১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাষণ্ড স্বামীর নির্যাতনে চিরতরে অন্ধ হয়ে গেলেন শিউলী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ হতভাগী শিউলী আক্তার দুই চোখে আর কোনদিন পৃথিবীর আলো দেখতে পারবেন না। তাকে সারা জীবন অন্ধত্বের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। মাদকের টাকা না পেয়ে পাষ- স্বামী জুয়েল ধারালো চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তার দুই চোখ উপড়ে ফেলেন। এরপর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে শিউলীকে ভর্তি করা হয়। শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তার চোখের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। টানা দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অস্ত্রোপচার করেন হাসপাতালের অধ্যাপক গোলাম হায়দার ও শওকত আর শাকুর। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল হক এ তথ্য জানান।

হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল হক জানান, শিউলী আর কখনই চোখে দেখতে পাবেন না। তবে চেহারা দেখতে যাতে খারাপ না লাগে সে জন্য চোখের মধ্যে কনফার্মার লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা ভাল আছে। কিন্তু এ কথা শোনার পর তিনি মানসিকভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে টঙ্গীর জামাইবাজার এলাকার ভাড়া বাসায় স্বামী জুয়েল হাসান চাকু দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্ত্রী শিউলী আক্তারের দুই চোখ তুলে ফেলে। পরে স্ত্রীকে ভেতরে রেখেই বাসা তালাবদ্ধ করে চলে যান। চিৎকার শোনে পরে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙ্গে শিউলীকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাঁকে টঙ্গী সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখান থেকে তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পথে দীর্ঘ যানজটের কারণে তাকে উত্তরার একটি বেসরকারী হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে রাত পৌনে একটার দিকে তাকে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আনা হয়।

অস্ত্রোপচারের আগে শিউলী জানান, পাঁচ বছর আগে তিনি জুয়েলকে বিয়ে করেন। এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই জানতে পারেন, স্বামী নেশা করেন। ছোট ট্যাবলেটের মতো দেখতে ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক সেবন করেন স্বামী। তিনি জানান, আগের স্বামীর কাছ থেকে যে সম্পত্তি পাবেন। জুয়েল প্রায়ই তা এনে দেয়ার জন্য তাকে অনেক চাপ দিতেন। অনেক মারধর করতেন। প্রায় সময় মারধর করে তাকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে যেতেন। এছাড়া স্বামী তাকে সন্দেহ করতেন।

শিউলী আক্তার কষ্ট ও যন্ত্রণায় বলেন, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে নেশার পরিমাণ বেশি হয়েছিল। স্বামী সারাক্ষণই ঘরে থাকতেন। বিকেলে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যান। এরপর ফিরে এলে তিনি আমাকে সন্দেহ করেন। এসে বলতে থাকে ওই তোর ঘরে কে আইছিল? এ কথা বলতে বলতেই তিনি আমার মুখে স্কচটেপ মারেন। এক পর্যায়ে দুই হাত পিচ মোড়া কইরা বাইন্ধ্যা ফালান। পরে দুই পা বাইন্ধ্যা ফালান। তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে দুই চোখ খোঁচাইতে থাকেন। এক চোখ তুইল্যা ফেলার চেষ্টা করেন। চিৎকার চেচামেচির চেষ্টা করলেও বিফলে যায়। কারণ মুখ বাঁধা ছিল। এক সময় দেখি চারদিকে অন্ধকার। তারপর জ্ঞান হারাইয়া ফালাই। তারপর আর কিছু মনে নাই। কিছুক্ষণ পর একটু একটু জ্ঞান ফিরলে চারপাশে খালি অন্ধকার দেখি। পরে অনেক চেষ্টা করে হাতের বান্ধা খুইলা ফেলি। মুখ থেইক্যা স্কচটেপ আলগা কইরা বাঁচাও বাঁচাও বইলা চিৎকার দিতে থাকি। চিৎকার শোনে প্রতিবেশীরা পুলিশের সহায়তায় ঘরের তালা ভেঙ্গে তাকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাকে টঙ্গী সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। পথে দীর্ঘ যানজটের কারণে উত্তরার একটি বেসরকারী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে রাত পৌনে একটার দিকে তাকে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসা হয়।

চক্ষু হাসপাতালে আনার আগে তার দুই চোখে সাদা ব্যান্ডেজ ছিল। টঙ্গী হাসপাতালে তার চোখে ব্যান্ডেজ করা হয়। ওই অবস্থায় মধ্যরাতে তাকে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে হাসপাতালে চোখের ওই সাদা ব্যান্ডেজ খুলতেই আঁতকে ওঠেন জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার আতিকুল হক। চিকিৎসক এক পর্যায়ে বলে ওঠেন, এই কি মানুষের কাজ। ধারালো ছোরা দিয়ে নিজের স্ত্রীর চোখ উপড়ে ফেলতে পারে। মানুষ কিভাবে এমন পৈশাচিক কাজ করতে পারে।

শিউলীর ভাই রনি জানান, ২০০৯ সালে শিউলীর প্রথম স্বামী খুন হন। এর এক বছরের মাথায় শিউলী তার স্বামীর চাচাত ভাই জুয়েলকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে শিউলীর বাবার পরিবার ও ছেলেমেয়েরা রাজি ছিল না। তাই সবার সঙ্গে তার একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। তবে শিউলীর দ্বিতীয় বিয়ে হলেও জুয়েলের এটি প্রথম বিয়ে। তিনি জানান, শিউলীর প্রথম সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। মেয়েটা এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। বড় ছেলেও পড়াশোনা করছে। তারা তাদের দাদার বাড়িতে থাকে। রনি জানান, জুয়েল টঙ্গীতে ইট-বালুর ব্যবসা করেন। আগে কেউ জানত না যে, জুয়েল ইয়াবাসহ নানা মাদক সেবন করেন। বিয়ের পর জানতে পারেন জুয়েল আগে থেকে মাদকাসক্ত ছিল। প্রায় সময় শিউলীকে মারধর করত। আগের স্বামী সম্পত্তি বিক্রি করে জুয়েলকে দেয়ার জন্য শিউলীকে মারধর করা হতো। তবে এভাবে যে একজন মানুষের চোখ ধারালো ছোরা দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উপড়ে ফেলতে পারে, তা ভাবতেই পারছেন না। তিনি জানান, ঘটনার পর থেকে জুয়েল পলাতক। এখনও পর্যন্ত তারা মামলা করেননি।

শিউলীকে উদ্ধারকারী প্রতিবেশী আলী আহমেদ হাসপাতালে জানান, মানবিক কারণে আমি ও অন্য ভাড়াটেরা তাকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে গেছি। তিনি জানান, শিউলী বাসায় আসার পর থেকেই তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত। এতে বাড়িওয়ালা ও অন্য ভাড়াটেরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। এ কারণে বাড়িওয়ালা জুয়েলকে ঘটনার দিন (বৃহস্পতিবার) বিকেল পাঁচটায় বাসা ছেড়ে দিতে বলেন। এর এক ঘণ্টা আগে বিকেল চারটার দিকে জুয়েল এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়ে ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর থেকেই জুয়েল পলাতক।