১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উত্তরায় বিদেশী দম্পতির ওপর হামলা

  • হামলাকারী গ্রেফতার;###;ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরও হতে পারে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দুই বিদেশী হত্যার পর আবারও এক বিদেশী দম্পতির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তিনজন ওই দম্পতির বাসায় হামলা চালায়। হামলাকারীরা দম্পতির মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে। এরপর ৬ লাখ টাকা লুটে নেয়। হামলাকারী একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অপর দুই সহোদরকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের সূত্রধরে এবং ব্যাংক থেকে উত্তোলিত টাকা লুটের উদ্দেশেই হামলার ঘটনাটি ঘটে। আহত দম্পতি তাইওয়ানের নাগরিক। তাদের কড়া নিরাপত্তায় রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থিত বেসরকারী এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আহত স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ। স্বামীর অবস্থার দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাঁধাগ্রস্ত করতে স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়াও তৃতীয় কোন গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখতেই এমন হামলা চালিয়েছে কিনা তদন্তে সে বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানাধীন ৪ নম্বর সেক্টরের ১৪/এ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে প্রায় ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন আহত দম্পতি। স্বামী ওয়াং মিং চি (৫৪) ও স্ত্রী লিলি হাওয়া (৫০) মূলত ব্যবসায়ী। তারা গাজীপুরে প্লাইউডের ব্যবসা করেন। সেখানে তাদের জিং জিং ইয়ার স্টার নামে প্লাইউডের দরজা তৈরির একটি কারখানা আছে। পাশাপাশি তারা বায়িং হাউসের ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। ঘটনার সময় কলিং টিপে তিন জন, যারা সবাই আহত বিদেশী দম্পতির পরিচিত। এক সময় তারা ওই প্লাইউড কারখানায় কর্মরত ছিল। পরবর্তীতে তারা নিজেরাই ব্যবসা শুরু করে। ব্যবসার সূত্রধরে তাদের সঙ্গে আহত দম্পতির লেনদেনও রয়েছে। এ সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা করতেই তারা ওই দম্পতির বাসায় যান। বিষয়টি জানানো পর নিরাপত্তা প্রহরী গেট খুলে তিন জনকে বিদেশী দম্পতির বাসায় ঢুকতে দেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই ওই তিন জনের বিদেশী দম্পতির বাসায় যাতায়াত রয়েছে।

আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে তিন জন ঘরের দরজা জানালা লাগিয়ে দেয়। গোপন আলাপ আলোচনা থাকতে পারে বিধায় বিদেশী দম্পতি বিষয়টি তেমন আমলে নেননি। এরপর তিন জন সঙ্গে থাকা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ওই বিদেশী দম্পতিকে মারধর করে। হামলাকারীরা দম্পতির মাথায় ও ঘাড়ের আঘাত করে। আহত করার পর বাসায় থাকা ৬ লাখ টাকা নিয়ে দ্রুত হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। আহত দম্পতির চিৎকারের বাড়ির লোকজন তাদের উদ্ধার করে। পরে পুলিশের সহায়তায় তাদের এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের মধ্যে স্ত্রী পুরোপুরি সুস্থ। স্বামীর অবস্থারও দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। আহতদের কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, আহতদের জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে। জবানবন্দী অনুযায়ী হামলাকারীরা আহতদের পূর্ব পরিচিত। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও মোটা অঙ্কের টাকার লোভে হামলাকারীরা এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। হামলাকারীদের মধ্যে জাহাঙ্গীর নামে একজনকে সাভারের বাইপাইল এলাকা থেকে শুক্রবার গ্রেফতার করা হয়েছে। হামলায় অংশ নেয়া অপর দুই সহোদরকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও মোটা অঙ্কের টাকা লুণ্ঠনের উদ্দেশে ওই দম্পতির বাসায় হামলা চালানোর ঘটনাটি ঘটতে পারে। হামলাকারীরা ওই বিদেশী দম্পতির পূর্ব পরিচিত। তিন হামলাকারীর মধ্যে জাহাঙ্গীর নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। অপর দুই হামলাকারীকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। হামলার পেছনে আরও কোন কারণ আছে কিনা সে বিষয়টি তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় ক্রিকেট দল পূর্ব নির্ধারিত বাংলাদেশ সফর বাতিল ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গুলশান-২ নম্বরের ৯০ নম্বর সড়কে ফিল্মিস্টাইলে ৩ সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলযোগে গুলি চালিয়ে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আইসিসিও কো-অপারেশন নামের একটি এনজিওর বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সিজার তাভেলাকে (৫০) হত্যা করে। সিজার এনজিওটির ‘প্রফিটেবল অপরচ্যুনিটিজ ফর ফুড সিকিউরিটি’ কর্মসূচীর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন। এনজিওটি বাংলাদেশে পানি, স্যানিটেশন, রিফিওজি সমস্যা ও পুনর্বাসনসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজ করে থাকে।

