১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাহাড়ে শান্তির পথরেখা

প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ পার্বত্য অঞ্চল হঠাৎ হঠাৎ অশান্ত হয়ে ওঠে, সর্বস্তরে সর্বতোভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা হুমকির মুখে পড়ে। সম্প্রতি পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। দীর্ঘকাল সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টিকারী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল পার্টি (এমএনপি) আত্মসমর্পণ করায় পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও এক ধাপ অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্টরা অভিনন্দন প্রাপ্য।

তবে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এখনও জিম্মি। সংঘাত, জমি দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে একাধিক সংগঠনের নামে চলছে চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের রাজনীতি। পাহাড়ী জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে পাহাড়ে শুরু হয় সশস্ত্র আন্দোলন। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে রক্তাক্ত সবুজ পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি, বারুদের গন্ধ আর চরম অশান্ত পরিস্থিতির পর সংগঠনটি ১৯৯৭ সালে সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর শান্তিবাহিনীর ১ হাজার ৯৪৭ সদস্য সহস্রাধিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও চুক্তির পরবর্তী ১৮ বছরেও পাহাড়ে পুরোপুরি শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। বরং চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে অঘোষিতভাবে কয়েকটি সংগঠনের অপতৎপরতায় অস্থির পার্বত্যবাসী। শান্তিচুক্তি নিয়েই খোদ পাহাড়ীদের একাংশের মধ্যে রয়েছে দ্বিধাবিভক্তি। চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি স্বীকার করছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। অপরদিকে চুক্তি সংশোধনের দাবিতে আন্দোলন করছে ইউপিডিএফ। এই দুটি সংগঠন পাহাড়ে বহুবার ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে অবতীর্ণ হয়েছে।

অবশ্য পাঁচ বছর আগে এমএনপি প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল বঞ্চনার বিষয়টি। ম্রো সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাদের জমিজমা রক্ষা ও সুষ্ঠু জীবনযাপন করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে তাদের নেতাদের আহ্বানে সংগঠনটি গড়ে তুলেছিল। এ সম্প্রদায়ের কিছু অংশ আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেলেও অধিকাংশই রয়ে গেছে অরণ্যে। এরা স্বাভাবিক জীবনমানের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত রয়েছে। ম্রো সম্প্রদায়ের যুবকদের মধ্যে হতাশা, নানা অভিযোগকে পুঁজি করে এমএনপি গঠিত হলেও এরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে তৎপর হয়। ফলে তাদের মাঝে গ্রুপিং সৃষ্টি হয়। এ গ্রুপিংয়ের শিকার হয়ে সংগঠনটির দুই শীর্ষ নেতা প্রাণ হারায়। সংগঠন চালানোর জন্য এরা সশস্ত্র সহিংসতায় নেমে পড়ে। শুরু করে খুন, গুম, চাঁদাবাজি, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় ও অবৈধ অস্ত্র বিক্রির ব্যবসা।

বর্তমান সরকার পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ প্রথমবার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তির মতো একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পন্ন করে পাহাড়ে স্থায়ী শান্তির পথরেখার সূচনা করেছিল। তার দেড় যুগ পর আবারও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্বিতীয়বারের মতো পাহাড়ী সন্ত্রাসী গ্রুপের আত্মসমর্পণের ঘটনা ঘটল। আমাদের প্রত্যাশা এখনও যেসব বিপথগামী পাহাড়ী শান্তির পথ থেকে সরে আছে তারাও শান্তির পথে ফিরে আসবে। সেইসঙ্গে এটাও প্রত্যাশা শান্তিচুক্তির যেসব ধারা এখনও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি সেগুলো বাস্তবায়নে গতি আসবে। এ ব্যাপারে চুক্তির দুটি পক্ষের ভেতর সম্প্রীতি ও আস্থার অভাব থাকাটা কাম্য নয়।