২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আসুন, মানুষের জীবন বদলে দিই ডাচ ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

আসুন, মানুষের জীবন বদলে দিই ডাচ ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী
  • হেগে সেমিনারে ভাষণ

বিডিনিউজ ॥ নেদারল্যান্ডসের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টা লাখো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। বৃহস্পতিবার দ্য হেগে ডাচ্ ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে এক সেমিনারে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে বস্ত্র, চামড়া, পাট, সিরামিক, ওষুধ, পেট্রোকেমিক্যালস, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, প্লাস্টিক পণ্য, হালকা প্রকৌশল এবং ইলেকট্রনিক্স, টেলিযোগাযোগ, তথ্য-প্রযুক্তি আর বিদ্যুত ও জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে ডাচ্ কোম্পানিগুলোকে আমরা বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছি।” বাংলাদেশ এরই মধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌঁছে গেছে জানিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যের কথাও সেমিনারে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ডাচ্ ব্যবসায়ীদের বলেন, ‘আমি আপনাদের, ডাচ্ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা আসুন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের, মুনাফা ও সমৃদ্ধির অংশীদার হোন। আমরা একজোট হলে লাখো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারি।”

প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করেন, স্বাধীনতার পর ইউরোপের যে দেশগুলো প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, নেদারল্যান্ডস তার অন্যতম।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর থেকেই বাংলাদেশে বিভিন্ন ডাচ্ কোম্পানি তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৩০টি ডাচ্ কোম্পানির ৬৮৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে বাংলাদেশে।

ডাচ্ ব্যবসায়ীদের শেখ হাসিনা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার দেশ ৬ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৭তম বৃহৎ অর্থনীতি।

প্রধানমন্ত্রী তাদের জানান, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক। বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ ও ওষুধ শিল্পও বিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশে শুধুমাত্র রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আটটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ জোন রয়েছে। সরকার এখন ১০০টি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল এবং বেশ কয়েকটি হাইটেক পার্ক গড়ে তুলতে কাজ করছে, যেখানে ডাচ্ কোম্পানিগুলো ব্যবসার সুযোগ নিতে পারে।

তিনি বলেন, বিনিয়োগ নীতির দিক দিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উদার দেশ। এ দেশে বিদেঈ বিনিয়োগকারীদের যেমন আইনী সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে, তেমনি তারা শুল্ক ও কর রেয়াতের মতো সুবিধা পাচ্ছেন।

লিখিত বক্তব্য দেয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ডাচ্ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং আবাসন, জলবায়ুর পরিবর্তন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা সত্যিকারের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চাই। আমরা একসঙ্গে কাজ করলে দেশে ও বিশ্বে কোটি জনতার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারব।”

বাংলাদেশে নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত লিওনি মার্গারেটা কুলিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তার ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অনুষ্ঠানে বলেন, “সেখানে এক জায়গায় আমি জর্জ হ্যারিসনের ভাস্কর্য দেখেছি, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় গান গেয়ে সকলকে উজ্জীবিত করেছিলেন। এখন তিনি বাংলাদেশকে দেখলে সমৃদ্ধির গান গাইতেন।”

অন্যদের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সভাপতি মার্টিন ফারব্রুগেন, দেশটির সাবেক কৃষিমন্ত্রী চিজ ফিরমান, বাংলাদেশ সরকারের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির প্রথম সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।

মার্টিন ফারব্রুগেন বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত কর্মঠ। বাংলাদেশ অত্যন্ত সুন্দর একটি দেশ।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল ইসলাম অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

চার চুক্তি ॥ বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে আরও ডাচ বিনিয়োগ কামনা করেছেন। এ লক্ষ্যে তিনি বলেন, বিনিয়োগ করার জন্য ডাচ কোম্পানিগুলোকে স্বাগত জানাবে বাংলাদেশ।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ডাচ প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের উপস্থিতিতে বুধবার রাতে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ৪টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস শিক্ষা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে ৪টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মার্ক রুটের সরকারী ভবন ‘কাস্টহুইস’- এ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সচিববৃন্দ এসব চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

