১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অনিন্দ্যসুন্দর সাজেক ভ্যালিতে একদিন...

মোঃ সাইফুল আলম

সাজেক ভ্যালিতে যাওয়ার আগের রাতে আমাদের ভ্রমণপ্রেমী সদস্যরা ছিল কাপ্তাইয়ে। বিশাল বহর, সংখ্যায় ২৪ জন। বহু দূরের পথ, তাই ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যে সবাইকে নিয়ে রিজার্ভ করা মিনিবাসে উঠে বসলাম। প্রথমে যেতে হবে খাগড়াছড়ি। যদিও সাজেক রাঙ্গামাটিতে, তবে যাওয়ার পথ খাগড়াছড়ির দীঘিনালা হয়ে। ছবির মতো নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দিয়ে শুরু হলো আমাদের পথচলা। গত রাতের অসম্পূর্ণ ঘুমের জন্য সবার চোখেই তন্দ্রা তন্দ্রা ভাব। এভাবেই চলতে চলতে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ঘাঘর বাজারে। চা পানের বিরতিতে সবার মধ্যে একটা চাঙ্গাভাব চলে এলো। যাওয়ার রাস্তাটি ছিল সর্পিল- আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছিল সবুজ বনের সমাহার। সে কি অপূর্ব দৃশ্য।

সকাল ৯টার মধ্যে চলে এলাম খাগড়াছড়িতে। দরদাম করে নয় হাজার টাকায় ঠিক করা হলো দুটি চাঁদের গাড়ি। বান্দরবানের চাঁদের গাড়ির তুলনায় এখানকার চাঁদের গাড়ির অবস্থা খুবই করুণ। এবার কিছুটা ফ্রেশ হওয়া আর নাস্তার জন্য গেলাম সওজ-এর রেস্ট হাউসে। সেখানে প্রকৌশলী ফারুক ভাই আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ‘বাংলাদেশের ভূ-স্বর্গ সাজেক’ কথাটি প্রায় এক যুগেরও আগে শুনেছি। তখন থেকেই সেখানে যাওয়ার সুপ্ত বাসনা ছিল। কিন্তু ভয়ভীতি, অজানা আশঙ্কা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার দৈন্যদশার জন্য তা আর হয়ে ওঠেনি। কিন্তু আজ সেই অধরা সাজেক সবার জন্য উন্মুক্ত। খাগড়াছড়ি হতে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭২ কি. মি.। তবে পুরো রাস্তাই পাকা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত যতেœর সাথে সেটা তৈরি করছে। তবে আর দেরি কেন? খাগড়াছড়ি শহরকে বিদায় জানিয়ে ছুটলাম সাজেকের উদ্দেশ্যে। দীঘিনালা অতিক্রমের কিছু পর থেকে পথে আর কোন ইট-বালু বা কংক্রিটের অস্তিস্ব চোখে পড়েনি। পুরোটাই বন্য, সৌন্দর্যের ডালি সাজানো। এই রূপ আমাদের মুগ্ধ করেছে। পথে আমাদের নিরাপত্তার সহযোগিতা দিল সেনা আর পুলিশ বাহিনীর ক্যাম্পগুলো। অপ্রত্যাশিত যে কোন বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সেখানে আমাদের নাম ঠিকানা আর মোবাইল ফোন নম্বর এন্ট্রি করে রাখা হয়েছিল।

দীর্ঘ পথ, তাই কিছুটা বিরতির জন্য মাসালং বাজারে এসে গাড়ি থামল। সারি সারি দোকানে শহরের প্যাকেটজাত অনেক খাবারই পাওয়া গেল। কিন্তু সে দিকে হাত না বাড়িয়ে আমরা সবাই খেলাম ডাব আর কিছু পাহাড়ী ফল। এবার যাত্রার শুরুতেই চাঁদের গাড়ির ছাদে উঠে বসলাম। ঝলমলে রোদ, নীল আকাশে খ- খ- সাদা মেঘের ভেলা। এখন আমরা পাহাড়ের উপরের রাস্তা দিয়ে চলেছি। দূরে বহু দূরের বড় বড় সবুজ পাহাড়ের সারি দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। একটা বিষয় আমাদের নজর কেড়েছে পথে যেতে যেতে- দেখলাম রাস্তার দু’ধারে ছোট ছোট পাহাড়ী বাচ্চারা গাড়ির শব্দ পেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এসে আমাদের হাত নেড়ে নেড়ে স্বাগত জানাচ্ছে। জীপের সহকারী জানাল, এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা যদি ওদের দিকে চকলেট, চুইংগাম বা বিস্কুটের প্যাকেট ছুড়ে দেয় তবে তারা ভীষণ খুশি হয়। মনটা খারাপ হয়ে গেল, জানা ছিল না বলে তাদের জন্য কিছুই দিতে পারলাম না। তাই আপনাদের বলে রাখি, যদি কখনও সাজেক ভ্যালিতে যান তবে তাদের জন্য কিছু নিয়ে যাবেন।

ঐ যে দেখা যায় ‘সাজেক ভ্যালি’, সে কি আনন্দ। এক্ষণই পৌঁছে যাব সেখানে। কিন্তু না, এ সময়টুকু পার করতে আমাদের পাক্কা এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়েছে। কারণ, এ রাস্তাটুকু ভীষণভাবে প্যাঁচানো। আমরা যতই এগুচ্ছি মনে হচ্ছে ভ্যালি ততই দূরে চলে যাচ্ছে। তবে পুরো রাস্তার মধ্যে এ অংশটুকু একটু বেশি সুন্দর। এভাবে ঠিকই এক সময় পৌঁছে গেলাম সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় পোৗনে তিন হাজার ফুট উচ্চতার অতি প্রত্যাশিত সাজেক ভ্যালিতে। ভ্যালির উপর হেলিপ্যাডে দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ বুলিয়েছিলাম। প্রকৃতি যে এখানে কত সুন্দর, তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। সব কিছুই অসম্ভব রকম সুন্দর। পাশেই ভারতের মিজোরাম প্রদেশ, সেখানকার পাহাড়ের উচ্চতা আরও বেশি। এখানকার উপজাতিরা সবাই শিক্ষা-দীক্ষা, চিকিৎসা সেবা, হাট-বাজারসহ সব কিছুর জন্যই মিজোরামের উপর নির্ভর করে। গাড়িচালক কাঁচা রাস্তা দিয়ে আমাদের আরও একটু সামনে এগিয়ে নিল। বলল, এখানে রাস্তা শেষ, উপরে উঠলে দেখতে পাবেন পাহাড়ীদের পাড়া। জীপ থেকে নেমে খাড়া পাহাড় বেয়ে উপরে উঠে দেখলাম উপজাতীদের গ্রাম ‘কংলাক পাড়া’। স্বল্পসংখ্যক বাড়িঘরের গ্রামটিকে বেশ গোছানো আর আধুনিক মনে হলো। যতক্ষণ সাজেক ভ্যালীতে ছিলাম, অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে রেখেছিল পুরোটা সময়।