১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলা সাহিত্যে ঋতুবৈচিত্র্য

  • মোঃ সাইদুজ্জামান

প্রকৃতি তার বিচিত্র স্বভাবের অভিব্যক্তি ঘটিয়ে শিল্পরসিক মানুষ মাত্রকেই অভিভূত করে। বিশ্ব প্রকৃতিতে রূপের যে প্রাচুর্য তাকে ভিত্তি করেই বিভিন্ন দেশে আবহাওয়াগত কারণে এক এক দেশের প্রকৃতি তার আন্তর রূপের প্রকাশ ঘটায়। প্রকৃতির বৈচিত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও মাধুর্য প্রকৃতিপাগল মানুষের মনে ঘটায় ভাবের উন্মেষ; ফলে সাহিত্যে রূপ লাভ করেছে প্রকৃতি, যার অন্যতম অনুষঙ্গ ঋতুবৈচিত্র্য। বাংলা সাহিত্যেও এর প্রভাব কম নয়। প্রথমেই আসা যাক মধ্যযুগের কাব্যে। বড়ু চ-ীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে দয়িতার ভালোবাসার গভীরতাকে বোঝাতে কবি ঋতুবৈচিত্র্যের প্রভাবের কথা অকপটে ব্যক্ত করেছেন। রাধার ‘চৌমাসিয়া বিরহে’র বর্ণনা প্রসঙ্গে কবি বাংলার বর্ষা ও শরতের রূপ, রীতি, রস ও প্রভাব প্রতিপত্তির বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন এভাবে

শ্রাবণ মাসে ঘন ঘন বরিষে

সেজাত সুতিআঁ একসরী নিন্দ না আইসে।

আশিন মাসের শেষে নিবড়ে বারিষী

মেঘ বহিআঁ গেলে ফটিবেক কাশী।

তবে কাহ্নহ্ন বিণী হইব নিফল জীবন

অর্থাৎ, শ্রাবণ মাসে মেঘের ঘন বর্ষণ। শয্যায় একলা শুইয়া আমার ঘুম আসে না। ... আশ্বিন মাসের শেষে বর্ষা নিবৃত্ত হয়। মেঘ কাটিয়া গেলে কাশ ফুটিবে। তখন কানু বিনা জীবন নিষ্ফল হইবে।

বিদ্যাপতির রাধা বিশেষ বিশেষ ঋতুর প্রভাবে প্রিয়-সান্নিধ্য কল্পনায় অল্পতেই কাতর হয়। ভরা বাদলের মাসে রাধিকার অনুরাগের গভীরতাকে কবি তুলে ধরছেন এভাবে-

এ সখি হামারি দুখের নাহিক ওর,

এ ভরা বাদর মাহ ভাদর

শূন্য মন্দির মোর ॥

ঋতুবৈচিত্র্যের মানুষের মন, এমনকি দেহেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, বিদ্যাপতি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের অনুষঙ্গ সৃষ্টিতে এক্ষেত্রে উপমার প্রয়োগ করেছেন নিম্নোক্তভাবে-

‘শীতের উড়নী পিয়া গিরিষের বা

বরিষার ছত্র পিয়া দরিয়ার না।’

গোবিন্দ দাসের পদে বর্ষার বর্ণনা বেশি। তিনি রাধার অভিসারের চিত্রে বর্ষাকে উপস্থাপন করেছেন অলঙ্কারসমৃদ্ধ ভাষায়Ñ

মন্দির বাহির কঠিন কবাট।

চলইতে শঙ্কিল পঙ্কিল বাট ॥

তঁহি অতি বাদর দরদর রোল।

বারি কি বারই নীল নিচোল ॥

কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তাঁর চ-ীমঙ্গল কাব্যে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে প্রভাব-সঞ্চারী এদেশের ষড়ঋতুর বিকাশ বৈচিত্র্যকে চমৎকার কাব্যরূপ দিয়েছেন।

