২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ্যামনেস্টি মানবাধিকারের বাইটিংডগে পরিণত হয়েছে

  • মুহম্মদ শফিকুর রহমান

ষড়যন্ত্র চারদিকে। ষড়যন্ত্র ঘরে বাইরে। ষড়যন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানচর্চায়, ষড়যন্ত্র রাজনীতির মঞ্চে। ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে। প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে লুটে নেয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সাহসী মিছিলকে, প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছে আলোর মিছিলে নেতৃত্বদানকারী জয়বাংলার বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে।

এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী দানবদের তথাকথিত মানবাধিকার (?) রক্ষার পথে নেমেছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এবং একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী আলবদর কমা-ার আলী আহসান মুজাহিদ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি নেতা (মূলত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী মুসলিম লীগ পরিবারের উত্তরাধিকার) সাকা চৌধুরীর (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) যুদ্ধাপরাধের (একাত্তর) দায়ে সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক মৃত্যুদ- প্রদান ও মৃত্যুদ-ের দড়ি যখন খুব কাছাকাছি ঠিক তখনই এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের মৃত্যুদ- রহিত করে মুক্তির দাবি জানান। সংস্থাটির ধৃষ্টতা এমন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে যে, তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরও বিচার দাবি করার দুঃসাহস দেখিয়েছে।

গত ২৭ অক্টোবর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে সংস্থার সাউথ এশিয়ান রিসার্চ ডিরেক্টর ডেভিড গ্রিফিথ প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেছেন, ‘শুধু একপক্ষের বিচার হবে কেন, যুদ্ধাপরাধ করা (?) মুক্তিযোদ্ধাদের কেন বিচার হবে না?’ (জনকণ্ঠ, ৩১ অক্টোবর ২০১৫)। অথচ কে না জানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালী জাতির সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধ। পাকি হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর কর্তৃক গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানবাধিকার রক্ষার যুদ্ধ। পাকিস্তানী হানাদার সামরিক জান্তার গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-আমজনতা, পুলিশ, ইপিআর, সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে বাঙালী জয়লাভ করে।

এর আগে যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক আইনজীবীর কন্যা-জামায়াতা তথাকথিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন একাত্তরের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে। তখনই তার বক্তব্যের প্রতিবাদ ওঠে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী সংগঠন, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। তারপরই নামল আরেক ডেভিড। মূলত এই দুই ডেভিড (ডেভিড গ্রিফিথ ও ডেভিড বার্গম্যান) জামায়াত-মুসলিম লীগ এবং তাদের গোত্রীয় বিএনপির ভাড়াটিয়া। যেমন টিআইবি বিএনপি-জামায়াত জোটে ঢুকে আছে। জামায়াত-বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার পাউন্ড দিয়ে যেসব লবিস্ট নিয়োগ করেছে এই দুই ডেভিডও একই গোত্রীয় বলে নিঃসন্দেহে বলা যায়।

