১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদ

প্যারিস যাত্রায় বাবার সঙ্গী হলাম আমিও। জাপানের মতো এ যাত্রায় আমি আমন্ত্রিত নই, রবাহূত। বাবা প্যারিস যাওয়ার বিষয়টি বেমালুম চেপে গিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেনি। তাই কাগজপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে বাবাকে চেপে ধরে বললাম, আমিও যাব। ফ্রান্সের ভিসা অফিসটি হচ্ছে গুলশানে। সেই অফিসে গিয়েও বাবা যথারীতি তার দায়সারা ভাবটি বজায় রাখল। ভাবটা এমন যে, হলে হবে না হলে নাই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এক সময় আমাদের ডাকা হলো ইন্টারভিউয়ের জন্য। বাবা (নার্ভাস হয়ে কিনা জানি না) ভিসা অফিসারকে চিৎকার করে বলল ‘আসসালামু আলাইকুম’। ভিসা অফিসার ছিলেন একজন সুন্দরী ফরাসী মহিলা, মুহূর্তের মধ্যে মহিলার চেহারা রক্তশূন্য হয়ে গেল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাবার সম্ভাষণ নয়, বরং তার নূরানী বেশভূষাই এর জন্য দায়ী। আমি ততক্ষণে ভিসা পাওয়ার সব আশা ত্যাগ করেছি।

তখন হঠাৎ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম, বাবা ওই মহিলাকে ইংরেজী ভাষায় অনূদিত তার নির্বাচিত কবিতার বইটা উপহার দিচ্ছে, আর ওই মহিলাও বইটা বেশ যতœসহকারে উল্টে-পাল্টে দেখছেন। বাবা বলল, শুধু আমাকে ভিসা দিয়ে কোন লাভ নেই, আমার মেয়েকেও দিতে হবে, তা না হলে আমাকে ভিসা দিও না। আমি যাব না। বাবার কবিতার বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ওই ভদ্রমহিলা হাসিমুখে আমাদের দু’জনকেই বিকালে এসে ভিসা কালেক্ট করতে বললেন। আমি তো অবাক।

বাবার জন্য আমি, নাকি আমার জন্য বাবা এমন সহজে ভিসা পাচ্ছেÑ ঠিক বুঝতে পারছি না।

বাসায় ফিরে এসে প্রথমেই দেখে নিলাম আগামী এক সপ্তাহের ওয়েদার ফোরকাস্ট। বেশ শীত থাকবে প্যারিসে, তাপমাত্রা ৬ থেকে ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করবে। তবে মাঝেমধ্যে সূর্যদেবও উঁকিঝুঁকি দেবেন। আরও যা দেখে নিলাম তা হচ্ছে, ওই সময়, ওই দেশে কী কী বিশেষ দিবস আছে। এতে করে যেমন অপ্রত্যাশিত অনেক অনুষ্ঠান, এক্সিবিশন এবং প্যারেডের সাক্ষাত পাওয়া যায় তেমনি ওই দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটা সুযোগ পাওয়া যায়। দুঃখের ব্যাপার, প্যারিসে তখন সে রকম কিছুই হচ্ছিল না। তার চেয়েও বেশি দুঃখের ব্যাপার হলো, প্যারিসের দর্শনীয় স্থানের যে দীর্ঘ তালিকা আমার মামা আমাকে লিখে দিয়েছেন, তা এক মাসে শেষ হওয়ার নয়, অথচ আমার হাতে সময় মাত্র ৭-৮ দিন।

হাতে গরম কাপড়ভর্তি স্যুটকেস আর মাথায় দর্শনীয় স্থানের তালিকার বোঝা নিয়ে আমি রওনা দিলাম আমার প্রিয় স্বপ্নের নগরী প্যারিসে।

ফ্রান্সে গিয়ে ভার্সাইয়ের জগদ্বিখ্যাত রাজপ্রাসাদ দেখা ছিল আমার আগ্রহÑ তালিকার শীর্ষে। শুনেছি ভার্সাই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রাজপ্রাসাদের মধ্যে একটা এবং এর দেয়ালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নিজের হাতের আঁচড়ে তৈরি শিল্পকর্ম স্থান পেযেছে। না, পেইন্টিং হিসেবে নয় বরং ওয়ালপেপার হিসেবে। এই দৃশ্য নাকি নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রথম দিন কয়েকবার ভুলভাল মেট্রো নিয়ে যখন মেরি দ্য ক্লিশে থেকে ভার্সাই নগরীর মাঝপথ বরাবর পৌঁছেছি, তখন এক স্টেশনে দেখা হলো এক কানাডিয়ান তরুণীর সঙ্গে। কিছুক্ষণ কথা হওয়ার পর তার মেট্রো এসে গেল, চলন্ত মেট্রোতে উঠতে উঠতে আমাকে দেখে চিৎকার করে সে যা বলল, তার অর্থ হচ্ছে আমরা ভুল পথে যাচ্ছি বা ভুল করছিÑ এই জাতীয় কিছু। ভার্সাই দেখার উত্তেজনায় আমরা তার কথা শুনেও না শোনার এবং বুঝেও না বোঝার ভান করলাম।

বাবা ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদের প্রকা- আকৃতি দেখেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল এবং রাজারা যে নিজেদের সুখের জন্য কাড়ি কাড়ি অর্থ নষ্ট করেছে, এসব স্থাপত্যকর্ম দেখতে আসাটা যে কত বড় বোকামি তা সবিস্তারে বর্ণনা করতে শুরু করল। ভার্সাই প্রাসাদের গেটে কাচের বোর্ডে আটকানো একটা ছবি তার কমন পড়ে গেল। এই ছবিটা নাকি ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯) সময়কার ছবি, যখন ফ্রান্সের বিদ্রোহী প্রজারা এই রাজপ্রাসাদটি দখল করে নিয়েছিল।

ভার্সাইয়ের সামনে দেখলাম, সারি সারি লোক দাঁড়িয়ে আছে ভিড় করে আর প্রকা- এক যন্ত্রদানব ভার্সাইয়ের সৌন্দর্যবর্ধনকল্পে একমনে মাটি খুঁড়ে যাচ্ছে। আমার চোখে যখন ভার্সাইয়ের সৌন্দর্য দেখার স্বপ্ন, যেখানে প্রাসাদের দেয়ালগুলো শুধু সোনা দিয়ে নয়, অমূল্য শিল্পকর্ম দিয়ে মোড়ানো আর প্রাসাদের পেছনের দিগন্তবিস্তৃত বাগান; তখন এই যান্ত্রিক দৃশ্যটি সহ্য করতে পারল না আমার মন। আমি আমার দৃষ্টি পরিবর্তন করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার যাত্রাপথের দিকও পরিবর্তন করতে হলো। কেননা ভার্সাই প্রাসাদের জন্য সেদিন ছিল সাপ্তাহিক ছুটি।

১৬৮২-১৭৮৯ প্রায় এক শতাব্দী ধরে ভার্সাই ছিল প্যারিসের রাজপরিবারের আবাসস্থল। ফরাসী বিপ্লবের প্রারম্ভে লুই ১৩ শিকার করার জন্য প্যারিসের বাইরে একটি ভবন নির্মাণ করান। তখন কে জানত যে এই সামান্য ভবনটিই হয়ে উঠবে পৃথিবীর সবচেয়ে বিলাসবহুল এবং চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের প্রাসাদ ভার্সাই।

লুই ১৪ শিকার ভবনটিকে নিজ বাসভবনে রূপান্তরিত করার জন্য আর্কিটেক্ট হিসেবে নিযুক্ত করেন লুইস লা ভউ, প্রাসাদের রং এবং অলঙ্করণের জন্য চার্লস লে ব্রুন এবং ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্ট হিসেবে নিযুক্ত হন এ্যান্ড্রি লে নটরে। ৩৭ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে শুরু হয় প্রাসাদ পরিচর্যা। আনা হয় ১ হাজার ৪০০ ঝরনা এবং ৪০০ নতুন ভাস্কর্য।

