১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একুশ শতক ॥ টেলিভিশনের ডিজিটাল রূপান্তর

  • মোস্তাফা জব্বার

দুনিয়ার কোন মানুষের জন্যই এখন টেলিভিশন সম্প্রচার ছাড়া জীবনধারণ করা কঠিন। ঘরে থাকলে সারাদিন টিভি চলে। আবার আমরা সারাদিন বাইরে থেকে ঘরে ঢুকেই তো টিভিটা অন করি। এখনকার মানুষের তথ্য-উপাত্ত ও বিনোদনের প্রধানতম মাধ্যম হচ্ছে টিভি। সিরিয়াল দেখি, সিনেমা দেখি, নাটক দেখি, টক শো দেখি, খবর দেখি; কত কিছু। যতক্ষণ জেগে থাকি ততক্ষণ তো ওটা আমার নিজেরও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। তবে এখন সম্ভবত মনে মনে চিন্তা করতে হচ্ছে যে, এমনটি কি সামনেও থাকবে? আগামীতে টিভি সেটেই কি টিভি দেখব? স্যাটেলাইট বা টেরিস্ট্রিয়াল উপায়েই কি টিভি সম্প্রচার হবে? কি কি থাকবে টিভিতে? এমন নানাবিধ প্রশ্ন এখন সকলের মাথায় ঘোরপাক খায়।

টিভির জন্মের পর ধারণা করা হয়েছিল, কাগজ, রেডিও, সিনেমা এবং অন্য মাধ্যমগুলো হয়ত টিভির দাপটের কাছে টিকে থাকবে না। বিশেষ করে রেডিও টিভির দাপটের জন্য প্রচ- চাপের মাঝে পড়ে এবং সাম্প্রতিককালে এফএম রেডিওর জাগরণের আগে রেডিও প্রায় বিলুপ্তির পথেই চলে গিয়েছিল। অন্যদিকে কমিউনিটি রেডিও বিশেষায়িত কাজে বিশেষ অবদান রাখা শুরু করেছে। অন্যদিকে টিভি কাগজের বিকল্প হয়ে যায়নি। একটি সময় পর্যন্ত টিভির সম্প্রসারণের পাশাপাশি কাগজের গণমাধ্যম বিলুপ্ত না হয়ে বরং প্রসারিত হয়েছে। আরও ধারণা করা হয়েছিল যে, টিভির আবির্ভাবের ফলে সিনেমা হারিয়ে যাবে। বাংলাদেশে সিনেমা বিপন্ন হবার প্রধানতম কারণ নিম্ন মান ও পাইরেসি হলেও দুনিয়াজুড়ে সিনেমা একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম হিসেবে এখনও কোন না কোনভাবে টিকে আছে। হলিউড বা বলিউডে এখনও সিনেমার জয় জয়কার। এমনকি ইউটিউব সিনেমার দর্শক বরং বাড়িয়েছে। এর সহজ হিসাবটা হলো, টিভি তার নিজের প্রভাব বাড়াতে পারলেও কাউকেই বিলুপ্ত করতে পারেনি। তেমন কোন ইচ্ছাও সম্ভবত টিভির ছিল না। কিন্তু এখন প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, সামনের দিকে টিভি-রেডিও-কাগজ ইত্যাদি গণমাধ্যমের রূপান্তর কেমন করে হবে? কি রকম হবে? কতটা হবে?

বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে টিভির জন্ম হবার পর সেটি নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে সাদাকালো সরকারী টিভি ছিল। সেটি প্রচারিত হতো টেরিস্ট্রিয়াল পদ্ধতিতে। সরকারী চ্যানেল বিটিভি ছাড়া আর কারও এখনও টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের অনুমতি নেই। মাঝখানে একুশে টিভির তেমন একটি অনুমতি থাকার পরও সেটি বাতিল হয়েছে। সেই সময়ে এ্যান্টেনা দিয়ে টিভি সেটে টিভি দেখা যেত। পরে সেই টিভি স্যাটেলাইট সম্প্রচারে গেছে, রঙিন হয়েছে এবং বেসরকারী মালিকানায় বিপুলসংখ্যায় জন্ম নিয়েছে। এক সময়ে টিভি স্টুডিওকেন্দ্রিক থাকলেও এখন মাঠে ময়দানে এবং তাৎক্ষণিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। টিভির যন্ত্রপাতিতেও নানা পরিবর্তন এসেছে। ফিল্ম, বিএনসি, ইউম্যাটিক, বেটা থেকে ডিভি-এইচডির প্রবাহমান ধারায় এখন পুরোই ডিজিটাল প্রক্রিয়ার জয়জয়কার। তবে যে জায়গাটিতে তেমন কোন পরিবর্তন হয়নি সেটি হলো টিভি সেট। একসময়ে ক্যাথোড রে টিউবভিত্তিক সাদাকালো টিভি সেট এখন বড়জোর এলসিডি-এলইডি ও কালার হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড ১৯/২০ ইঞ্চির টিভি ৪২ ইঞ্চিও হয়েছে। এ্যান্টেনার যুগ পার হয়ে এখন আমরা কেবল বা ডিশ ও ডিশ লাইনের যুগে এসেছি। টিভি সম্প্রচার বিতরণের সর্বশেষ প্রযুক্তিটার নাম বোধহয় ডাইরেক্ট টু হোম। পাশের দেশ ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশেও সহসাই এই ব্যবস্থা চালু হবে বলে আমরা আশা করছি।

আপনি যদি ইন্টারনেটে টিভির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুসন্ধান করেন তবে দেখবেন কেউ বলছে টিভির ভবিষ্যৎ হচ্ছে মোবাইল ফোন, কেউ বলছেন, টিভি মানে ইন্টারনেট বা কেউ বলছে আরও নতুন কিছু। আমরা বাংলাদেশে এতসব ভাবি না। ফলে প্রচলিত ধারার সাথে যতটা নতুনত্ব আসে তাতেই আমরা তৃপ্ত হই। আমাদের টিভি দেখা মানে মহিলাদের ভারতীয় সোপ অপেরা দেখা আর চায়ের স্টল ও আড্ডাখানাসহ বাড়ির পুরুষদের বাংলাদেশী টকশো দেখা। এজন্য ডিশের কেবল লাইন হচ্ছে একমাত্র বাহন। ঘরে ১৪ ইঞ্চি থেকে ৪২ ইঞ্চি আকারের টিভি যাতে সিআরটি, এলসিডি বা এলইডি থাকতেই পারে।

কিন্তু অবস্থাটি এখন আর তেমন মনে হচ্ছে না। গত ৪ মে ২০১৫ দৈনিক প্রথম আলো ছোট একটি খবর ছাপে। খবরটি এ রকম-

“মাঠে তখন চলছে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের তৃতীয় ওয়ান ডে। আর ক্রিকেটের ভক্ত সুমন কিনা বসে আছে বাসে, আটকে গেছে যানজটে। সাধারণত জগন্নাথ হলের টিভি রুমেই বন্ধুদের নিয়ে হই-হুল্লোড় করে দেখে খেলা। কিন্তু আজ হলে ফিরতে দেরিই হয়ে যাবে, যে যানজট রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনছেন ঠিকই, কিন্তু এতে কি আর দেখার সাধ মেটে? এমন সময় ফেসবুকের একটি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘মোবাইল টিভি’ সম্পর্কে ধারণা পান সুমন। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গেই সেটা চালু করে নিলেন। বাসের সবাই মিলে জ্যামে বসেই সাক্ষী হলেন আরেকটি বাংলাওয়াশের।

কী এই মোবাইল টিভি? টুজি বা থ্রিজি মোবাইল সংযোগ ব্যবহার করে দেশের যেকোন স্থানে যেকোন সময় মোবাইলের নির্দিষ্ট এ্যাপ ব্যবহার করে মোবাইল ফোনেই টিভির সব অনুষ্ঠান দেখার প্রযুক্তি হলো মোবাইল টিভি। এই সেবা দিচ্ছে মিডিয়াকম লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সম্পর্ক বিভাগের এ্যাকাউন্ট সুপারভাইজার খন্দকার আহসানুজ্জামান বলেন, ‘মোবাইল টিভির কল্যাণে বিনোদন এখন পুরোপুরি হাতের মুঠোয় যেকোন জায়গায় যেকোন সময়।’ তিনি জানান, বাংলালিংক, রবি, টেলিটক ও এয়ারটেলের সিম ব্যবহার করে উপভোগ করা যাবে মোবাইল টিভি। জাভা, এ্যান্ড্রয়েড, আইওএস-চালিত ফোনে চলবে এটি। নির্ধারিত ফির বিনিময়ে নিবন্ধন করতে হবে। এ জন্য দিতে হবে বাংলালিংক :/(মাসিক ৪০ টাকা), টেলিটক :/(মাসিক ৮০ থেকে ১৮০টাকা), রবি :/(মাসিক ৫০ টাকা), এয়ারটেল :/(মাসিক ৭২ টাকা)।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠান ছাড়াও এতে দেখা যাবে ধারণকৃত নাটক, ছবি, টেলিফিল্ম, মিউজিক ভিডিওসহ ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। তবে সরাসরির বেলায় কেবল টিভির চেয়ে ২ সেকেন্ড পরে দেখা যাবে অনুষ্ঠান।”

খবরটি ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। সুমন বোধহয় একা নয়, অনেকেই তার হাতের মুঠোফোনে টিভি দেখে। তবে এটি বোঝার বিষয় আছে যে, টিভি দেখার যন্ত্রটা টিভি সেট থেকে মোবাইল ফোনে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। আরও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো যে মোবাইল অপারেটররা টিভি সেবা প্রদান করা শুরু করেছে। মোবাইলে যখন বিনামূল্যে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে তখন কথা বলার মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য এমন পথে চলা শুরু করাটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। মোবাইল যন্ত্রটি রেডিও শোনার, ছবি তোলার যন্ত্র হয়েই আছে। ইন্টারনেট ব্রাউজ করা ও নানাবিধ কাজে একে ব্যবহার করার এক অসাধারণ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে এই যন্ত্রটির। ফলে ডিজিটাল সভ্যতার ডিজিটাল যন্ত্র বলতে আমরা সবচেয়ে জনপ্রিয় হিসেবে মোবাইলকেই শনাক্ত করতে পারি। মোবাইলের আকার কেমন হবে, এটি এ্যাপলের আইফোন থাকবে, না স্যামসাংয়ের গ্যালাক্সি হবে না ট্যাবলেট হবে এসব নিয়ে অনেক লম্বা বিতর্ক হতে থাকবে। কেউ ট্যাবলেটকে ল্যাপটপের বিকল্প বানাবেন, কেউ স্মার্ট ফোনকে ট্যাবলেটের বিকল্প বানাবেন। তবে সম্ভবত কিছু মৌলিক বিষয় এমন হবে যে, স্মার্ট ফোন ও ট্যাবলেটে (হয়তো ল্যাপটপেও) সিম ব্যবহারের সুযোগ একটি অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। ওয়াইফাই-ব্লুটুথ নিয়ে কথা বলার দরকারই নেই।

ঘটনাটি সম্ভবত কেবল মোবাইলে টিভি দেখাতেই সীমিত হয়নি। বাংলাদেশে যারা টিভি দেখেন তারা টিভিকেন্দ্রগুলোর স্ক্রলবারে দেখেন যে র‌্যাডিয়েন্ট আইপি টিভি নামের একটি এ্যাপ দিয়ে ইন্টারনেট থেকেও টিভি দেখা যায়। এর মানেটি খুবই সহজ। আপনি ইন্টারনেটে যুক্ত থাকলেই টিভি আপনার হাতের মুঠোয়। ইদানিং ইন্টারনেটভিত্তিক টিভি পাওয়া যায়। ফলে টিভি সেটেও ইন্টারনেটের টিভি পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বেশ কিছু টিভি কেন্দ্রও নিজস্ব এ্যাপ বাজারে ছেড়েছে। সেটি দিয়েও সেই টিভির পর্দা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। একই বিষয়ে আগ্রহী হয়ে আমি কথা বলছিলাম কয়েকজন তরুণের সাথে। ওরা বাংলাদেশে বসে এ্যাফিলিয়েটেড মার্কেটিং করেন। ওদের ব্যবসার খবর জানতে গিয়ে বোঝা গেল যে ওরা প্রধানত আমেরিকার টিভি দর্শকদের জন্য খেলার বিষয়গুলোর মার্কেটিং করে। আমেরিকান টিভি চ্যানেলগুলোর স্ট্রিমিং ভিডিও ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে টাকার বিনিময়ে সম্প্রচার করা তাদের ব্যবসা। তাদের মতে আমেরিকানরা আমাদের মতো ডিশ লাইনে বা সেটটপ বক্সে টিভি দেখা এ্যাফোর্ড করতে পারে না। ওদের জন্য সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট।

