২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অর্থবছর

  • বিশেষ সাক্ষাতকারে এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান;###;‘চিরাচরিত নিয়ম ভাঙতে গিয়ে বিরাগভাজন হচ্ছি’

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বার্ডের চেয়ারম্যান (এনবিআর) মোঃ নজিবুর রহমান বলেছেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আহরণের পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতা আনয়নে কাজ করে যাচ্ছি। ফলে চিরাচরিত নিয়ম ভাঙ্গতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে, কারও কারও বিরাগভাজন হতে হচ্ছে। এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন অভিযোগ, রাজস্ব আদায়, এনবিআরের সংস্কার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে জনকণ্ঠের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।

নজিবুর রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা নিশ্চিতের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং মাঠ পর্যায়ের সকল অফিসে সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রেজাল্ট ওরিয়েন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়নে নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের গতানুগতিক কার্যক্রমের পাশাপাশি উদ্ভাবনী কর্মকা-ের মাধ্যমে সেবা প্রদান ও রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যানের সঙ্গে রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের দূরত্ব সৃষ্টি প্রসঙ্গে নজিবুর রহমান বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বাস্তববিবর্জিত। বরং রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঐকান্তিক চেষ্টা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতার কারণেই গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার চাইতে বেশি রাজস্ব আহরণ সম্ভবপর হয়েছে। চলতি বছরও কাক্সিক্ষত রাজস্ব আদায় হবে।

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে নজিবুর রহমান জানান, এগুলো কোনটিই সঠিক নয়। স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণকারী কমিশনার ড. মারুফুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ ক্রিকেট একাডেমি ও নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্যাডে চলতি বছর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা উপভোগের জন্য তাদের খরচে ২০ দিনের ছুটিতে রাজস্ব আহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। এ প্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদবিভাগ হতে তার কর্ম অধিক্ষেত্রে অবস্থিত সংগঠন থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ না করার জন্য নিরুৎসাহিত করা হয় এবং রাজস্ব আদায় কার্যক্রমে অধিকতর মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক কারণে চাকরি হতে ইস্তফা প্রদান করলে যথারীতি সরকারী নিয়মে তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগের আদেশ জারি করা হয়। এর আগেও তিনি স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করলেও নিয়মবর্হিভূতভাবে চাপ প্রয়োগ করে তিনি উক্ত আবেদনপত্র প্রত্যাহার করান। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হোসেন আহমেদের রাজস্ব বোর্ডে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূরণ হওয়ায় ঐচ্ছিক অবসরে যাওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করার প্রেক্ষিতে নিয়মানুযায়ী তার চাকরি হতে অবসরের আদেশ জারি করা হয়। অপরদিকে সাবেক পররাষ্ট্র সচিবের স্ত্রী বেগম জাহান আরা সিদ্দিকী ঘন ঘন বহির্বাংলাদেশ ছুটি গ্রহণ করে দীর্ঘ সময় কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করতেন। এ কর্মকর্তা ২০১২ সালের ডিসেম্বর হতে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ বছর ২ মাস একাধিক্রমে বহির্বাংলাদেশ ছুটিতে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ২০১৪ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৫ দিন বহির্বাংলাদেশ ছুটি গ্রহণ করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে এনবিআরের চেয়ারম্যানগণের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ ছিল। একজন প্রাক্তন চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

চেয়ারম্যান জানান, চলতি অর্থবছর (২০১৫-১৬) বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বেশকিছু উদ্ভাবনী কর্মকা-ের পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনেও কতিপয় বিষয়ে শৃঙ্খলা আনয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণের গুরুত্বপূর্ণ সময় বিসিএস কাস্টমস ও বিসিএস কর ক্যাডারের উর্ধতন কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কারণে মাত্রাতিরিক্ত বিদেশ ভ্রমণে নিরুসাহিত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রচলিত বিধি বিধান অনুসরণের জন্য বলা হয়েছে। কেননা গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত রাজস্ব প্রশাসনের ২০১ জন কর্মকর্তা সেমিনার/প্রশিক্ষণ/কর্মশালা/প্রেষণ বা ব্যক্তিগত কারণে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে ৬২ জন কর্মকর্তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত কারণে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি জানান, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে করনেট সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আয়কর মেলা করেছি। আগামী ১৯ থেকে ২১ নবেম্বর পর্যন্ত প্রথমবারের মতো শীতকালীন আয়কর মেলা করা হচ্ছে বিভাগীয় শহরগুলোতে। প্রতি বছর রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা বছরের শুরুতে কম দেখানো হয়। ফলে শেষে গিয়ে চাপ পরে। এজন্য আমি আরাজস্ব আহরণকে চার কোয়াটারে সমানভাবে ভাগ করেছি। এক্ষেত্রে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে কাজ করছেন। তিনি বলে, আমরা এখন এসডিজিতে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে সারা পৃথিবীতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ ও এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী বা বলিয়ান করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের স্বপ্ন বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সম্পদ সংগ্রহের জন্য অর্থমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সুশাসন ও উন্নতর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় এনবিআরকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে একটি অসম্ভব কাজ আমি করেছি। তা হচ্ছে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন। এর মধ্যে অনেক জটিলতা ছিল। ২ বছর ধরে এটি ঝুলে ছিল। আমি যেহেতু একজন প্রশিক্ষিত প্রকল্প ব্যবস্থাপক, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এনবিআর এ যোগদানের তিন মাসের মধ্যেই এটি করে ফেলেছি। যা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ভূয়সী প্রশংসা কুরিয়েছে। প্রথমবারের মতো জেলায় জেলায় রাজস্ব সংলাপ করতে যাচ্ছি।

রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি বিষয়ে নজিবুর রহমান জানান, রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভাল। যে ধারা অব্যাহত আছে তা ইতিবাচক। এজন্য এতে গ্লাস অর্ধেক খালি না বলে অর্ধেক ভর্তি বলা উচিত। তিনি জানান, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা আর আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। যা ছিল এ যবত কালের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়। চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণে যেসব কার্যক্রম নেয়া হয়েছে এতে আশা করা হচ্ছে লক্ষ্য অর্জিত হবে।

নজিবুর রহমান বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পরই যে নীতি নিয়েছি তা হচ্ছে কিপিং অল অপসন ওপেন, বাট ফেইলিওর ইজ নট এন অপশন অর্থাৎ আমাদের সামনে সব পথ খোলা, কিন্তু ব্যার্থতার পথ রুদ্ধ। ব্যবসায়ীদের যেসব সংগঠন রয়েছে যেমন এফবিসিসিআই, ডিসিসিআই, বিজিএমই ইত্যাদির সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক স্থাপন করেছি। এনবিআর এ এসেই সুশাসন ও উন্নততর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রবর্তন করি। যা পরবর্তীতে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সরকারের ২০১৪-১৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশেষ স্থান পেয়েছে। মাঠ পর্যায়ে আয়কর, শুল্ক, ভ্যাট বিভাগ ও মাঠ পর্যায়ে কমিশনারেট কার্যালয়ে গতিশীলতা আনতে বিভিন্ন পর্যায়ে দ্রুত পদোন্নতির ব্যবস্থা করেছি। স্বচ্ছতার মাধ্যমে বদলি এবং অফিসারদের মূল্যায়নের করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে যারা সৎ ও যোগ্য তারা সবুজ, যারা মাঝারি মানের তারা হলুদ এবং তারা দুর্নীতিবাজ তারা লাল তালিকায় স্থান পায়। তিনি জানান, আমি সবাইকে নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে কাজ করি। কোন সংস্থায় একজনের ইচ্ছায় চাকরি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে এমন ধারণা ঠিক নয়। আমি এনবিআর এ চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ শুরু না করতেই দ্বিতীয় দিন থেকেই নানা অভিযোগ ও প্রচারণা শুরু হয়। এটি হচ্ছে অসৎ লোকদের সম্মিলিত চক্রান্ত।