১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিভি নাটকে ধূমপান

  • নিত্য আইন লঙ্ঘন ॥ গবেষণা প্রতিবেদন

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ জনস্বাস্থ্য ও স্বার্থের কথা বিবেচনা না করেই গুরুত্বপূর্ণ আইন লঙ্ঘন হচ্ছে অহরহ। টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন সংক্রান্ত আইনের তোয়াক্কা করছেন নাটকের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টরা। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর ধারা ৫(ঙ) অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রচারিত কোন সিনেমা, নাটক বা প্রামাণ্যচিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোন গণমাধ্যমে প্রচার, প্রদর্শন বা বর্ণনা নিষিদ্ধ ও দ-নীয় অপরাধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। এমনই চিত্র উঠে এসেছে সম্প্রতি দুটি গবেষণায়। অন্যদিকে এই আইন ভাঙ্গার অপরাধে দেশের পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলকে চিঠি দিয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়। অভিযুক্ত চ্যানেলগুলো হচ্ছে আরটিভি, এটিএন বাংলা, মাছরাঙা টেলিভিশন, এনটিভি ও বাংলাভিশন। একটি গবেষণা সংস্থার অভিযোগ এবং তথ্য প্রমাণ উপস্থাপনের প্রেক্ষিতে গত পয়লা নবেম্বর মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আখতারুজ্জামান তালুকদার স্বাক্ষরিত এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।

আইন ভাঙ্গার বিষয়ে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ জনকণ্ঠকে বলেন, এই আইন প্রতিপালনের বিষয়টি চ্যানেলগুলোর হাতে। তারা যদি প্রচারের আগে ঠিকমতো নাটকগুলো দেখে তাহলে আইন ভাঙ্গতে হয় না। তাছাড়া যারা নাটক তৈরি করেন এবং অভিনয় করেন তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমি যখন অভিনয় করি তখন স্মোকিংয়ের দৃশ্য করতে বললে আমি করি না। সেই সঙ্গে যখন নাটক পরিচালনা করি তখনও আমার নাটকে এ ধরনের দৃশ্য থাকে না। আমাদের দেশে আইন লঙ্ঘন হচ্ছে, উল্টোপথে গাড়ি চালালেও কিছু হয় না। কাজেই আইনের প্রয়োগটা যখন কঠোর হবে তখন দেখা যাবে সবাই মেনে চলছে। তবে আমি মনে করি নাটক তৈরি, অভিনয় ও প্রচার সব ক্ষেত্রেই এ বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি এনভায়রনমেন্টাল কাউন্সিল (ইসি) বাংলাদেশ পরিচালিত গত কোরবানির ঈদে (২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর) বিভিন্ন জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশিত ঈদের নাটকগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণমূলক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ের মধ্যে ছয় টিভি চ্যানেলের (চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, আরটিভি, মাছরাঙা, এনটিভি ও বাংলাভিশন) মোট ৭২ নাটকের মধ্যে আটটিতেই ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এসব নাটকে প্রায় ৫০ বার ধূমপান বা তামাক সম্পর্কিত দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি নাটকে ২২ বার দেখানো হয়েছে। মোট ১৪ মিনিট এবং ৩৮ সেকেন্ডে ধূমপান বা তামাক সংক্রান্ত দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে কোন কোন নাটকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিগারেটের নামও দেখানো হয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে একই সময়ে চ্যানেল আইয়ের কোন নাটকে ধূমপান বা তামাক সংশ্লিষ্ট দৃশ্য দেখা যায়নি। আরটিভিতে ১৫ নাটকের মধ্যে তিনটিতেই ধূমপানের দৃশ্য ছিল। এর মধ্যে প্রিমার গল্প নাটকে দেখানো হয় একবার (৩৭ সেকেন্ড), যমজ ফোর নাটকে দুই বার (৫৭ সেকেন্ড), দ্য প্রমিজ নাটকে ২২ বার (চার মিনিট ৫৯ সেকেন্ড) ধূমপান বা এ সংশ্লিষ্ট দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এনটিভিতে ৯ নাটকের মধ্যে তিনটিতেই ধূমপান বা তামাক সংশ্লিষ্ট দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এই চ্যানেলে প্রচারিত দুষ্ট ছেলের দল নাটকে একবার দেখানো হয় (১০ সেকেন্ড), অতপর অরিন্দম কহিলা নাটকে দেখানো হয় ৭ বার (১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড), বুবুনের বাসর রাত নাটকে ৪ বার (৩৭ সেকেন্ড) ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। মাছরাঙা টেলিভিশনে ১১ নাটকের মধ্যে একটি নাটকে ধূমপান দৃশ্য দেখানো হয়েছে। অচেনা মেঘের সন্ধানে নাটকে ১০ বার (৩ মিনিট ৫১ সেকেন্ড) এ রকম দৃশ্য দেখানো হয়। এটিএন বাংলার ১২ নাটকের মধ্যে একটিতেও এ রকম দৃশ্য দেখা যায়নি। বাংলা ভিশনের ১৭ নাটকের মধ্যে একটিতে ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। কোট ম্যারেজ নাটকে তিনবার (১ মিনিট ৩২ সেকেন্ড) এ রকম দৃশ্য দেখানো হয়।