যারা বর্তমানের খবরাখবর রাখেন তারা জানেন যে, এখন সরাসরি ইন্টারনেটে টিভি সম্প্রচার করতে প্রযুক্তিগত কোন সমস্যা নেই। আমি নিজে একটি ইন্টারনেট টিভি প্রতিষ্ঠানের ফিতে কেটেছি। আরও আধা ডজন টিভি কেন্দ্র ইন্টারনেট টিভি হিসেবে আত্মপ্রকাশের অপেক্ষায় আছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইন্টারনেটে সম্প্রচারিত টিভি দেখার জন্য টিভি সেটের কথা ভাবাই দরকার নেই। মোবাইল থেকে পিসি যাই হাতের কাছে যা মানুষকে ইন্টারনেটে যুক্ত করে সেটিই তার টিভি সেট। একই সঙ্গে কোথায় স্যাটেলাইট আছে, কোথায় তরঙ্গ পেলাম বা পেলাম না সেইসব ভাবনার চাইতে বড় ভাবনা হলো ইন্টারনেট সংযোগ আছে কিনা। যারা ইন্টারনেট টিভির পাশাপাশি স্যাটেলাইটেও টিভি সম্প্রচার করতে চান তাদেরকে এখন আর ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র বা ফ্রিকুয়েন্সি বা তরঙ্গ বরাদ্দ নেবার দরকার নেই। ইন্টারনেট সেই কাজটিও করে ফেলেছে।

অন্যদিকে টেলিভিশনের কনটেন্ট বিষয়টিও বর্তমানের রূপটাতে থাকছে না।

আমি আর্নেস্ট এ্যান্ড ইয়ং নামক একটি প্রতিষ্ঠানের একটি প্রতিবেদন এখানে ছোট করে তুলে ধরছি। তারা তাদের প্রতিবেদনে সামনের দিকে তাকিয়ে টিভির কথা ভাবতে বলেছে। তাদের মতে সামনের দিনে ছয়টি প্রবণতা টিভির জগতটাকে বদলাবে।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয় যে, এজন্য টিভি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দর্শকদের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এমনকি তাদের দর্শক-শ্রোতার পছন্দ অপছন্দ জানার জন্যও বিনিয়োগ করতে হবে।

আমি মনে করি, বস্তুত টিভি বলি, সিনেমা বলি, রেডিও বলি বা পত্রিকা বলি তার বাহন হিসেবে ইন্টারনেটের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে ওঠার পর এর বিষয়বস্তুর কোন সীমানা থাকবে না। ফলে বিনোদন বা তথ্য-উপাত্ত যার যা খুশি তার সবটাই ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে বিদ্যমান টিভি ব্যবস্থার আমূল রূপান্তরটা আসলে দেশে ইন্টারনেটের প্রসারের ওপর নির্ভরশীল। এখনও আমরা দেশের জেলা শহরগুলোতে থ্রিজি পৌঁছাতে পারিনি। খুব সামান্য গতিতে আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহƒত হয়। এটির পরিবর্তন মানে বাংলাদেশটারই পরিবর্তন। আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি সেটি কেবল দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মাঝে এর মূল্য আসার ওপর নির্ভরশীল। টিভি-পত্রিকা-রেডিও-সিনেমা সব মিডিয়ারই একটি গন্তব্য-ইন্টারনেট।

