২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গো-বিতর্কে বিভক্ত ভারত!

  • তাপস মজুমদার

ভারতে নিতান্তই নিরীহ একটি প্রাণী গরুকে ঘিরে যে তুমুল বিতর্ক ও তোলপাড় চলছে তা অনেকটা হাস্যকর হলেও চিন্তা উদ্রেককারী বটে। কেননা, এ নিয়ে সেই আদিকাল থেকে চলে আসা জাত-পাত, ধর্ম-সমাজ-সংস্কৃতি, সর্বোপরি জাতীয়তার প্রসঙ্গটিও চলে এসেছে সামনে। অধিকন্তু সজ্ঞানে হোক, অজ্ঞানে হোক দেশ বিভক্তির কথাও টেনে আনছেন কেউ কেউ। গো-বিতর্কে প্রায় প্রতিদিনই সেখানে কিছু না কিছু ঘটছে; কোন মন্ত্রী বা নেতা জনসভা ও অন্য কোথাও মন্তব্য করছেন এবং সেসব ঘিরে আবার নতুন করে শুরু হচ্ছে বাদানুবাদ, উত্তেজনা ও উন্মাদনা।

এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন বোধ করি কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রীকে শিরñেদের হুমকি। ওই রাজ্যের কংগ্রেস নেতা মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি গরুর মাংস খাব। তুমি প্রশ্ন করার কে?’ ব্যস, আগুনে যেন ঘি ঢালা হলো! এর প্রতিবাদে কর্ণাটকের সিমোনা জেলার বিজেপি সেক্রেটারি এক জনসভায় হুমকি দিলেন এই বলে, ‘যদি সাহস থাকে সিদ্ধারামাইয়াকে এখানে এসে গরুর মাংস খেতে বলুন।... আমরা তার দেহ থেকে মাথা বিছিন্ন করে তা দিয়ে ফুটবল খেলব।’

অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতায়। গো-বিতর্ক এবং এর প্রতিবাদে ধর্মতলায় প্রতীকী প্রতিবাদ জমায়েতের আয়োজন করা হয়েছিল ভাষা ও চেতনা সমিতির ব্যানারে। এতে উপস্থিত ছিলেন ডান-বাম বুদ্ধিজীবী-লেখক-শিল্পীরা। তারা জনসমক্ষে গরুর মাংস রান্না করে খান। গান-বাজনা ও কবিতা পাঠ করেন। শাসকদল তৃণমূলের কবি সুবোধ সরকার বলেন, খাদ্যের ওপর ‘ফতোয়া’ চলবে না। গরুর মাংস সস্তা, প্রোটিন ও আয়রনসমৃদ্ধ। সাবেক মেয়র বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, খাদ্যাভ্যাস মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই।... এর সঙ্গে ধর্মকে মিলিয়ে দেশকে ভাঙ্গার যে চেষ্টা চলছে এই জনসভা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। অন্যদিকে হরিয়ানায় শিক্ষা বিভাগের সাময়িকীতে গরুর মাংসের উপকারিতা নিয়ে নিবন্ধ ছাপায় বরখাস্ত করা হয়েছে এর সম্পাদক দেবযানী সিংহকে।

কলকাতায় তুমুল প্রতিক্রিয়া হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে। ধর্মতলা থেকে সামান্য দূরে চাঁদনী চকে এক জনসভায় ভারতের কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী উমা ভারতী, যিনি মূলত তথাকথিত রাম ‘জন্মভূমি’ আন্দোলনের জন্য ‘আগুনখেকো নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত, গো-মাংস খেয়ে প্রতিবাদকারীদের ‘কুত্তা ও ভেড়িয়া’ বলে সম্বোধন করেন। ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরকে আক্রমণ করে তিনি গো-মাংস ভক্ষণকারীদের অভিশাপ পর্যন্ত দেন এই বলে যে, এর ফলে তারা অচিরেই অসুস্থ হয়ে পড়বে। অতঃপর শকুনের অভিশাপে গরু মরলেও মরতে পারে বৈকি। এর প্রতিক্রিয়ায় শাসক তৃণমূলের মহাসচিব উমা ভারতীকে অভিহিত করেন মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে।

