১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গারো পাহাড় ॥ বিচিত্র জীবনধারা দেখতে

  • দৃষ্টি কাড়বে সাইকেল বালিকা

আঁকাবাঁকা পথ, ঘন সবুজ গারো পাহাড়, টিলা আর নদী-ছড়াবেষ্টিত প্রাচুর্যময় জনপদ নেত্রকোনার সুসঙ্গ দুর্গাপুর। দূর থেকে তাকালে মনে হয়- একখ- ঘন কালো মেঘ সেই কবে থেকে মিতালী করে আছে আকাশ-মাটির সঙ্গে। মেঘালয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এ জনপদে একদিকে যেমন ছড়িয়ে আছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন, তেমনি রয়েছে ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনধারা। আর রয়েছে মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির অপার হাতছানি। তাই বলা চলে, ব্যস্ত ও কোলাহলময় জীবনের খানিক অবসরে একটু হারিয়ে অথবা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার এক উৎকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে এই দুর্গাপুর।

কথিত আছে, সর্বপ্রথম গারোরাই গহীন জঙ্গল আর জীব-জানোয়ারদের সঙ্গে মিতালী করে এখানে বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে হাজং, কোচ, বানাইসহ অন্যান্য আদিবাসী এবং বাঙালীরাও এখানে বসতি স্থাপন করে। ফলে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের আদিবাসী ও বাঙালীদের অপার মেলবন্ধন রচিত হয় এখানে। গারো বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, টঙ্ক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, হাতিখেদা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ বহু বিপ্লব-বিদ্রোহের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে দুর্গাপুর।

গারো পাহাড় : দুর্গাপুরের সমস্ত উত্তর দিকটাই গারো পাহাড়। এসব পাহাড়ের অধিকাংশ ভারতের সীমানায় অবস্থিত। আর বাংলাদেশের সীমানায় আছে পাহাড়ী টিলা। ইচ্ছা করলে এসব টিলায় ওঠাও যায়। টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে চোখ মেললেই দেখা যায়Ñ ঘন সবুজে আবৃত বিশাল বিশাল পাহাড়। কিছু কিছু পাহাড় গড়িয়ে নিচের দিকে নেমে এসেছে ঝরণার মতো স্বচ্ছ জলধারা। স্থানীয়ভাবে এগুলোকে বলা হয় ছড়া। এসব জলাধারার জলেই চাহিদা মেটে স্থানীয় আদিবাসীদের। এখানে পাহাড় দেখার সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হচ্ছেÑ রানীখং, ভবানীপুর, বিজয়পুর, আড়াপাড়, গোপালপুর ও কালিকাপুর।

চিনামাটির খনি : দুর্গাপুরের বিজয়পুর, বিপিনগঞ্জ, গোপালপুর প্রভৃতি এলাকায় রয়েছে অনেক চিনামাটির খনি। ঘন সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাদা, লাল ও বেগুনী রংয়ের এসব চিনামাটি দিয়ে সিরামিক সামগ্রী ও টাইলস উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক পাহাড়ের তলদেশ কেটে চিনামাটি আহরণ করে। খননের সময় চিনামাটির প্রতিটি পরত থেকে বেরিয়ে আসে নানা রংয়ের স্বচ্ছ পানি। বিশাল এলাকাজুড়ে চিনামাটি আহরণের দৃশ্যও মনোমুগ্ধকর। কাছে গেলে দর্শনার্থীর দৃষ্টি কাড়বেই।

রানীখং মিশন : পাহাড়ী টিলার ওপর অবস্থিত রানীখং মিশন মূলত স্থানীয় খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী গারোদের সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তরিত গারোদের জন্য এখানে ক্যাথলিক গীর্জা, মিশন ও ধর্মপল্লী প্রতিষ্ঠিত হয়। পাহাড়ী নদী সোমেশ্বরীর কূল ঘেঁষে নান্দনিক পরিবেশে অবস্থিত এই ধর্মপল্লীর নাম ‘সাধু যোষেফের ধর্মপল্লী’। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ‘রানীখং মিশন’ নামেই পরিচিত। প্রায় আট হাজার বিশ্বাসী ভক্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ ধর্মপল্লীর সমতল থেকে ওপরের দিকে উঠতে উঠতে চোখে পড়ে সুদৃশ্য তোরণ, গারোদের ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণের ইতিহাস সংবলিত ভাস্কর্য, যিশুর মূর্তি, গীর্জা, মিশনারি উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডিসপেনসারি, ও বাগান।

রাশিমণি স্মৃতিসৌধ : রানীখং মিশনের খুব কাছেই বহেরাতলি গ্রামে অবস্থিত হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। রাশিমণি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী টঙ্ক আন্দোলনের নেত্রী। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটিশ সৈন্যদের হাত থেকে সদ্য বিবাহিত রমণী কুমুদিনী হাজংকে উদ্ধার করতে গিয়ে রাশিমণি ও তার অনুসারীদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ হয়। এতে কুমদিনী উদ্ধার হলেও রাশিমণি ও তার সহযোগী সুরেন্দ্র হাজং শহীদ হন। টঙ্ক আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিকে ধারণ করেই ২০০১ সালের ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলি গ্রামে বেসরকারী উদ্যোগে ঐতিহাসিক এই স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়। তীর-ধনুক আকৃতির স্মৃতিসৌধটি এখন দুর্গাপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। সেদিনের যুদ্ধে জীবিত টঙ্ক আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তি কুমদিনী হাজংয়েরও দেখা মিলবে ওই গ্রামে। স্মৃতিসৌধের কাছেই এক পাহাড়ী টিলায় বাস করেন তিনি।

সুসঙ্গ রাজবাড়ী : ১২৮০ খ্রিস্টাব্দে (৬৮৬ বঙ্গাব্দ) সোমেশ্বর পাঠক নামে এক সাধু দুর্গাপুরে সুসঙ্গ রাজ্য প্রতিষ্ঠান করেন। তিনি ও তার বংশধররা দীর্ঘ সাড়ে ৬শ’ বছর দোর্দ- প্রতাপের সঙ্গে এ রাজ্য শাসন করেন। ’৫৪ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হওয়ার পর রাজ্যটি বিলুপ্ত হয়। কিন্তু বেশকিছু স্থাপনা এবং নিদর্শন আজও সেই রাজবংশের স্মৃতি বহন করছে। এরমধ্যে রয়েছে, দুর্গাপুর পৌরসভার কলেজ রোডে অবস্থিত মধ্যম বাড়ি, আবু বাড়ি ও দু’আনি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, পুজোম-প, দশভূজা মন্দির, রাজপুকুর, ইন্দারা প্রভৃতি।

ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি : দুর্গাপুর পৌর এলাকায় ঢুকতেই সবার আগে দৃষ্টি কাড়ে সুদৃশ্য ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি। দুইযুগ আগে বিরিশিরি গ্রামে স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় গারো, হাজং, কোচ প্রভৃতি ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ করে যাচ্ছে। সেখানে ঢুঁ মারলেই চোখে পড়ে আদিবাসী তরুণ-তরুণী দল বেঁধে নাচ-গানের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। একাডেমির সংগ্রহশালায় গেলে দেখা যায় গারো-হাজংদের বৈচিত্র্যময় জীবনের নানা উপকরণ ও নিদর্শনের ছবি। সাজানো-গোছানো একাডেমির পরিবেশ অনেকটা পিকনিক স্পটের মতো মনে হয়।

আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা : দুর্গাপুরের বিরিশিরি, কুল্লাগড়া ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে আদিবাসী গারো, হাজং, কোচ, বানাই প্রভৃতি সম্প্রদায়ের বসবাস। এদের কারও বাড়ি সমতলে, কারও বাড়ি টিলার ওপর। গারো পাহাড়ের বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করে বসবাস এদের। আদিবাসীদের গ্রামে ঢুকলেই দেখা যায় গারো নারীদের কেউ কেউ জঙ্গল থেকে লাকড়ি কুড়াচ্ছে। আবার কেউ পিঠের ওপর সন্তান ঝুলিয়ে কাজ করছে কৃষি জমিতে। আদিবাসী সাইকেল বালিকারা দল বেঁধে ছুটে যাচ্ছে স্কুল-কলেজে। এসব দৃশ্য পরিচয় করিয়ে দেয় অন্য রকম এক জীবন বৈচিত্র্যের সঙ্গে।

এছাড়া উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ কমরেড মণি সিংহের বাড়ি, টঙ্ক স্মৃতিসৌধ, বিজয়পুরে অবস্থিত ভারত-বাংলাদেশের স্থলশুল্ক বন্দর, কারুকার্য খচিত মন্দির, গীর্জা, কমল রানীর দীঘি, গাভীনা গ্রামের জলসিঁড়ি পাঠাগার, চ-িগড় আশ্রমসহ আরও বেশ কিছু স্পট ঘুরে দেখা যেতে পারে। দুর্গাপুর পৌরসভার বুকচিরে প্রবাহিত সোমেশ্বরী নদীটিও দেখার মতো। গারো পাহাড় থেকে চপলা-চঞ্চলা ঝরণার মতো নেমে আসা এ নদী বর্ষায় রাক্ষসীর রূপ নেয়। ভাসিয়ে দেয় বিস্তীর্ণ জনপদ-ফসল। আর শুকনো মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে থাকে কয়লা ও বিশাল বালিরাশি।

দুর্গাপুর কতদূর : ঢাকা থেকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার পথ দুর্গাপুর। মহাখালী থেকে বাসে উঠতে হয়। এরপর গাজীপুর চৌরাস্তা, ময়মনসিংহ এবং নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জ বাজার হয়ে সরাসরি যাওয়া যায় দুর্গাপুরে। তবে দুর্গাপুর সদর থেকে বিভিন্ন স্পটে যেতে হয় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল, অটোরিকশা অথবা রিকশায় চড়ে। সবসময়ই যানবাহন পাওয়া যায়। মোটামুটি মানের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে দুর্গাপুরে।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া