১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিফিনবক্স

  • মোকাদ্দেস আলী রাব্বী

টিফিনের পর রিশিতার যে ক্লাসটি হয় সেটি হচ্ছে অংক। অংক স্যার ক্লাসে ঢুকেই বললেন, ‘আমি আজ তোমাদের দুটো বিষয় চেক করব। একটা হচ্ছে প্রত্যেকের হোমওয়ার্ক অন্যটি তোমাদের টিফিনবক্স।’

সবাই চমকে উঠল। স্যার টিফিন বক্স চেক করতে যাবেন কেন? আব্বু-আম্মুরা কী বলে দিয়েছে যে তাদের বাচ্চা-কাচ্চারা টিফিন ঠিক মতো খায় কি না তা যাচাই করতে হবে। রিশিতার মন খুব খারাপ হলো এবং সে টেনশন করতে শুরু করল। ও যে কোন দিনই টিফিনের খাবারটা খায় না তা আজ ধরা পড়ে যাবে নিশ্চয়। আবার ভাবল না তা ধরা পড়বে কেন? ও ওর টিফিনবক্স ছুটির পর যে হেলেনাকে দেয় সেটা তো আর কেউ জানে না। স্যার তার টিফিনবক্স ধরলে যেকোন অজুহাত দেখানো যাবে। যেমন ও বলতে পারে আজ ওর শরীরটা খুব খারাপ লাগছে এ জন্য খায়নি। অথবা বলবে যে খাবারটা আম্মু দিয়েছে তা তার একদমই পছন্দ নয়। এরকম একটা কিছু স্যারকে বানিয়ে বললেই হবে। এসব ভাবতে ভাবতে স্যার ওর সামনে চলে এসেছে। রিশিতা ভয় পেল। স্যার বললেন, ‘দেখি রিশিতা তোমার হোমওয়ার্ক।’ একথা শুনে স্বস্তি পেল। চটপট হোমওয়ার্কের খাতাটা বাড়িয়ে দিল রিশিতা। স্যার খাতা দেখে থ্যাংকইউ বলে একে একে সবার খাতা দেখা শেষ করল। এর পর সত্যি সত্যি স্যার টিফিনবক্স চেক করা শুরু করলেন। প্রথমে হামীমের টিফিনবক্স খুলতে বলল। হামীম ঝড়ের গতিতে উঠে দেখাল তার টিফিনবক্সে কিছু নেই। সে সব খেয়ে ফেলেছে। স্যার এর পর নওশিনকে ডাকলেন।

স্যার বলল, টিফিনবক্স ওপেন করো।

নওশিন টিফিনবক্স ওপেন করল। দেখা গেল ওর টিফিনবক্সে অর্ধেক নুডলস পড়ে আছে।

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, নুডলস শেষ করো নি কেন?

নওশিন জবাব দিলো, স্যার আম্মু অনেকগুলো দিয়ে ফেলেছে তো, তাই সবটুকু খেতে পারিনি।

নওশিনের জবাবে স্যার কিছু না বলে অন্যদের টিফিনবক্স চেক করতে শুরু করলেন। একে একে ইমরান, রাহাত, সুজন, বিলকিস, নাহার সবার টিফিনবক্স চেক করে রিশিতার পাশে এসে দাঁড়ালেন। রিশিতা জড়সড় হয়ে রইল। এই বুঝি স্যার তাঁর টিফিনবক্স দেখতে চায়। সবারটা যখন দেখে ফেলেছে ওরটা বাদ থাকবে কেন?

রিশিতা তুমি চোখ বন্ধ করে আছো কেন?

স্যারের এ কথায় সবাই রিশিতার দিকে তাকাল। ওযে সত্যি সত্যি ভয়ে চোখ বন্ধ করে আছে তা ও নিজেই জানে না। স্যারের কথাতে চোখ খুলল সে। বলল, জ্বী স্যার!

স্যার বলল, তুমি চোখ বন্ধ করে ছিলে কেন? তুমি কি অসুস্থ? নাকি ঘুম ধরেছিল?