একই সংস্থা থেকে গত রমজানের ঈদের এক সপ্তাহজুড়ে (১৭-২৩ জুলাই) বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত জনপ্রিয় ঈদ নাটকগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণমূলক এক গবেষণায় আইন ভাঙ্গার প্রমাণ মিলেছে। গবেষণায় টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট বা টিআরপির ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রথম ছয়টি এন্টারটেইনমেন্ট টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত মোট ৭৬ নাটকের দশটিতেই ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শিত হতে দেখা গেছে। এই দশটি নাটকে মোট ৫২ বার ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল একটি নাটকেই ৩০ বার ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে এনভায়রনমেন্টাল কাউন্সিল (ইসি) বাংলাদেশের প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর ফারহানা হক অভি জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা এই দুটি গবেষণার মাধ্যমে এটিই প্রমাণ করতে চেয়েছি যে টিভি নাটকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ আইন অহরহ ভাঙ্গা হচ্ছে। গত ২৫ মে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে আইন মেনে চলতে টিভি চ্যানেলগুলোকে চিঠি দেয়া হলেও তার কোন গুরুত্ব দেখা যায়নি নাটক প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে। কেননা আমরা প্রথম গবেষণা পরিচালনা করেছি তার পরের জুলাই মাসে। পরবর্তী গবেষণা করেছি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। এই গবেষণার যে ফল তা থেকেই স্পষ্ট হয় আইনটি প্রতিপালনে সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা।

সূত্র জানায়, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী লঙ্ঘনকারীকে অনুর্ধ তিন মাস বিনাশ্রম কারাদ- বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয়দ- এমনকি পুনঃ পুনঃ অপরাধ সংঘটনের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দ-ের দ্বিগুণ হারে দ-ের বিধান রয়েছে। তবে আইনে শুধুমাত্র সিনেমায় কাহিনীর প্রয়োজনে অত্যাবশ্যক হলে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য রয়েছে এ রকম কোন সিনেমা প্রদর্শনকালে ‘ধূমপান/তামাক সেবন মৃত্যু ঘটায়’ শীর্ষক সতর্কবাণীসহ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৫ এর ৫ ধারায় বর্ণিত অন্যান্য শর্তসাপেক্ষে প্রদর্শন করা যেতে পারে বলে বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় আইনের এই বিধান প্রতিপালনের নির্দেশনা দিয়ে গত ২৫ মে সরকারী ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলোকে চিঠি দিয়েছে। এছাড়া চিঠিতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, সতর্কবাণী প্রদর্শন পূর্বক তামাক ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শনের এ সুযোগটি কেবল সিনেমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং কোনভাবেই নাটক বা প্রামাণ্যচিত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

এ বিষয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কর্মরত প্রগতির জন্য জ্ঞানের (প্রজ্ঞা) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান শিশু-কিশোর ও তরুণদের অন্যতম বিনোদন মাধ্যম হচ্ছে টেলিভশন। বলা চলে তরুণ প্রজন্ম টিভি চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে যদি ধূমপানের দৃশ্য দেখানো হয় এতে করে তাদের মধ্যে রেখাপাত করে। তারা ভাবে ‘ওমুক’ নায়ক ধূমপান করছে আমরাও করব। ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধূমপানের হাত থেকে রক্ষা করতে আইনটি কার্যকর করতেই হবে। তবে এ কথাও ঠিক যে এখনও অনেক পরিচালক, অভিনয় শিল্পী ও টিভি স্টেশন মালিকরা এই আইন বিষয়ে জানেন না। সেক্ষেত্রে সবাই মিলে সচেতন হলে আইনটি কার্যকর হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ২৪ টিভি চ্যানেল রয়েছে এবং এগুলোতে বছরে হাজার হাজার নাটক প্রচারিত হয়। এভাবে আইনভঙ্গ করে বাছবিচারহীনভাবে ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার করায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে তামাকের ব্যবহার কমানোর সরকারের মহৎ চেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।