এনজিওটি ২০১২ সাল থেকে গুলশান-১ নম্বরের ৩০ নম্বর সড়কের সমুদ্র নামের ৬ তলা বাড়ির তৃতীয় তলায় কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। ২০১৩ সালে সেটি বাংলাদেশ এনজিও ব্যুরোর তালিকাভূক্ত হয়। নিহত সিজার চলতি বছরের ১৫ মে বাংলাদেশে যোগদান করেন। সিজার বসবাস করছিলেন গুলশান-২ নম্বরের ৫৪ নম্বর সড়কের ১১/বি নম্বর বাড়ির ৫/২ ফ্ল্যাটে। ঘটনার সময় সিজার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সুইমিং পুলে সাঁতার কেঁটে বাসায় ফিরছিলেন।

হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নেয়া যুবদলের ৩ নেতাকর্মী ও এক বিএনপি কর্মীসহ ৪ জন গ্রেফতার হয়। তাদের মধ্যে ২ জন ইতোমধ্যেই আদালতে সিজার হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে উঠে আসে সিজার হত্যাকা-ের সার্বিক তদারকির দায়িত্ব পালনকারী বিএনপির আলোচিত নেতা ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার এমএ কাইয়ুমের ছোট ভাই এমএ মতিনের নাম। বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পথে পালিয়ে যাওয়ার সময় যশোর বেনাপোল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাকে ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গত ৩ অক্টোবর রংপুরে একই কায়দায় সন্ত্রাসীরা গুলি চালিয়ে হত্যা করে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে (৪৮)। গ্রামের পথে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলযোগে তিন সন্ত্রাসী ওই জাপানীকে একই কায়দায় গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এমন ঘটনার পর পশ্চিমা অনেক দেশই বাংলাদেশে অবস্থিত তাদের নাগরিকদের চলাফেরার বিষয়ে বাড়তি সর্তকর্তা অবলম্বন করার বিষয়ে কয়েক দফায় নির্দেশনা জারি করে। আর সাইট ইন্টেলিজেন্স নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে দুই বিদেশী ও সম্প্রতি প্রকাশক দীপন হত্যা ও এক প্রকাশকসহ দুই লেখকের ওপর হামলায় দায় স্বীকার করে আনসার আর ইসলাম নামের একটি সংগঠন নিজেদের আল কায়েদা ও আইএসের ভারতীয় উপমহাদেশের শাখা দাবি করে হামলার দায় স্বীকার করে।

যদিও বিভিন্ন সময়ই দুই বিদেশী হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশে আল কায়েদা বা সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন আইএসের কোন তৎপরতা নেই। তাদের অনুসারী থাকতে পারে। এমন প্রচার প্রপাগা-া চালানো পরিকল্পিত। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। বিদেশী ও লেখক এবং প্রকাশকদের ওপর হামলা করে দেশে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখার চেষ্টা করছে স্বাধীনতাবিরোধীরা।