের রায়ে।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা ২৩ অভিযোগের মধ্যে নয়টি প্রমাণিত হয়। ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে সাকাকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। আপীল বিভাগ তা বহাল রাখেন। ৭ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দিয়েছেন আপীল বিভাগ। ২ ও ৪ নং অভিযোগে সাকাকে ট্রাইব্যুনাল ২০ বছরের কারাদ- প্রদান করেন। সেটা আপীল বিভাগও বহাল রেখেছেন। অন্যদিকে ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে সাকাকে ৫ বছর করে কারাদ- প্রদান করা হয়। এই দ- বহাল থাকে আপীল বিভাগেও। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রিভিউ আবেদন দাখিল করে সাকা চৌধুরী। ওই সময় পাঁচ পাকিস্তানী সাক্ষী হাজিরেরও আবেদন জানান তার আইনজীবীরা। গত ২ নবেম্বর ওই আবেদন খারিজ করে দেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ।