১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দীপন হত্যায় ফুলগাজী থেকে একজন আটক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ফেনী জেলার ফুলগাজী থেকে মুফতি জাহিদ হাসান মারুফ নামে একজনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাকে জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তরফ থেকে মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও দীপন হত্যায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। মারুফকে কোন্ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, সে বিষয়টি পরিষ্কার করেনি ঢাকা মহানগর পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেয়ার কথা রয়েছে বলে পুলিশের তরফ থেকে জানানো হয়েছে।

দীপনের ওপর অন্তত তিন মাস নজরদারি করার পর তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকা-ের ধরন ও ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত পর্যালোচনা করে এমন তথ্যই মিলেছে। হত্যাকারীরা প্রশিক্ষিত এবং প্রযুক্তিবিদ্যায় বিশেষভাবে পারদর্শী বলেও নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। দীপন হত্যায় অনেককেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। আর শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতেও দীর্ঘদিন নজরদারির পরই হামলা চালানো হয় বলে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ভোরে মারুফকে ফুলগাজী উপজেলার আমজাদহাট ইউনিয়নের উত্তর তারাকুচা গ্রাম থেকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, ফুলগাজীর মুফতি জাহিদ হাসান মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে তাকে আটক বা গ্রেফতার দেখানো হয়নি। একটি মামলার বিষয়ে তথ্য পেতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে কোন্ মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, সে বিষয়টি তিনি জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকাশক দীপন হত্যা, শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল ও দুই লেখক ছাড়াও বিভিন্ন সময় ব্লগার ও লেখক হত্যা এবং হামলার বিষয়ে মুফতি মারুফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ১৩১ নম্বর জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের (৪০) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘাড় ও গলা কেটে হত্যা করা হয় তাকে। হত্যার পর খুনীরা শাটারে তালা লাগিয়ে যায়। রক্ত পড়ে শাটারের নিচ দিয়ে সামনের ফ্লোর ভিজে লেগে ম্যানেজার ও স্থানীয়দের চোখে পড়ে। এরপরই উদ্ধার করা হয় দীপনের লাশ। উদ্ধারকালে দীপনের মাথাটি কম্পিউটারের কী-বোর্ডের ওপর উপুড় করা অবস্থায় পড়েছিল।

জাগৃতি প্রকাশনী থেকে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে হত্যাকা-ের শিকার মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী ড. অভিজিত রায়ের লেখা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ ও ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ নামের দুটি বই প্রকাশিত হয়।

আর একই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার লালমাটিয়ার সি ব্লকের ৮/১৩ নম্বরের পাঁচতলা বাড়ির চতুর্থ তলায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর কার্যালয়ে হামলায় আহত হন প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল (৫০), লেখক ও ব্লগার প্রকৌশলী তারেক রহিম (৪২) এবং রণদীপম বসু (৪০)। এ প্রকাশনা সংস্থাটি থেকে নিহত অভিজিত রায়ের লেখা ‘সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’ ও ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ নামে দুটি বই প্রকাশিত হয়। বই প্রকাশ করার পর থেকেই হতাহতরা নানাভাবে হুমকি পাচ্ছিলেন।

তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস ধরে দীপনের ওপর নজরদারি করছিল হত্যাকারীরা। হত্যাকা-ের ধরন ও জব্দকৃত আলামত পর্যালোচনায় তেমন ধারণাই পাওয়া গেছে। হত্যাকারীরা প্রশিক্ষিত এবং শিক্ষিত। হত্যাকারীদের প্রযুক্তি সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান থাকার বিষয়টিও তদন্তে ধরা পড়েছে। দীপনের হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ইতোমধ্যেই ৮টি সিসি ক্যামেরার পাঁচ দিনের ফুটেজ পর্যালোচনা চলছে। প্রচুর ফুটেজ পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। ফুটেজ দেখে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে অনেককেই। তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। হত্যাকারীরা হত্যাকা-ের বিষয়ে প্রচুর সতর্কতা অবলম্বন করেছে, যাতে সহজেই ধরা না পড়ে। মাস্টারপ্লান অনুযায়ী এ ধরনের হত্যাকা-গুলো ঘটানো হচ্ছে। দীপন হত্যা এবং মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলা একসূত্রে গাঁথা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীপন হত্যা ও মোহাম্মদপুরে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলা করে প্রকাশকসহ তিনজনকে হত্যাচেষ্টা একসূত্রে গাঁথা। এ দুটি হামলার সঙ্গে ইতোপূর্বে ব্লগার রাজীবসহ অন্যান্য ব্লগার হত্যার ধরনের মিল রয়েছে। হত্যাকা-ে ব্যবহৃত অস্ত্র একই ধরনের। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর সদস্য। বিভিন্ন দিক মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। এসব হত্যা ও হামলার পর বিভিন্ন নামে দায় স্বীকার করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলার ঘটনার সঙ্গে বাড়ির তিনজনের যোগসূত্র থাকতে পারে। বাড়ির তিনজন ছাড়াও সন্দেহের তালিকায় রয়েছে আরও বেশ কয়েকজন। তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।