২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গীতা ॥ এ যেন সিনেমার গল্প

ভারতে এসে পরিবারের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল বজরঙ্গি ভাইজানের মুন্নি। অবশেষে অনেক চেষ্টার পর তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয় পাকিস্তানে থাকা তার পরিবারের কাছে। এটা সিনেমার ঘটনা। তবে অনেকটা এই ঘটনাটিই যেন ঘটে গেল ভারতের ‘মুন্নি’ গীতার জীবনে। সালমান খান অভিনীত ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ নামের ছবিটিতে দেখানো হয়, ভারতে এসে মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যায় ছোট্ট একটি পাকিস্তানী মেয়ে। ঘটনাচক্রে, পর্দার সেই মেয়েটিও ঠিক গীতার মতো কথা বলতে পারত না! দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষমেশ এক ভারতীয় যুবকের হাত ধরে বাড়ি ফেরে মেয়েটি। সিনেমাটির জনপ্রিয়তা সীমান্ত পেরোতেই সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে গীতার কাহিনী। ফেসবুকের কল্যাণে ভারত-পাকিস্তান দু’দেশেই চলে সত্যিকারের ‘মুন্নি’ গীতাকে নিয়ে আলোচনা। পাকিস্তানে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর তা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন গীতা। ব্যাকুল হয়ে পড়েন বাড়ি ফেরার জন্য। এ খবর ফলাও করে প্রচারিত হয় বিভিন্ন মিডিয়ায়। শুরু হয় গীতাকে নিজ দেশ ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।

তাই তো ২৬ অক্টোবর সোমবার দিনটি গীতার কাছে ছিল অন্য দিনগুলো থেকে আলাদা। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টায় পাকিস্তান থেকে দিল্লীতে পা দেন গীতা। পরনে ছিল তার লাল-সাদা সালোয়ার কামিজ। ওড়ানাটাকে মাথার ওপর সুন্দর করে ঘোমটার মতো করে জড়ানো। গোটামুখেই ছড়িয়ে রয়েছে প্রশান্তিমাখা হাসি। ইন্দিরাগান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সময়ে সেই হাসিটাই যেন আরও কয়েক পর্দা বেড়ে গেল! কতদিন পর দেশে ফিরল সে। তা প্রায় ১৩ বছর! গীতার সঙ্গে থাকেন তাকে আশ্রয় দেয়া পাকিস্তানী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইদি ফাউন্ডেশনের সদস্যরাও। এক বিরল আয়োজনে ইদির সদস্যদেরও রাষ্ট্রীয় মেহমানের মর্যাদা দেয় ভারত সরকার। গীতার প্রত্যাবর্তনের পরপরই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এক টুইট বার্তায় জানান, ‘ঘরের মেয়েকে স্বাগত।’

গত আগস্ট মাসে বিহারের বাসিন্দা জনার্দন মাহাতো গীতাকে তার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে বলে দাবি করেন প্রথমে। তার কথা, গীতার আসল নাম হিরা। একটি মেলায় হারিয়ে গিয়েছিল সে। জনার্দনের পরিবারে রয়েছে তার দ্বিতীয়পক্ষের স্ত্রী এবং সাত সন্তান। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুষমা স্বরাজের নির্দেশে পাকিস্তানে ভারতীয় হাইকমিশনার টিসিএ রাঘবন ও তার স্ত্রী দেখা করেন গীতার সঙ্গে। এ সময় গীতার পরিবারের একটি ছবিও দেখানো হয় তাকে। ওই ছবি দেখে গীতা চিনতে পারেন তার বাবা, সৎমা ও ভাইবোনদের। এরপর শুরু হয় সরকারীভাবে গীতাকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া। তবে গীতাকে তাদের সন্তান বলে দাবি করে আরও তিনটি পরিবার।

আজ থেকে তেরো বছর আগে...

অন্যদিনের মতো সেদিনও দিল্লী থেকে লাহোর স্টেশনে পৌঁছেছিল সমঝোতা এক্সপ্রেস। ট্রেন থেকে বাকি যাত্রীরা নেমে গেলেও একা বসেছিল মেয়েটি। পাক-রেঞ্জার্সরা তাকে সেদিন যখন ট্রেনের কামরায় খুঁজে পেয়েছিল, তখন তার বয়স কত হবে, বড়জোর সাত-আট বছর! যাই জিজ্ঞেস করা হয়, কোন জবাব না দিয়ে শুধুই ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পরে বোঝা যায়, মেয়েটি কথা বলতে পারে না। এমনকি, রেঞ্জার্সরা যা বলছিলেন, সে কথাও শুনতে পাচ্ছিল না সে। মূকবধির মেয়েটি ঠিক যেন ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর মুন্নির বছর তেরো আগের সংস্করণ! পাঞ্জাব রেঞ্জার্স দফতরের এক কর্তার চোখে পড়ায় তাকে নিয়ে গিয়ে তুলে দেন ইদি ফাউন্ডেশন নামের লাহোরের একটি সমাজকল্যাণমূলক সংস্থার হাতে। তারপর অনেক চেষ্টা করেও খোঁজ মেলেনি তার পরিবারের। এতদিন সেখানেই বেড়ে উঠেছে সে। সেখানেই তার নাম দেয়া হয় গীতা। মোবাইল ফোনে ভারতের মানচিত্র দেখিয়ে ইশারায় গীতা শুধু বোঝাতে পেরেছিল সে ভারতীয়। শুধু তার মনে পড়ে বাড়ির ঠিকানা। তাই বার বার খাতা-কলম টেনে নিয়ে লিখে ফেলে ‘১৯৩’। পুলিশের মনে প্রশ্ন ওঠে, ‘১৯৩’ আসলে কী? হারিয়ে যাওয়া গীতার বাড়ির নম্বর? উত্তর আজও অজানা। এটুকু জানা, ভারতের বাড়িতে ফিরতে চাই একজন ভাইজান, বজরঙ্গি ভাইজান।

পাকিস্তানের ইদি ফাউন্ডেশনের প্রধান ফয়সাল ইদির কথায়, ‘১৩ বছর আগে ছোট্ট মেয়েটাকে এখানে নিয়ে এসেছিল পাঞ্জাব রেঞ্জার্সরা। বহু চেষ্টা করেও আমরা তার বাড়ির লোকদের খুঁজে পাইনি।’ তবে এরপরও লড়াই ছাড়েননি ফয়সাল। প্রথমে তাকে লাহোরে আনা হয়, তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় করাচির দফতরে। এরপরে করাচির দায়িত্বে থাকা হোমের প্রধান বিলকিস ইদিই ওই মেয়ের নাম দেন গীতা। বিয়েও হয়েছে তার। নিজের মতোই এক মূকবধির ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছে সে।

ঠিক কী হয়েছিল ১৩ বছর আগে? পাকিস্তান পুলিশের বরাত দিয়ে খবর প্রকাশিত হয়, হঠাৎ করেই পাকিস্তানে পৌঁছে যায় গীতা। কীভাবে পাকিস্তানে এলো সে, হাজার চেষ্টা করেও বলতে পারেনি সে। এরপর একদিন পুলিশ কর্মীদের কাছে ম্যাপ দেখে কেঁদে ফেলে ছোট্ট গীতা। প্রথমে ঝাড়খে র ম্যাপ দেখায়, পরে তেলেঙ্গানাকেই আঙুল দিয়ে বার বার দেখাতে থাকে। তবে কথা বলতে পারে না বলে কিছুই সেসময় বলে ওঠা হয়নি তার। পরে গীতা আঙুল দিয়ে দেখায় যে, তারা সাত ভাইবোন। লিখতে দিলেও লিখতে পারেনি ছোট্ট গীতা। বার বার সে টেনে নিয়েছে হিন্দি ম্যাগাজিন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটিও বহুবার চেষ্টা করে মেয়েটির পরিবারের সন্ধান পেতে। তবে সাড়া মেলেনি দু’দেশের তরফে। কিন্তু একটা সিনেমাই বদলে দেয় গোটা সমীকরণটা। শুরু হয় গীতাকে ঘরে ফেরানোর নয়া উদ্যোগ।

মাস কয়েক আগেই পাকিস্তানে মুক্তি পায় ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ ছবিটি। সেটি দেখার পরেই আবারও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন গীতা। মানবাধিকারকর্মী আনসার বুরি ফেসবুকে লাগাতার প্রচার করেন গীতাকে নিয়ে। আজ গীতা অনেক বড়। কয়েকদিন আগেই পাক-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ছবি দেখে নিজের বড় মেয়ে হিরাকে শনাক্ত করেছিলেন জনার্দন মাহাতো। দুই সরকারের নির্দেশ মেনে নিতে রাজি হয়েছেন তিনি ডিএনএ পরীক্ষা করাতেও। বলছেন, ‘ডিএনএ কেন, যে কোন পরীক্ষাতেই আমি পাস করব। কেননা, ও আমারই মেয়ে।’ দীপাবলির আগে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আবেগে ভাসছেন জনার্দন। কিন্তু, সেদিন কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা? জনার্দনের দাবি, ২০০৪ সাল। বিহার থেকে গিয়ে তিনি সেই সময় পাঞ্জাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বড় মেয়ে হিরা একদিন জলন্ধরের কর্তারপুরের একটি বৈশাখীমেলায় গিয়েছিল অনেকের সঙ্গে। সেখান থেকে কীভাবে যেন হারিয়ে যায় সে। অনেক খোঁজ করেও তারা সন্ধান পাননি তার। এদিকে গীতার ফিরে আসার খবরে পুরো গ্রামে এখন খুশির আমেজ। অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করছে গীতার জন্য। তারা মনে করেন, গীতা গ্রামে ফিরে এলে যে গ্রামটি বহুদিন ধরে কর্তৃপক্ষের কাছে অবহেলিত ছিল, তা এখন সবার নজরে আসবে। কোসি নদীর তীরে অবস্থিত কাভেরা ধাপ নামের ওই গ্রামটিতে আসবে বিদ্যুত থেকে শুরু করে বিশুদ্ধ পানি, রাস্তাঘাট, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, যার সবকিছুই ছিল তাদের কাছে অধরা। তবে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। নিজেকে গীতার বাবা হিসেবে দাবি করেছিলেন জনার্দন মাহাতো। কিন্তু বিমানবন্দরে ‘মেয়ে’ চিনতে পারেনি ‘বাবা’কে। এরপরেই বাড়ে জটিলতা। সুষমা জানিয়ে দেন, আপাতত ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যতদিন গীতার পরিবারের সন্ধান না পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন পুনর্বাসন কেন্দ্রে রাখা হবে তাকে। নিজের পরিবারের কাছাকাছি এলেও, গীতা পাকিস্তানে ফেলে এলো অন্য এক পরিবারকে। ২৩ বছরের জীবনের বেশির ভাগটাই যে তাদের সঙ্গে কাটিয়েছে এই তরুণী! আর কখনও দেখা হবে কি ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে? না, জানে না কেউই! দু’দেশের দুই পরিবারের চোখেই তাই অশ্রু-আনন্দ ও বেদনার!