রিশিতা তোত্লামোর মতো ভাব করে বলল, জ্বী স্যার! কই নাতো স্যার।

স্যার আর এ বিষয়ে না এগিয়ে বললেন, টিফিনবক্স দেখি তোমার।

ভয়ে ভয়ে হাত বাড়িয়ে নিজের টিফিনবক্সটা স্যারের হাতে তুলে দিল রিশিতা। টিফিনবক্স খুলে যা দেখার কথা স্যার তাই দেখল। রিশিতা ওর টিফিনে একদম হাত দেয়নি। তা দেখেও যেন একটুও চমকালো না। বরং টিফিনবক্স ঢাকনা পুনরায় খুলে আবার ঢাকনা লাগিয়ে স্যারের টেবিলের উপরে রাখল। বললেন, রিশিতা তুমি কি অসুস্থ? তোমার নিশ্চয় খুব খারাপ লাগছে তাই তুমি টিফিন করোনি, তাই না?

রিশিতা বলল, জ্বী স্যার।

স্যার রিশিতার জবাবকে গুরুত্ব না দিয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। বললেন, তোমাদের টিফিনবক্স নিয়ে একটা গল্প শোনাব। তোমরা শুনতে চাও?

সবাই বলল, জ্বী স্যার।

রিশিতা তখন মনে মনে খুব খুশি। এজন্য যে ওর টিফিনবক্স নিয়ে স্যার আর বেশি প্রশ্ন করেননি আবার রাগও হননি। গল্প শোনার জন্য ও নিজেও মনোযোগী হলো।

স্যার বলা শুরু করলেন।

একটা মেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত স্কুলে যায়। খুব ভাল ছাত্রী। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ভাল। ও একদিন দেখে ওর বয়সী একটা মেয়ে পথে দাঁড়িয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। মেয়েটির নাম ঝুমুর। কারণ কী জানতে চাইলে ওর মা ওকে মেরেছে বলে জানায়। কেন মেরেছে জানতে চাইলে ঝুমুর তা বলতে চায় না। বলতে না চাইলে কি হবে? মেয়েটি খুটিয়ে খুটিয়ে এক সময় ঠিক কারণ বের করে ফেলল। গত তিন চার দিন ধরে ঝুমুরদের বাড়িতে রান্না হয় না। খিদের কথা বলতে গিয়ে মার খেয়েছে। এরপর কী হলো? মেয়েটি ওর টিফিনবক্স ঝুমুরকে দিয়ে দিল। এরপর প্রতিদিন তা রুটিন হয়ে গেল। মেয়েটি ঝুমুরকে প্রতিদিন টিফিনবক্স দিতে থাকল। ঝুমুরও খুশি। বন্ধুত্ব হলো দু’জনের। স্যার তার গল্প শেষ করলেন। গল্প শেষ করে প্রশ্ন করলেন, ‘সেই মেয়েটি কে তোমরা জানো?’

সবাই জানতে চাইল, কে স্যার?

সঙ্গে সঙ্গে রিশিতা মাথা নিচু করল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। স্যার নিশ্চয় বাসাতেও বলে দেবেন।

স্যার বলল, মেয়েটি হচ্ছে তোমাদের বন্ধু রিশিতা।

সবাই তখন রিশিতার দিকে তাকাল। রিশিতা লজ্জায় আর ভয়ে মাথা নিচু করে কাঁদতে শুরু করল।

স্যার বললেন, রিশিতা তুমি কাঁদছো কেন? তুমি অনেক ভাল একটা কাজ করে আসছো নিয়মিত। এটা তো আমাদের সবার গর্বের বিষয়। তবে টিফিন না করলে শরীর খারাপ হবে। নিজের শরীরের দিকেও তো তাকাতে হবে না কি?

তবুও রিশিতা কাঁদতেই থাকল। অংক স্যার রিশিতার মাথায় হাত বোলালেন। রিশিতা চোখ মুছতে থাকল। স্যার বললেন, ‘আমি ভেবেছি ঝুমুরকে এই স্কুলে ভর্তি করে দেব। আর সবাই ওকে সহযোগিতা করব। কেমন হবে বলোতো?

সবাই বলল, খুব ভালো হবে স্যার।

এ কথা শুনে রিশিতার মন খুশিতে ভরে উঠল। ও বলল, সত্যি স্যার?

স্যার বললেন, হ্যাঁ সত্যি।

রিশিতার মন আকাশ ছোঁয়ার মতো আনন্দিত হলো।