মুম্বাইয়ে বলিউড বাদশা হিসেবে খ্যাত শাহরুখ খান ৫১তম জন্মবার্ষিকী পালন করতে গিয়ে লক্ষ ভক্তকুলের উদ্দেশে বলেন, মানুষের খাদ্যাভ্যাস কোন ইস্যু হতে পারে না। ধর্মকে জুড়ে দিয়ে অসহিষ্ণুতা দেখানো জঘন্য অপরাধ। বসে থাকেননি ভারতের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সরোদ বাদক ওস্তাদ আমজাদ আলী খান। তিনি বলেন, ‘এদেশে হাজার বছর ধরে হিন্দু-মুসলমান শান্তি ও ঐক্যের মধ্যে সহাবস্থান করছে। আমি যে সরোদ বাজাই তার নির্মাতা একজন হিন্দুÑহেমেন্দ্র চন্দ্র সেন। তিনি তৈরি করে না দিলে আমি বাজাতাম না...’। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির প্রতি তিনি এক আবেদনে বলেন, ইতোমধ্যে যেসব বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ, লেখক, শিল্পী পদক ও সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন প্রতিবাদে তারা কেউ পাগল নন, বোধ-বিবেকসম্পন্ন মানুষ। তাই প্রতিবাদের ভাষাকে আমলে নিয়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও ঐক্য ফিরিয়ে আনুন।

এবার একটু ব্যাকগ্রাউন্ডে যেতে চাই। গত ঈদুল আজহায় উত্তর প্রদেশের দাদরি এলাকার বিসারা গ্রামে মোহাম্মদ ইকলাখ প্রতিবারের মতো এবারও দাওয়াত করে খাওয়ান হিন্দু বন্ধুদের। মেন্যু ছিল ছাগলের মাংস, পোলাও ইত্যাদি। সে রাতেই কে বা কারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, ইকলাখ গরু জবাই করে তার মাংস খাইয়েছে বন্ধুদের। ব্যস, আর যায় কোথায়! সে রাতেই উন্মত্ত জনতা, জানা যায়, অধিকাংশই বহিরাগত, ইকলাখের বাড়ি আক্রমণ করে তার ছেলেকে আহত এবং তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তবে রক্ষা, এর জের ধরে শেষ পর্যন্ত বড় কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়নি, বিচ্ছিন্নভাবে আরও দু’একজন মারা গেলেও। এরপর থেকেই সমানে চলছে গরু বিতর্ক। কবে নাগাদ যে এর শেষ হবে কে জানে!

বাস্তবতা হলো, ভারতে নিরামিষভোজীর সংখ্যা যথেষ্ট হলেও অধিকাংশ মানুষই আমিষভোজী। তাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ গো-মহিষ ইত্যাদির মাংস খেয়ে থাকে। দিল্লীর কেরালা হাউসের বিফ ফ্রাই নাকি অতি সুস্বাদু ও লোভনীয়। রান্নার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নাকি সেটি শেষ হয়ে যায়। এই কেরালা হাউসেও গরুর মাংস বিক্রির অভিযোগে অভিযান চালায় দিল্লী পুলিশ। ঘটনার পরপরই তীব্র প্রতিবাদও জানিয়েছে কেরালার রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ওমেন চ-ী। পরে অবশ্য এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে কেন্দ্রের তরফ থেকে। নামে বিফ ফ্রাই হলেও আসলে এটা বাফেলো ফ্রাই অর্থাৎ মহিষের মাংস। ভেজাল বুঝি চলে সর্বত্রই। ঢাকার ঠাটারীবাজারেও দেখি প্রকাশ্য দিবালোকে দলে দলে মহিষ ঢুকে জবাইয়ের পর গরুর মাংস হিসেবে বাজারে বিকোয়। কলকাতার নিজামের বিভিন্ন পদের গরুর মাংসের কাবাব ও রোল ভুবনবিখ্যাত। তা এমনকি অবলীলাক্রমে স্থান করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক টুরিস্ট গাইডেও। সর্বশেষ, দিল্লী হাইকোর্ট থেকে বলা হয়েছে, সেখানে গো-মাংস সংক্রান্ত কোন খাবারের ওপরেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা যাবে না।

অহেতুক গরু বিতর্কে বোধ করি ইতি টানতে চাইছেন প্রখ্যাত ভারতীয় ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব। অনেকেই জানেন, পরিস্থিতির গভীরতা ও নানা ধরনের অসহিষ্ণুতা লক্ষ্য করে ভারতের ৫০ জন ইতিহাসবিদ এক বিবৃতিতে রীতিমতো শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইরফান হাবিবও এর স্বাক্ষরকারী। টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, বিজেপি তথা আরএসএস-এর শাসনে ভারত পাকিস্তানের প্রতিবিম্বে পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় ও বর্ণগত সংখ্যালঘুরা নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। কেন্দ্রে বিজেপি আসীন হলেও সরকার চালাচ্ছে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। দলটির আধ্যাত্মিক গুরু এমএস গোলওয়াকার মূলত হিটলার ও নাৎসি পার্টির ভক্ত ছিলেন। আরএসএস স্রেফ সাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক নয়। ১৯৪৭ সালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় তারা মাঠেই ছিল না।

সে ক্ষেত্রে এই নব্য নাৎসিরা ভারতের অখ-তা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বসহ সহাবস্থান, সখ্য, সম্প্রীতি ও উন্নয়নকে বিপর্যস্ত এবং বিপন্ন করে তুলবে তাতে আর বিচিত্র কি! বর্তমানে ভারতের সংখ্যালঘুদের মনে যে যথেষ্ট ভীতি বিরাজ করছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সে দেশের শীর্ষ বহুজাতিক ব্যবসা পরামর্শক ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা এনআর নারায়ণমূর্তি মন্তব্য করেছেন, ‘গত ৩০০ বছরের উন্নয়নের উপাত্ত আমাকে বলছে, কোন সরকারই জনগণের মনে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাহীনতা বজায় রেখে উন্নয়ন করতে পারেনি। দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় যদি সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালায় তবে সেখানে উন্নয়ন নিশ্চিত হতে পারে না।’

বিশ্বের প্রথম সারির অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক সংস্থা মুডিজ এ্যানালিটিকস ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে দেয়া এক সতর্কবার্তায় বলেছে, নতুন সরকারকে ঘিরে গগনচুম্বী প্রত্যাশায় শেয়ারসূচক যেখানে উঠে গিয়েছিল সেখান থেকে প্রায় ১১ শতাংশ নেমে গেছে।... নেতাদের সামলান। না হলে দেশে-বিদেশে সরকার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। গতি হারাবে প্রবৃদ্ধির হার। এর পরপরই মুখ খুলেছেন রিজার্ভ ব্যাংকের গবর্নর রঘুরাম রাজন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। গবর্নর বলেন, নিষেধাজ্ঞা জারি করে লাভ হয় না। তা আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ নষ্ট করে দেয়।... দরকার এমন এক আবহ তৈরি করা, যেখানে একে অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেন, মর্যাদা দেন, সহিষ্ণুতার পরিচয় দেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, দেশকে নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করার প্রধান শর্ত একতা, শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা।... হিন্দু ও মুসলমানদের একযোগে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বলেন, আমাদের দেশ যে এগিয়ে চলেছে তা ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে’র জন্য। পরমতসহিষ্ণুতার কারণে ভারতের বহুত্ববাদী সমাজ কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। প্রাচীন সভ্যতা শত শত বছর ধরে আমাদের বৈপরীত্যকে আগলে রাখতে শিখিয়েছে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার কংগ্রেস নেত্রী শতাধিক শীর্ষ নেতাসহ পদব্রজে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে এক স্মারকলিপিতে জানান, ধর্মের নামে দেশকে ভাগ করার চক্রান্ত চলছে। ভয়, ভীতি ও অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে। বিজেপির রণনীতি দেশের বহুত্ববাদী চরিত্র নষ্ট করছে। এ অপচেষ্টা বন্ধ এবং সরকারের শুভবুদ্ধির উদয়ে রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগেরও অনুরোধ জানায় কংগ্রেস।

যতদূর জানি, ভারত ইতোমধ্যে চন্দ্রবিজয় সম্পন্ন করে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে মঙ্গলে উপগ্রহ নামিয়েছে ‘মম’ নামে। সেই সুদূরে অবস্থিত রক্তিম গ্রহ মঙ্গলে মনুষ্য অভিযানের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। সে অবস্থায় অহেতুক গরু-বিতর্ক, বাদানুবাদ, অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা ও অনিশ্চয়তা ইতিহাসের চাকা অনিবার্য পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে, যা প্রকারান্তরে মঙ্গলের পরিবর্তে ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ অমঙ্গলকে। সেক্ষেত্রে গো-মাতার অনুসারী সন্তানদের পক্ষে আর যা-ই হোক মঙ্গলাভিযান সম্পন্ন করা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

নির্বাচিত সংবাদ