খুব সঙ্গতকারণেই আমি মনে করি টিভি দেখার যন্ত্র এবং সম্প্রচারের উপায়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি রূপান্তরটা এর বিষয়বস্তু বা চরিত্রেও হবে। আমি নিজে একাত্তর নিউজটিভি নামক একটি আইপি টিভির শুভেচ্ছাবাণীতে লিখেছি, “রেডিও টিভি তো ইন্টারনেটেই থাকবে। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে যেখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল মাত্র ৮ লাখ সেখানে ২০১৪ সালের অক্টোবরে সেই সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সোয়া চার কোটি। অঙ্কের হিসাবে এই ধারাবাহিকতা যদি অব্যাহত থাকে এবং যা থাকাই স্বাভাবিক তবে সামনের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ১১ কোটি অতিক্রম করবে। আমার মতে ২০২৫ সালের মধ্যে সারা দুনিয়াতে এমন একজন মানুষ পাওয়া যাবে না যার ইন্টারনেট ব্যবহার করার ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন না।

কেউ কি চোখবুজে কখনও ভেবে দেখেছেন যে, এর প্রভাবটা কোথায় কিভাবে পড়বে? অর্থাৎ পুরো জীবনটাই ইন্টারনেট নির্ভর হবে। আর এটিকে অবশ্যই ইন্টারনেট সভ্যতা বলতে হবে। এমন দুনিয়াতে জীবনটা কেমন হতে পারে? বাসাবাড়িতে ইন্টারনেটের গতি থাকবে ২ গিগাবিট। ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-কল কারখানা পরিচালিত হবে ইন্টারনেটে। জ্ঞানার্জন ইন্টারনেটে। সরকারও ইন্টারনেটে। প্রেম-ভালবাসা-সামাজিকতা-বিনোদন; তথা জীবনধারা সবই ইন্টারনেটে।

তাহলে রেডিও-টেলিভিশন কি হবে? কেউ টেলিভিশন সেটে টিভি দেখবে না? কোন এক ধরনের ডিজিটাল ডিভাইসেই থাকবে সম্প্রচার মাধ্যম এবং অন্যান্য মিডিয়া? বিটিআরসি থেকে তরঙ্গ বরাদ্দ নেবার প্রয়োজন হবে না। সেই কাজটি ইন্টারনেট সেবাদানকারীর জন্য সীমিত থাকবে। সম্প্রচারকারী ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইদথ কিনবেন। দর্শক-শ্রোতা রেডিও-টিভির সঙ্গে ইন্টারএ্যাক্ট করবে। সম্প্রচারের সময় বলতে কিছু থাকবে না। চব্বিশ ঘণ্টা বলতে কিছু নেই। ৩৬৫ দিন নামকও কিছু নেই। খবর, নাটক-প্রামাণ্য চিত্র-চলচ্চিত্র; কোনটাই কখনও মারা যাবে না। নিজের ডিজিটাল যন্ত্রে নয়, এর সবই থাকবে সাইবার আকাশে। ইন্টারনেটের মতোই সম্প্রচবার বা মিডিয়ার রাষ্ট্রীয় সীমানা বলতে কিছু থাকবে না। হতে পারে ভাষার সীমানাটাও বিলীন হবে। এসব মাধ্যমে কনটেন্টস কেবল যে সম্প্রচারকারীই তৈরি করবেন তা নয়-সাধারণ মানুষ-দর্শক শ্রোতাও অংশ নেবে এই মহাযজ্ঞে। তবে পেশাদারিত্ব বা সৃজনশীলতার সাথে কোন আপোস করা যাবে না। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং হবে সম্প্রচার মাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাণের মূল স্রোত। সম্ভবত এর চাইতে বেশি কিছু আমি এখন কল্পনাও করতে পারি না। তবে সহসাই ইন্টারনেটও থাকবে না-অন্য কোন নেটওয়ার্ক ইন্টারনেটের স্থলাভিষিক্ত হবে।

যিনি বা যারাই সামনের আগামী এক দশকের জন্য সম্প্রচার মাধ্যমে বসবাস করতে চান তার কাছে সবিনয়ে আবেদন হচ্ছে কথাগুলো মনে রাখার জন্য।

ঢাকা, ৭ নবেম্বর, ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com

www.bijoyekushe.net,ww w.bijoydigital.com