চুক্তিগুলো হচ্ছে- নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পররাষ্ট্র দফতর পর্যায়ে আলোচনা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। বাংলাদেশ থেকে জুনিয়র কূটনীতিকদের জন্য প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) স্বাক্ষর। স্যাক্সন ইউনিভার্সিটি অব এ্যাপ্লাইড সায়েন্স, স্কুল অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এ্যান্ড টেকনোলজির মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর এবং স্যাক্সন ইউনিভার্সিটি অব এ্যাপ্লাইড সায়েন্স এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এ্যান্ড টেকনোলজির মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি/সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর।

হেগে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক ॥ এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে আরও ডাচ বিনিয়োগ কামনা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বাংলাদেশ থেকে আরও বিশ্বমানের পণ্য আমদানি করার জন্য নেদারল্যান্ডসের কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। খবর বাসসর।

তিনি বলেন, ওষুধ, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল, পাট, বিদ্যুত, জ্বালানি বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচল খাতে বিনিয়োগ করার জন্য ডাচ কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে।

নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী লিলিয়ান প্লুমেন বুধবার নেদারল্যান্ডসের প্রশাসনিক রাজধানী হেগ নগরীতে গ্রান্ড হোটেল আমরাত কুরহাউজ-এ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অনুরোধ জানান।

বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে ব্রিফ করেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তৈরি পোশাক ছাড়াও ডাচ আমদানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ওষুধ, বাইসাইকেল, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, জুতা, সিরামিক, কেবল ওয়্যার, পিভিসি ব্যাগ, মোটর পার্টসসহ বিশ্বমানের বাংলাদেশী পণ্য আমদানি করতে পারে।

দেশের তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বশীল ও ফলপ্রসূ উপায়ে কাঠামোগত সমন্বয়ের লক্ষ্যে জোরদার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি তৈরি পোশাক খাতে প্রবেশাধিকার, অর্থায়ন ও ন্যায্যমূল্য সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোর মোকাবেলায় বাংলাদেশে একটি সম্মেলন আহ্বান করার জন্য নেদারল্যান্ডসের প্রশংসা করেন।

ডাচ বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন যে, নেদারল্যান্ডস খাদ্যের মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে।

লিলিয়ান প্লুমেন এমডিজি লক্ষ্যসমূহ বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচনে সাফল্য অর্জন করার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেন।

পরে ডাচ অবকাঠামো ও পরিবেশমন্ত্রী মেলানি শুল্টজ ভান হায়েজেন একই হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করেন।

বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ জ্ঞান ও উদ্ভাবনীমূলক অংশীদারিত্বের কাঠামোর মধ্যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সামর্থ্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০ কর্মসূচীর অধীনে ডাচ সরকারের সঙ্গে একটি সুদীর্ঘ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

তিনি আরও বলেন, ফরিদপুরে বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংস্কার ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে দু’দেশের মধ্যে একটি চুক্তি পানি খাতে সহযোগিতার নতুন পথ উন্মুক্ত করবে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ড্রেজার তৈরির জন্য ডাচ মন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি সাগর ও নদীতে ভূমি পুনরুদ্ধারে ডাচ সহায়তা ও সহযোগিতা কামনা করেন।

দু’দেশের মধ্যে নদী গবেষণা ও ভূমি পুনরুদ্ধার কাজে চলমান সহযোগিতার উল্লেখ করে মেলানি শুল্টজ ভান হায়েজেন বলেন যে, তাঁর সরকার বাংলাদেশ ডেল্টা প্লান ২১০০ বাস্তবায়নে আরও সহায়তা দেবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এম নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদ, বাণিজ্য সচিব হেদায়েদ উল্লাহ আল-মামুন, নৌপরিবহন সচিব শফিক আলম মেহেদী, পররাষ্ট্র সচিব মোঃ শহীদুল হক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়াল এ্যাডমিরাল এম নিজামউদ্দিন আহমেদ ও নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মুহাম্মদ বেলাল অন্যান্যের মধ্যে এসব বৈঠককালে উপস্থিত ছিলেন।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসায় ডাচ্ রানী ॥ নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বুধবার সন্ধ্যায় নেদারল্যান্ডসের হেগে রাজকীয় প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার সঙ্গে সাক্ষাত করতে গেলে রানী এ প্রশংসা ব্যক্ত করেন।