বেশকিছু সংস্কারের পর হারডুইনÑ মানসার্ট নামক একজন আর্কিটেক্ট এই প্রাসাদে দ্বিতীয় তলা এবং অতুলনীয় ঐশ্বর্যম-িত আয়নাঘরটি সংযোজন করেন, যদিও প্রাসাদ তৈরি শেষ হতে হতে ঘনিয়ে আসে লুই ১৪-এর জীবনাবসান কাল। প্রাসাদটির অলঙ্করণ দেখে যেতে পারেননি তিনি।

জুন ১৭২২-এ লুই ১৫ মসনদ সরিয়ে নিয়ে আসেন ভার্সাইয়ে। ৩৬ হাজার শ্রমিক নিয়ে ভার্সাইয়ের সৌন্দর্যবর্ধনের পরিশ্রম চলতে থাকে পরবর্তী শতাব্দী পর্যন্ত। এই প্রাসাদে ৫ হাজার মানুষের আতিথ্য গ্রহণের মতো ব্যবস্থা ছিল। সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয় ফ্রান্স। প্রচুর সম্পদ, রাজ্য চলে যায় ইংল্যান্ডের হাতে। লুই ১৫-এর নাতি লুই ১৬ রাজক্ষমতা পান পৈতৃক সূত্রে। ফ্রান্সের নিদারুণ আর্থিক দুর্গতি সত্ত্বেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ভার্সাইয়ের বাগানটিকে নতুন করে সাজিয়ে তোলেন এবং একটি নতুন পাঠাগার নির্মাণ করান। তার স্ত্রী মেরি এ্যানটরনিটেও থেমে ছিলেন না। কিছুদিন পরপরই তিনি তার ব্যক্তিগত বাসস্থানে নতুন কিছু সংযোজন করাতেন এবং পরে নতুন করে সাজাতেন। ১৭৮৮ সালে ফ্রান্স সরকারীভাবে দেউলিয়া ঘোষিত হয়। পরের বছরই বিক্ষুব্ধ প্রজার একটি দল খাদ্যের দাবিতে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে বসে, বিশেষ করে রানীর প্রাসাদের অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জানা যায় এই প্রজা বিদ্রোহে মহিলাদের অংশগ্রহণই ছিল বেশি। পুরো রাজপরিবারকে বন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয় প্যারিসে। পরবর্তীকালে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট এই প্রাসাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে এর সংস্কার করেন।

যে নিজে চেষ্টা করে না, ঈশ্বরও তাকে সাহায্য করেন না। অতএব, এ্যানা মাসির সঙ্গে দেখা হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আমি বায়না ধরলাম ভার্সাই দেখার। এ্যানা মাসির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার প্যারিস দর্শনের ইচ্ছেগুলো বাক্সবন্দী হয়েছিল, এ্যানা মাসিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তাই সেগুলো প্রজাপতির মতো পাখনা মেলল। পরদিন সকালেই রীতিমতো উড়তে উড়তে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে। যথারীতি বিশাল লাইন। তবে এ্যানা আন্টির সাংবাদিকতার আইডি কার্ড থাকায় কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়া গেল। এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, যে কোন দেশের সাংবাদিকদের জন্য ভার্সাইয়ে প্রবেশমূল্য একদম ফ্রি। প্যারিসজুড়েই লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিকদের জন্য আছে নানান সুযোগ-সুবিধা। ভার্সাইয়ের বিশ্বালত্ব দেখলে মনে হয় একজীবনে এর পরিকল্পনা করে এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখে যাওয়া মানব জীবনের কর্ম নয়। ভার্সাইয়ে প্রতিটি ধূলিকণায় প্যারিসের রাজপরিবারের সৌন্দর্য পিপাসার যে খোঁজ পাওয়া যায়, তাতে জীবিত অবস্থায় তো নয়ই মৃত্যুর পরও তাঁরা এই রাজবাড়ির মায়া ত্যাগ করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। রাজবাড়ির হলঘরের একদিকের প্যাসেজের দুই পাশে সারি সারি পাথরের তৈরি সৈন্য। মনে হয় অবৈধ যে কোন অনুপ্রবেশকারীকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে মুহূর্তেই। বিশাল ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম, সারি সারি কক্ষ। একটি কক্ষে সারা দেয়াল জোড়া লাল গালিচা, তো আরেকটি কক্ষ সবুজে মোড়া। সবচেয়ে সুন্দর হচ্ছে আয়নাকক্ষ (ঐধষষ ড়ভ গরৎৎড়ৎ)। এই হলঘরটির একপাশের দেয়াল আয়নার, আরেক পাশেরটা কাঁচের। সুউচ্চ জানালা দিয়ে দেখা যায় বিশ্ববিখ্যাত ভার্সাইয়ের বাগান। আয়নাঘরের দুদিকে একটু পর পরই সারিবাধা সাত ফিট উঁচু নারী মূর্তিগুলো যথাসম্ভব হাত উঁচু করে ধরে আছে আলোদানি। তাদের দেহভঙ্গিমা কোমল, আকর্ষণীয়। তবু মনে হয় যেন বাতাসের বেগ উপেক্ষা করেই তারা আলোকিত করে রাখবে এই স্বর্ণখচিত প্রাসাদটিকে। আয়নাঘরের ছাদ শোভিত হচ্ছে নানান রাজ শিল্পীদের হাতে আঁকা ইমপ্রেশনিস্ট স্টাইলের ঐশ্বরিক দৃশ্যসংবলিত ছবি দিয়ে, যা আবার আটকানো আছে কারুকার্য খচিত ধাতব সোনালী ফ্রেমে। প্রাসাদের বিভিন্ন কক্ষের ছাদ এবং দেয়ালও একইভাবে ডেকোরেট করা। প্রতিটি ছবির প্রতিটি চরিত্রের পরিহিত কাপড়ের প্রতিটা ভাঁজ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে ছবিতে। কোথাও যেন এতটুকু কার্পণ্য করা হয়নি, যেন কেউ দেখে বলতে না পারে যে, এখানে আরেকটা স্কাল্পচার বা এই ছবিতে আরেকটা কিছু আঁকলে ভাল হতো।

নাই মামার ভার্সাইয়ের বদলে কানা মামার ভার্সাই দেখে এলাম বলা চলে। কারণ গ্রীষ্ম শুরু না হওয়াতে ভার্সাই দেখার জন্য সময়টা ছিল অব সিজন। ফলে বঞ্চিত হতে হলো ভার্সাই-উদ্যানের অপরিসীম সৌন্দর্য থেকে। গ্রীষ্মকালে ভার্সাইয়ের চারদিক জুড়ে খেলা চলে নানা রঙের ফুলের। প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে বাগানের দিকে তাকালে এর শেষ দেখা যায় না, ইচ্ছা করে দৃষ্টিটা যদি আরও বিস্তৃত করতে পারতাম তাহলে বোধহয় শেষ সৌন্দর্যটাও বাধা পড়ত চোখে। ভার্সাই উদ্যানের খাঁজে খাঁজে প্রস্তর মূর্তিগুলো এমনভাবে রাখা যে হঠাৎ করে হয়ত মনে হলো পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে দেখলাম একটা মানবমূর্তি। কিছুক্ষণ আগেও যা চোখে পড়েনি। ভার্সাইয়ের একটা রহস্য আছে, যা মানুষের সৃষ্টির মাধ্যমে তৈরি হলেও কৃত্রিম বলে মনে হয় না, হয়ত এর বিশালত্বই এই রহস্যের স্বাদটাকে সংরক্ষণ করে।

এই মাত্রা পাওয়া