এ্যামনেস্টি যখন কথাগুলো বলছে তখন আমাদের সাংবিধানিক বিরোধী দলের বাইরের বিরোধী দল বা পার্লামেন্টের বাইরের বিরোধী দল নেতা বিএনপি-জামায়াত জোট নেতা বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে এক সমাবেশে বলেছেন, দেশের বর্তমান অবস্থার জন্য শেখ হাসিনা দায়ী? নিজের অপকর্মের দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানোর মতো। দেড় মাস ধরে তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। বলা হচ্ছে তিনি চিকিৎসা এবং সন্তান ও তাদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে সেখানে আছেন। সময় কাটানোই উচিত। সেই কবে দুর্নীতির মামলার আসামি হয়ে দুই পুত্র তারেক-কোকোর স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দেশ ছাড়লেন, একজন লন্ডনে অপরজন মালয়েশিয়ায় স্থায়ী হলেন, তাদের কাছে পাচ্ছিলেন না। ৮ বছরেরও বেশি সময় একা দিন কাটছিল। আমি মনে করি আরও আগেই তার যাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু যাননি। কেন জাননি? হয়তোবা জামায়াত-শিবির-জঙ্গীরা তাকে আশ্বস্ত করেছিল ‘ম্যাডাম ধৈর্য হারাবেন না, আর কটাদিন সবুর করেন, পেট্রোলবোমা মেরে পুড়িয়ে মানুষ মেরে, পুলিশ মেরে সরকারের পতন ঘটিয়ে আপনাকে ক্ষমতায় বসাব। তখন সরকারপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিয়ে বিদেশে সফরে যাবেন। না গেলেও কিছু আসে না, সরকার গঠন করার পর সন্তানদের আর বিদেশে থাকতে হবে না। নির্বিবাদে দেশে ফিরে আবার হাওয়া ভবনে বসবেন। কিন্তু তা আর যখন হলো না তখন লন্ডন যাওয়াই ভাল বেড়ানো হবে, সন্তানদের সঙ্গেও সময় কাটানো যাবে। লোকে বলে লন্ডনে পলাতক জামায়াত-শিবিরের খুনীদের সঙ্গে দেখাও হবে। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত হবে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনকে বলা তারা যেন তাকে প্রটোকল প্রদান করে।

সংস্থাটির জন্মের দিকে তাকালে দেখব ব্রিটিশ লেবার আইনজীবী পিটার জেনসন দুই পর্তুগীজ ছাত্রের ওপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদ করার জন্য ১৯৬১ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের জন্ম দেন। প্রাথমিকভাবে এর ৬টি লক্ষ্য ১. নারী, শিশু, সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের অধিকারের পক্ষে ২. নির্যাতন বন্ধ ৩. মৃত্যুদ- রোধ, ৪. শরণার্থীদের অধিকারের পক্ষে ৫. মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের অধিকারের পক্ষে ৬. মানুষের মর্যাদার পক্ষে কাজ করবে। কিন্তু আজ হিউম্যান রাইটস ওয়াচডগ বাইটিংডগে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। তারা সাম্প্রতিককালে পেট্রোলবোমার বিরুদ্ধে নীরব থাকে, মিনমিন করে ১৯৭১ সালের ৩০ লাখ শহীদ ও ৫ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির ব্যাপারে, নীরব থাকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার ব্যাপারে। বরং বাইটিংডগের মতো মানবাধিকার সংরক্ষণকারীদের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে। এমনকি তারা যখন বলেন, যুদ্ধাপরাধী বিচার ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিকমানের হতে হবে তখন ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়া বা তার দলের বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায়। আরেকটি কথা বলতেই হবে, এ্যামনেস্টি মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার দাবি করার ধৃষ্টতা দেখানোর পরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোও নীরব। তাই তো সময়ের দাবি এখনই মিছিলে যাওয়ার, রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে বাঁচা যায় না।