ভেরে-ার থাম ওই আছে মধ্যঘরে।

প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে ॥

কিংবা,

আইল বসন্ত রিতু প্রচ- তপন

অশোক কিংশুক ফুটে বাসন্তি কাঞ্চন ॥

ভারতচন্দ্রের রচনায় ঋতুর বর্ণনা খুব বেশি না থাকলেও ‘অন্নপূর্ণার অধিষ্ঠান’ নামক একটি অংশে তিনি মধুঋতু বসন্তের বর্ণনায় উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। বসন্তের আগমনে প্রকৃতির রাজ্যে রূপ ও রসের যে ঢল নামে, কবি ভারতচন্দ্র ঋতুরাজ বসন্তের সেই আবির-রাঙা সাজসজ্জাকে অপরূপ কবি ভাষায় প্রকাশ করেছেনÑ

মধুমাস প্রফুল্ল কুসুম উপবন।

সুগন্ধি মধুর মন্দ মলয় পবন ॥

কুহু কুহু কুহু কুহু কোকিল হুঙ্কারে।

গুন গুন গুন গুন ভ্রমর ঝঙ্কারে ॥

বাংলা প্রবাদ-প্রবচনেও ঋতুবৈচিত্র্যের চমৎকার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। বিভিন্ন ঋতুতে আবহাওয়াঘটিত যে পরিবর্তন, তাতে ফসল-ফলনে কিছু তারতম্য আসে। খনার বচনগুলোতে কৃষকদের এ সম্পর্কে নানা উপদেশ দেয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য এসব উপদেশ যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত। যেমন-

আষাঢ়ের পঞ্চদিনে রোপয়ে যে ধান।

সুখে থাকে কৃষিবল বাড়য়ে সম্মান ॥

কিংবা

কার্তিকের উন জলে

খনা বলে ফুল ফলে ॥

কলা গাছ হাতির প্রিয় খাদ্য। কার্তিকে কলার ঝাড় এত বাড়ন্ত হয় যে একটি চাকমা প্রবাদে বলা হয়েছেÑ

কার্তির কলা আহ্ তিয়্যে থেলিন পারে।

অর্থাৎ কার্তিকে অধিক উৎপন্ন কলাগাছের ঝাড় হাতিও ঠেলতে পারে না।

সামাজিক ও লৌকিক দিক থেকে ঋতুভেদে বাংলাদেশের প্রবাদ-প্রবচনগুলোর মূল্য যথেষ্ট। চট্টগ্রামের একটি প্রবাদÑ

আশ্বিন্ত রাঁধি কাতিত খায়।

যেই বর মাগে, হেই বর পায় ॥

বাংলাদেশের বিভিন্ন ঋতুতে উৎপন্ন শাক, সবজি, ফলমূল ও বিভিন্ন খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি ইঙ্গিত করে সিলেট অঞ্চলে যে প্রবাদ আছে, তার একটি নমুনাÑ

চৈত-অ চলিতা, বৈশাখ-অ নলিতা

আর-অ দৈ, মাঘ-অ খৈ।

অর্থাৎ চৈত্র মাসে চালতা, বৈশাখ মাসে নলিতা বা পাট শাক, আষাঢ় মাসে দৈ এবং মাঘ মাসে খৈ খাওয়া উচিত। কারণ মৌসুমী খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ব্রজাঙ্গনা কাব্যে তিনি হৃদয়হরা বসন্তকে বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে চিত্রিত করে শ্রীরাধার আনন্দ বিহারের মনোময়ভুবনে স্থাপন করেছেন, তাতে কবির উপস্থাপনায় রাধার বিরহের আর্তির প্রকাশ সুপ্ত থাকেনি।

ফুটিল বকুল ফুল কেন লো বকুলে আজি

কহতা, স্বজনি?

আইলা কি ঋতুরাজ? ধরিলা কি ফুলসাজ

বিলাসে ধরণী? [বসন্তে, ব্রজাঙ্গনা]

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের রচনায় ঋতুবৈচিত্র্য বাস্তবঘন, নির্মম অথচ যথার্থ এবং রসসমৃদ্ধভাবে এসেছে। তাঁর কবিতায় ষড়ঋতু পঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। সে বর্ণনায় মানুষের অন্তর বাহির সর্বক্ষেত্রে ঋতুর অপ্রতিহত প্রভাবের বিষয়টি যেমন তাদের স্বভাব চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চিত্রিত হয়েছে, তেমনি সেই চিত্রণে ঈশ্বরগুপ্ত তাঁর মননের সহচর ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের প্রবণতাকে পরিহার করতে পারেননি। গ্রীষ্মের দারুণ তাপদাহ বর্ণনায় তাঁর কৌতূহলোদ্দীপক চিত্রায়ণÑ

সধবা হইল যেন বিধবার প্রায়।

কেহ আর অলঙ্কার নাহি রাখে গায় ॥

সদাই চঞ্চল মন বস্ত্র খুলে থাকে।

ইচ্ছা করে অঞ্চলেরে অঞ্চলে না রাখে ॥

রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির বিমোহন সৌন্দর্য অনুভব করেছেন বাংলার ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যের মধ্যে। তিনি তাঁর কাব্যভাবনাকে অনায়াসে ছড়িয়ে দিয়েছেন ষড়ঋতুর অনাবিল ঐশ্বর্য ও বিচিত্রতার মধ্যে। নতুনের বার্তা বহন করে গ্রীষ্মের শুরুর মাস বৈশাখকে কবি আহ্বান করেছেন এভাবেÑ

এসো এসো এসো হে বৈশাখ।

তাপস নিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,

বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক ॥

যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,

অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক ॥

জলভারাতুরা বর্ষা রবীন্দ্রনাথের চোখে কখনো নবযৌবনের প্রতীক, কখনো বিরহকাতর হৃদয়ের দহন-জ্বালার প্রকাশ। তবে বর্ষা যে মানুষের হৃদয়রাজ্যে সম্রাটের মতোই পরাক্রমশালী এবং বিশ্বপ্রকৃতিকে শ্যামলে সবুজে কখনো সতেজ। কখনো ঘনঘোর বর্ষণাপ্লুত ঝড়-ঝঞ্ঝায় তাকে ছিন্নভিন্ন করে তোলে- এই বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ঋতুদের মধ্যে বর্ষার অধিষ্ঠান কিছুটা গৌরবের, কিছুটা শ্লাঘার এবং কিছুটা ভয়ের। সে কারণেই সম্ভবত কালিদাস, বিদ্যাপতি ও রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে এক বিশেষ শিল্পদৃষ্টিতে উপলব্ধি করেছেন। ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ বর্ষার এই দ্বৈতসত্তার পরিচয়টি তাঁর কাব্যভাবনায় এভাবে তুলে ধরেছেন-

ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে

জলসিঞ্চিত ক্ষিত্রি সৌরভরসে

ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা

শ্যামগম্ভীর সরসা।

নবঘন মেঘবিধুর বর্ষাশেষে শরত আসে কবির মনে নীলাঞ্জনের মাধুরী লেপন করে। কবির শরত-বন্দনায় ধরণীর শুভ্রসুন্দর মূর্তির উদ্ভাসনই প্রধানভাবে লক্ষ করা যায়। কবি তাঁর হৃদয়ের অর্ঘ্য নিবেদন করে শরতকে আহবান করেনÑ

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা-

নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা ॥

হেমন্ত প্রকৃতির ঐশ্বর্যের ঋতু নয়, কিন্তু পাকা ধানের ঋতু। সোনার ধানে মাঠ ভরে যায়। কবি কুয়াশাচ্ছন্ন হেমন্তের রিক্ততায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেও ধরাপৃষ্ঠে তার দানের অপরিমেয়তা সম্পর্কে ইঙ্গিত করেনÑ

ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।

দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে ॥

শীত পুরোপুরিভাবেই জরাজীর্ণ ও রিক্ততার ঋতু। পত্রহীন ডালপালা নিয়ে ন্যাড়া মাথায় বিষণœ গাছপালা-তরুলতা যেন কোন আগমনীর প্রতীক্ষা করে। কিন্তু শীতের এই শূন্যতার মধ্যেও এক ধরনের সৌন্দর্য কবির মুগ্ধমনে আবেশ সঞ্চার করে। ফসল তোলার এই ঋতু যে মানুষের গোলাঘরে ঐশ্বর্যের ইঙ্গিত দেয়, সেই বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিত হয়ে গেয়েছেনÑ

পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে,

আয়, আয়, আয়।

ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে

মরি হায় হায় হায় ॥

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার পরেই বসন্তের বর্ণনায় উচ্ছ্বসিত হয়েছেন বেশি। এ সময়ে কচিপল্লবে ডালপালা আবার পূর্ণ হয়। পুষ্পসৌরভে চারদিক আমোদিত, কোকিলের কুহুরবে বিরহকাতর হৃদয় প্রিয়সঙ্গ-কামনায় অধীর হয়। এই অসাধারণ প্রভাব-সঞ্চারের জন্যই কবিরা বসন্তকে ঋতুরাজ বলে অভিহিত করেছেন। বসন্তের এতসব বৈশিষ্ট্য মেনে নিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঋতুরাজের নানা আড়ম্বরের মধ্যে নাম-না-জানা কোন অচেনার উপস্থিতি লক্ষ করে দখিনের দুয়ারে তাকে আহ্বান করেছেন-

আজি দখিন-দুয়ার খোলা

এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো ॥

অন্যান্য কবির মতো নজরুলের শিল্পচৈতন্যেও ষড়ঋতুর মধ্যে বর্ষার প্রভাব বেশি। নজরুল যে অনন্ত বিরহের কবি, তাঁর বর্ষা-বর্ণনায়ও সেই ভাবের স্ফূরণই স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। যেমন-

এ ঘোর শ্রাবণ নিশি কাটে কেমনে।

হায়, রহি রহি সেই মুখ পড়িছে মনে ॥

বিজলীতে সেই আঁখি

চমকিছে থাকি থাকি

শিহরিত এমনি সে বাহু-বাঁধনে ॥

জসীমউদ্দীন বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবনের চাহিদাকে ষড়ঋতুর খেয়ালী প্রকাশের যে ধারা, তাঁর বর্ণনার মধ্য দিয়ে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমন- বসন্তের শেষ ও গ্রীষ্মের শুরুতে পল্লী বাংলায় যে ভীষণ খরা দেখা দেয়, তাতে মাঠ ঘাট যেন পুড়তে থাকে; এই অবস্থায় এক পশলা বৃষ্টির জন্য গ্রামের লোকের যে আকুল প্রার্থনা তার চিত্র নিম্নরূপ-

চৈত্র গেল ভীষণ খরায়, বোশেখ রোদে ফাটে,

এক ফোঁটা জল মেঘ চোঁয়ায়ে নামল না গাঁর বাটে।

আড়িয়া মেঘা, হাড়িয়া মেঘা, কুড়িয়া মেঘার নাতি

নাকের নোলক বেচিয়া দিব তোমার মাথার ছাতি।

কৌটা ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘের গায়

আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায় ॥ (নকশী কাঁথার মাঠ)

জীবনানন্দ দাশের কবিতায় শিল্পচৈতন্যের যে জাগরণ, প্রকৃতির বিচিত্রতা ও রহস্যের অনুসন্ধানে তাঁর যে নান্দনিক অভিযান তার অন্তরালে ঋতুবৈচিত্র্য নীরবে প্রভাব সঞ্চার করে। জীবনানন্দ রূপসী বাংলার কবি এবং তাঁর সেই বাংলা ষড়ঋতুর মাধ্যমেই বেশি স্ফূর্ত হয়েছে। ‘ধূসর পেঁচার মতো ডানা মেলে অঘ্রাণের অন্ধকারে’, ‘হেমন্ত সন্ধ্যায় জাফরান রং-এর সূর্যের নরম শরীর; ‘হিমের রাতে শরীর ‘উম’ রাখবার জন্য দেশোয়ালীরা সারারাত মাঠে; ‘ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকবো-ধীরে পউষের রাতে’ কিংবা ‘ফাল্গুনের জ্যোৎ¯œায় হরিণেরা জানে শুধু তাহা’Ñ এ রকম অসংখ্য পদে জীবনানন্দ তাঁর কল্পনার বিষয়কে রূপ দিতে গিয়ে অবলীলায় বাংলার ষড়ঋতুর উল্লেখ করেছেন।

বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় বর্ষার স্বাভাবিক রূপ থাকলেও কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর কবিতায় বর্ষার একটানা বর্ষণ কøান্ত কলকাতার নির্মম ছবি অঙ্কিত হয়েছে। কলকাতা নগর জীবন শ্রাবণের ধারায় অলস মন্থর অথচ জনতার স্রোত জীবন-জীবিকার সন্ধানে নিরন্তর অক্লান্ত মিছিলে শরীক, এই বর্ণনা দিয়েছেন তিনি এভাবেÑ

শ্রাবণের ঘাম। শ্রাবণের ¯œান ঝরে ঘাসে-শুধু ঘাসে

ট্রাম লাইনের পাশে

কালিগঞ্জে।

ছাতা-ঢাকা মাথা। বর্ষাতিতে অস্পৃশ্য পারীর

ক্লান্ত, ব্যস্ত, জুতো-বদ্ধ পা [ঘাস-বুদ্ধদেব বসু]

বাংলাদেশের সাহিত্যে কবিদের মধ্যে ঋতুবৈচিত্র্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এ প্রসঙ্গে আবদুল মান্নান সৈয়দ-এর কথা উল্লেখ্য। তিনি তাঁর একটি কবিতায় গ্রীষ্মের প্রাসঙ্গিক বর্ণনায় ঋতুর বাস্তবঘন বৈচিত্র্যের কথা বিস্মৃত না হয়েও পরাবাস্তব ভাবনায় জীবনের সৌন্দর্য অবলোকন করেছেন; তাতে বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তবতার যেন একটি মিলন সেতু বাঁধা হয়েছে।

দারুণ খরায় আমি পেয়ে গেছি তরমুজ-ক্ষেত

ফুটেছে শ্রীহর্ষ আজ অতলান্ত বেদনা সমেত।

প্রথম বর্ষণে কোটি খুলেছে অঢেল গন্ধরাজ।

কৃষ্ণচাঁদ মরে গিয়ে করতলে সূর্য জ্বলে আজ।

স্বচক্ষে দেখেছি এ উড়ে চলে গন্ধময় সুর।

ছিঁড়েছি অনন্ত থেকে মুহূর্তের একটি আঙুর।

রবীন্দ্রনাথ কবিতায় ষড়ঋতুকে যেমন অন্তরঙ্গ অতিথির মতো আবাহন করেছেন, তেমনি গদ্যে সেই অতিথিকে তাঁর নিজস্ব কবিত্বের সৌরভে সুরভিত করে বাণীবদ্ধ করেছেন। কবির ব্যঞ্জনাশক্তির মাহাত্ম্যে সঞ্জীবিত হয়ে ঋতুরা যেন মানবচরিত্রে রূপ লাভ করে সশরীরে পাঠকের সামনে উপস্থিত হয়েছে। ঋতুর এই অনর্গল প্রকাশ রবীন্দ্র সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিক। সেজন্য ষড়ঋতু সম্পর্কে তাঁর উক্তিÑ

‘ঋতুতে ঋতুতে যে ভেদ সে কেবল বর্ণের ভেদ নহে, বৃত্তিরও

ভেদ বটে। মাঝে মাঝে বর্ণ সংকর দেখা দেয়- জ্যৈষ্ঠের পিঙ্গল

জটা শ্রাবণের মেঘস্তূপে নীল হইয়া উঠে, ফাল্গুনের শ্যামলতায়

বৃদ্ধ পৌষ আপনার পীত রেখা পুনরায় চালাইবার চেষ্টা করে। কিন্তু

প্রকৃতির ধর্মরাজ্যে এ সমস্ত বিপর্যয় টেকে না।’

নজরুলের সৃজনশীল মানস চৈতন্যের গতিময় ধারা ছিল বৈশাখী ঝড়ের ন্যায় উদ্দাম। সাহিত্যে কবি যে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁর জীবনের মূলেই ছিল সেই মন্ত্র। বন্ধনহীন জীবনেই ছিলো তাঁর আনন্দ। হয়তো বৈশাখের ঝড় সেকারণেই কবির এতো প্রিয়।

‘সহসা এলো ঊর্ধ্ব গগণে বৈশাখী ঝড়। প্রগাঢ় নীলকৃষ্ণ মেঘমালাকে জড়িয়ে। ঘন ঘন গম্ভীর ডমরু ধ্বনিতে, বহ্নি বর্ণা দামিনী-নাগিনীর ত্বরিত চঞ্চল সঞ্চারণের আমার বাহিরে-অন্তরে যেন অপরূপ আনন্দ তরঙ্গায়িত হয়ে উঠলো। সহসা আমার কণ্ঠে গান হয়ে, সুর হয়ে আবির্ভূত হলো ‘এল রে প্রলয়ঙ্কর সুন্দর বৈশাখী ঝড় মেঘমালা জড়ায়ে।’ আমি সজল ব্যাকুল কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলাম, ‘তুমি কে?’ মধুর সহজ কণ্ঠে উত্তর এলো ‘তোমার প্রলয়-সুন্দর বন্ধু।’

বাংলাদেশে এক এক ঋতুর আগমন উপলক্ষে জীব-জীবন ও প্রাণীকুলে যে সাড়া জাগে, প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য তার সঙ্গে মিশে গিয়ে এদেশের মায়ামমতাপ্লুত ছবিটিকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। হেমন্তের প্রাক্কালে বাংলাদেশের এই সংবেদনশীল ছবিটি নিরীক্ষণ করেছেন কায়েস আহমেদ। তাঁর নিরীক্ষিত সেই ছবিটি হচ্ছেÑ

‘আল ঝাঁপিয়ে পড়া ধান গাছ পায়ে পায়ে জড়িয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে কর্মী ইঁদুর খুটখুট সড়সড় আপন কাজ করে যাচ্ছে। আকাশে অজস্র তারার খই ফুটে আছে। বাওনদের বিধবা মেয়ের মেচেতা-পড়া ফর্সা মুখের মতো গোল চাঁদ আর আশ্বিনের বাতাস, পায়ের নিচে শিশির, বকুল ফুলের মতো নরম স্পর্শে ভিজিয়ে দিচ্ছে।’

বাংলা সাহিত্যে এমন কবি ও লেখক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাঁরা ঋতু প্রেমিক নন, যাঁদের গল্প কবিতার ফ্রেমে উঠে আসেনি ষড়ঋতুর সৌন্দর্য ও দহন। তবে, বাংলা সাহিত্যে বর্ষা ঋতুই বোধকরি অনেক জোরালোভাবে বার বার সাহিত্যে এসেছে। আগামী দিনের যারা লেখক, যারা শব্দের ক্ষেতে চাষ দিয়ে সোনা ফলাবেন, তারাও ঋতুবৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়ে মুখর হয়ে উঠবেন, আবিষ্ট হবেন এমন প্রত্যাশা চিরন্তন...।