২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় উৎসব- কিংবদন্তির শিল্পী, ওস্তাদরা আসছেন

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় উৎসব- কিংবদন্তির শিল্পী, ওস্তাদরা আসছেন
  • ২৭ নবেম্বর থেকে মাতবে আর্মি স্টেডিয়াম

মোরসালিন মিজান ॥ সঙ্গীতে কী থাকে? কী কী থাকে? এর কাঠামো কেমন আসলে? কয় সমুদ্র গভীরতা নিয়ে সঙ্গীত হয়? কী ভাবে শ্রোতাকে অধিকার করে সঙ্গীত? নিংড়ে দেয়া নেয়ার ক্ষমতা এর কতটা আছে? হ্যাঁ, এমন অজস্র প্রশ্নের উত্তর মুহূর্তেই দিতে পারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। সঙ্গীতের শাস্ত্র মেনে যে চর্চা, যে নিত্য অনুশীলন, তার সুমিষ্ট ফল শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। বন্ধুর এই পথ ধরে কম শিল্পীই হাঁটেন। সমজদার শ্রোতাও যতসামান্য। তবে, বাংলাদেশ যথেষ্টই বদলে দিয়েছে ইতিহাস। এখানে গত কয়েক বছর ধরে শুদ্ধ সঙ্গীতের বিশাল বিপুল উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অলিক কল্পনাকেই যেন বাস্তব প্রমাণ করেছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। প্রথমে তিনদিনের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসব। এখন তা বেড়ে হয়েছে পাঁচ দিনের। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সারা রাত ধরে চলছে কণ্ঠ ও যন্ত্র সঙ্গীত। শাস্ত্রীয় নৃত্যের পরিবেশনা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছে দর্শকদের। উপমহাদেশের বড় বড় ওস্তাদ ও প-িতদের অংশগ্রহণে আশ্চর্য সুন্দর এক একটি রাত। হাজার হাজার শ্রোতা। এত বড় মাঠ, তিল ধারনের জায়গা থাকে না। এভাবে স্বতন্ত্র উচ্চতায় পৌঁছেছে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব বাংলাদেশ। এবার এর চতুর্থ আসর। পাঁচদিনের উৎসব শুরু হবে ২৭ নবেম্বর। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। চলছে রেজিস্ট্রেশনের কাজ। বিনা খরচেই হয়ে যাবে। তবে হতে হবে। নিবন্ধন করা গেলে পরেই উৎসব আপনার!

আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্যগত গঠন ও কৌশলের প্রতি সাধারণ শ্রোতাদের আগ্রহ বাড়াতেই উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের আয়োজন। এবারও প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত সরব থাকবে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়াম। ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্যের প্রধান প্রধান শাখার উল্লেখযোগ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন আয়োজকরা। বিশেষ করে বলতে হবে তবলার যাদুকর ওস্তাদ জাকির হোসেনের কথা। বিখ্যাত শিল্পী আসছেন প্রথমবারের মতো। তাঁর তবলা তো লেগেই আছে কানে। এবার চোখের সামনে বাজবে! দুই হাতের সবকটি আঙ্গুলের সঞ্চালন স্পষ্ট হবে চোখের সামনে। সেই প্রতিক্ষা এখন। খ্যাতি আর বয়সের কারণে যারপরনাই দুর্লভ চৌরাশিয়া আগে থেকেই আসছেন। এবারও পাওয়া হচ্ছে মহান শিল্পীকে। প-িত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার পরিবেশনার দিন গোটা আর্মি স্টেডিয়ামে যে উত্তেজনা বিরাজ করে, তা এখন আর কাউকে বলে বোঝানোর প্রয়োজন পড়ে না। বহু শ্রোতা এই যাদুকর শিল্পীর বাঁশি একাধিকবার শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। সব ঠিক থাকলে পাবেন আরও একবার। যথারীতি গাইতে আসছেন বিখ্যাত শিল্পী ওস্তাদ রাশিদ খান। তাঁর পরিবেশনার দিনও বাড়তি প্রস্তুতির দরকার হয় আয়োজকদের। শ্রোতাদের এক মুহূর্তের জন্য চেয়ার ছেড়ে ওঠতে দেন না। প-িত শিবকুমার শর্মাকে তো বলা যায় ঘরের শিল্পী। উৎসবে নিয়মিত আসছেন। সন্তোর বাজিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। লম্বা সাদা চুলের দারুণ দেখতে মানুষটি এবারও মাতিয়ে রাখবেন শ্রোতাদের। প-িত অজয় চক্রবর্তীর কণ্ঠ সঙ্গীত শোনার শ্রোতা অনেক। এবারও গাইবেন তিনি।

আর্মি স্টেডিয়ামে এর আগে অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্পীরাও আলো ছড়িয়েছেন। অতো নাম শোনা যায়নি যাদের, পরিবেশনা দিয়ে তাঁরাও শ্রোতাদের জয় করে নিয়েছেন। উদাহরণ হতে পারেনÑ প-িত উল্লাস কশলকার, প-িত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, রাহুল শর্মার মতো নামগুলো। প-িত সুরেশ তালওয়ালকার, সামিহান কশলকার, উদয় ভাওয়ালকারের পরিবেশাও মনে থাকার কথা শ্রোতার। সকলেই আসছেন এবার। কৌশিকী চক্রবর্তীর কথা একটু আলাদা করেই বলতে হবে। অজয় চক্রবর্তীর কন্যার অদ্ভুত সুন্দর কণ্ঠ। না, শুনলে আক্ষেপ দূর হয় না সহজে। ঢাকার তরুণরা এই শিল্পীর সবচেয়ে বড় ভক্ত। এবারও প্রিয় শিল্পীর কণ্ঠ সঙ্গীত উপভোগের সুযোগ পাবেন তারা।

জানা যায়, উৎসবে প্রবীণ শিল্পীদের কেউ কেউ এবার থাকতে পারছেন না। এর ফলে নতুন করে বেশ কয়েকজন শিল্পীকে পাওয়া হবে। প্রথমবারের মতো উৎসবে বাঁশি বাজাতে আসছেন জয়াপ্রদা রামমূর্তি। দক্ষিণী শিল্পী জয়াপ্রদার বাঁশিবাদন উৎসবে বিশেষ সংযোজন। আসছেন খ্যাতিমান কর্ণাটকি কণ্ঠশিল্পী ড. বালমুরালীকৃষ্ণ। তাঁর সঙ্গে বাঁশিতে যুগলবন্দী বাজাবেন গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ড নমিনি শিল্পী রনু মজুমদার। প্রথমবারের মতো আসছেন জনপ্রিয় খেয়ালিয়া শুভা মুডগাল, শ্রুতি সাদোলিকার ও ধ্রুপদিয়া ওয়াসিফউদ্দিন ডাগর। সিঙ্গিং ভায়োলিন খ্যাত এন রাজমের নেতৃত্বে বেহালা বাজাবেন কর্ণাটকি ধারার তিন প্রজন্মের শিল্পী। ময়মনসিংহের গৌরীপুরের প্রবাদপ্রতিম সেতারিয়া ওস্তাদ বিলায়েৎ খাঁ সাহেবের ভ্রাতুষ্পুত্র ইমরাত খান সুরবাহার বাজাবেন। বেলায়েৎ খাঁ সাহেবের সুযোগ্য পুত্র ওস্তাদ সুজাত খান পরিবেশন করবেন সেতার। জানা যায়, উৎসবে প্রথমবারের মতো যোগ হচ্ছে সরস্বতী বীণা। পরিবেশন করবেন জয়ন্তী কুমারেশ। এস্রাজ বাজিয়ে শোনাবেন শুভায়ুসেন মজুমদার। এর আগে অস্কার নমিনেশনপ্রাপ্ত বম্বে জয়শ্রী বেশ মাতিয়েছিলেন উৎসব। তিনি এবারও আসছেন। আসছেন গণেশ রাজাগোপালন। গত বছর সরোদের সঙ্গে যুগলবন্দি বাজিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। এবার গণেশ ও তাঁর ভাই কুমারেশ কর্ণাটকি বেহালায় যুগলবন্দী বাজাবেন। কড়াইকুডি মানি বিশ্বের অন্যতম মৃদঙ্গশিল্পী হিসেবে স্বীকৃত। আসছেন তিনি ও তাঁর দল। সঙ্গীতের পাশাপাশি থাকছে নৃত্যের পরিবেশনা। কুচিপুডি নৃত্য পরিবেশন করবেন রাজা ও রাধা রেড্ডি দম্পতি। প্রথম ও দ্বিতীয় বছর ভরতনাট্যম পরিবেশন করেছিলেন আলারমেল ভাল্লি। তাঁকে এবারও পাওয়া যাবে। আসছেন ইরশাদ খান ও সুজাত খান। দুজনেরই বাংলাদেশে শেকড়। একই পরিবারের হলেও, দু’জন দুই মেজাজের শিল্পী বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের উৎসব হলেও, দেশীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ তেমন চোখে পড়ে না। তেমন শিল্পীর অভাব। এর মধ্য থেকেই যোগ্যদের বেছে নেয়া হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন তাঁদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ব্যবস্থা করে। এবার বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবে অংশগ্রহণ করছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগ। ড. অসিত রায়ের পরিচালনায় আটজনের একটি দলীয় পরিবেশনা থাকবে মঞ্চে। বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও সংগঠকমিনু বিল্লাহ্র পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিবেন বাংলাদেশের ২২ জন নৃত্যশিল্পী। ওয়ার্দা রিহাবের পরিচালনায় মণিপুরী দলীয় নৃত্য পরিবেশন করবেন ৩০ জন নৃত্যশিল্পী। অনিমেষ বিজয় চৌধুরীর পরিচালনায় সিলেটের আটজন শিল্পী পরিবেশন করবেন ধামার। এককভাবে মঞ্চে আসবেন বিশিষ্ট সরোদশিল্পী ইউসুফ খান। দলীয় তালবাদ্য পরিবেশন করবেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিশুশিল্পী মোহাম্মদ ভুবন, ফাহমিদা নাজনীন, সুপান্থ মজুমদার ও পঞ্চম স্যানাল। সঙ্গীতালয়ের পক্ষে একক সঙ্গীত পরিবেশন করবেন সুস্মিতা দেবনাথ শুচি আর ধ্রুপদ পরিবেশন করবেন অভিজিৎ কু-ু। অনুষ্ঠানের সর্বকনিষ্ঠ দুজন শিল্পী ফাহমিদা নাজনীন ও মোহাম্মদ ভুবন। তাঁরা দুজনেই বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের দলীয় তবলা পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করবেন।

আয়োজনের বড় বৈশিষ্ট্যÑ হাজার হাজার শ্রোতার অংশগ্রহণ। আয়োজক সূত্র জানায়, প্রথম বছর তিন দিনের উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন ৭০ হাজার শ্রোতা। পরের বছরগুলোতে পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবে প্রতিদিন ১ লাখ ৫০ হাজারের অধিক শ্রোতা যোগ দেন। এবার শ্রোতার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব নিবন্ধনের কাজ সেরে রাখা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে রেজিস্ট্রেশন। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট (যঃঃঢ়://িি.িনবহমধষভড়ঁহফধঃরড়হ.ড়ৎম/) পরিদর্শন করতে হবে। সরাসরি উপস্থিত হয়ে নিবন্ধন করা যাবে ধানম-ির বেঙ্গল গ্যালারি, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বেঙ্গল সেন্টার, বনানীতে লখনৌ, উত্তরায় কুশল সেন্টার ও কারওয়ানবাজারে ডেইলি স্টার-বেঙ্গল আর্টস প্রিসিঙ্কট থেকে। অফ-সাইট নিবন্ধন ও মোবাইলে নিবন্ধন অনুষ্ঠানের প্রথম দুদিন পর্যন্ত চলবে। তৃতীয় দিন থেকে আর অফ-সাইট অথবা মোবাইলে নিবন্ধন করা যাবে না। অনুষ্ঠানস্থলে এবার নিবন্ধন করা যাবে না বলেও জানিয়েছেন আয়োজকরা।

আয়োজনের পুরোটা তদারকি করছেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমরা প্রতি বছর অনেক যতেœর সঙ্গে উৎসবের আয়োজন করে থাকি। এ জন্য সারা বছর কাজ করতে হয়। এবারও তাই হয়েছে। কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। যে মহান শিল্পীরা আসবেন বলে জানিয়েছিলাম, তাদের সবাই আসছেন। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া হবে। সব ঠিক থাকলে আরও সুন্দর ও গোছালো একটি উৎসব উপভোগ করার সুযোগ পাবেন শ্রোতা। এ জন্য সকলের সহায়তা কামনা করেন তিনি।