খালেদা জিয়া একদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিথ্যা ভিত্তিহীন নোংরা বক্তব্য দিয়ে চলেছেন আর অন্যদিকে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং টিআইবি বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দিয়ে চলেছে। ইতালিয়ান ও জাপানী নাগরিক হত্যা, দীপন হত্যা, পুলিশ হত্যা কিংবা লাখ লাখ ডলার-পাউন্ড খরচ করে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দুনিয়ায় বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণার জন্য লবিস্ট নিয়োগ এসব একই সূত্রে গাঁথা। এর আগেও আমরা দেখেছি কিভাবে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করেছিল। বস্তুত উন্নয়নের যতগুলো সূচক আছে সবগুলোতে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা যে বাংলাদেশের মানুষ চিন্তাও করেনি শেখ হাসিনা নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশ কেবল খাদ্য উদ্বৃত্তই হয়নি, মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে খুব দ্রুতগতিতে। যে বাংলাদেশে জিয়া খালেদারা ভেবেছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার দূরের কথা বঙ্গবন্ধু ও ৪ নেতা হত্যার বিচারই সম্ভব হবে না, আর তারা পাকিস্তান আমেরিকার সমর্থন নিয়ে জামায়াত-শিবির, রাজাকার-আলবদরদের ওপর ভর করে ক্ষমতার ছড়ি ঘোরাবেন আর হালুয়া-রুটি ভোগ করবেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সেই হালুয়া-রুটি ভোগ করা হলো না। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও হলো, যুদ্ধাপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, শাস্তি হচ্ছে, শাস্তি (ফাঁসি) কার্যকর হচ্ছে, তখন তো খালেদা জিয়ার পাগল-পাগল লাগার কথা। তবু ভাল, পাগল-পাগল লাগেনি, কিন্তু পদে পদে ভুল করছেন। পুলিশের গায়ে হাত দিয়ে ভুল করেছেন, সশস্ত্র শিবির সন্ত্রাসীদের রাজপথে নামিয়ে ভুল করেছেন, পেট্রোলবোমা মেরে জ্বালিয়ে মানুষ হত্যা করার দায়ও তার কাঁধে। ‘বড়ভাই’দের মাঠে নামিয়ে ভুল করেছেন, হেফাজত এনে রাজধানী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ক্ষমতা দখলের ছেলেমি করে ভুল করেছেন। সর্বোপরি এখনও ভুল করছেন জামায়াত-শিবিরের ওপর ভর করে। এতে করে দলের দুই চার গ্রাম বিবেক ধারণকারী দলীয় নেতারাও আজ তার বিরুদ্ধে চলে গেছেন। জিয়ার ছোট ভাই কামালও দীর্ঘদিন পর মাঠে নেমেছেন। সরকারবিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে খালেদা আজ সৈনিকবিহীন এক অসহায় সিপাহশালার। নেতৃত্বের ভার বইবার মতো সন্তান গড়ে তুলতে পারেননি। ধীরে ধীরে বার্ধক্যজনিত পলিটিক্যাল ব্যাংক্রাপসি তাকে গ্রাস করছে চারদিক থেকে।

এরই মধ্যে গতকালের (শুক্রবার) কাগজে দেখলাম খালেদা জিয়া দেশের বর্তমান সঙ্কট নিরসনে ‘ন্যাশনাল ডায়লগ’ বা জাতীয় সংলাপ শুরু করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে কার সঙ্গে কার সংলাপ? খালেদা কি যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াত-শিবিরকে ছেড়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসতে পারবেন? তাহলে যে রসদ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া তাকে বিশ্বাস করার কোন কারণ আছে কি? ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা পার্লামেন্ট থেকেই আলোচনার ডাক দিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া সাড়া দেননি। বরং একপর্যায়ে তিনি সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দিয়েছিলেন। ৪৮ ঘণ্টা নয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শেখ হাসিনা তাকে আলোচনায় বসার জন্য সরাসরি টেলিফোন করেছিলেন। উত্তরে খালেদা জিয়ার দিক থেকে কি ধরনের অভব্য জবাব ছিল তা জাতি সংবাদপত্র ও টিভির মাধ্যমে জেনেছে। কিভাবে হবে সংলাপ? খালেদা জিয়ার সন্তান মারা গেল, শেখ হাসিনা তার বেদনা শেয়ার করার জন্য তার বাড়িতে গেলেন। অভদ্রের মতো তাঁকে বাড়িতে ঢুকতেই দেয়া হলো না। পরস্পর পরস্পরের শ্রদ্ধার জায়গাটা যদি সংকুচিত হয়ে যায় তাহলে কিভাবে হবে সংলাপ?

জামায়াতের সঙ্গে যার গাঁটছড়া বাঁধা তার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধেরপক্ষের সংলাপ কি করে হবে? রাজাকারের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সংলাপ হতে পারে না। বরং খালেদা জিয়ার উচিত হবে জামায়াত-শিবির-রাজাকার-আলবদরদের ছুঁড়ে ফেলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অগ্রযাত্রার মিছিলে শামিল হওয়া। জানা দরকার- ঠরপঃড়ৎু যধং সধহু ভধঃযবৎং, ফবভবধঃ হড়হব.

ঢাকা ॥ ৬ নবেম্বর ২০১৫

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব