১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুরের স্নিগ্ধতায় জ্যাজ ও ব্লুজ উৎসবের সমাপ্তি

সুরের স্নিগ্ধতায় জ্যাজ ও ব্লুজ উৎসবের সমাপ্তি
  • সংস্কৃতি সংবাদ

মনোয়ার হোসেন ॥ বৃহস্পতি থেকে শনি ঝরেছে সুরের ধ্বনি। সঙ্গীতানুরাগীদের হৃদয়ে বয়ে গেছে মায়াবী শব্দতরঙ্গের স্নিগ্ধ পরশ। প্রাচ্য আর পশ্চিমের সীমারেখা ছাড়িয়ে গানপ্রেমীরা ভেসেছে সুর-তাল ও লয়ের সাগরে। মনের খোরাক মেটাতে সমবেত হয়েছেন রাজধানীর বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সবুজ তৃণভূমি আচ্ছাদিত মাঠে বসে উপভোগ করেছেন জ্যাজ ও ব্লুজ মিউজিক। প্রাণের স্পন্দন জাগানো গান ও যন্ত্রসঙ্গীতের অপার আনন্দ আস্বাদের ফাঁকে ফাঁকে ফুড কোর্টের দোকানগুলোয় জমেছিল ভোজন পর্ব। এভাবেই শ্রোতার ভাললাগায় কেটেছে জ্যাজ এ্যান্ড ব্লুজ ফেস্টিভ্যালের তিনটি মোহনীয় রাত। গ্রামীণফোনের সহযোগিতায় ব্লুজ কমিউনিকেশন্স আয়োজিত উৎসবের শেষ হলো শনিবার।

সমাপনী রাতে কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতের পরিবেশনায় অংশ নেয় চার দেশের শিল্পীবৃন্দ। বাকি দু’দিনের মতো এদিনও সুরে সুরে শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে বাংলাদেশ, ভারত, ব্রাজিল ও ফ্রান্সের শিল্পীরা।

ঘড়ির কাঁটা তখন রাত পৌনে ৮টা। মঞ্চ থেকে ভেসে এলো ব্লজের সুর। আর এ সুর তোলে ভারতের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল সোলমেট। গানে ব্লুজের পাশাপাশি রক এ্যান্ড রোল, হার্ডরক ও সোল সঙ্গীতের সংমিশ্রণ বেশ স্পষ্ট। ভারতের মেঘালয়ের এই ব্যান্ডটির প্রধান গায়িকা তিপৃতি টিপস খারবাঙ্গার। দলটি তাদের প্রকাশিত তিনটি এ্যালবাম ‘শিলং’, ‘মুভিং অন’ ও ‘টেন স্টোরিজ আপ’ থেকে নিজেদের গানগুলো পরিবেশন করেন। দলের গিটারিস্ট কাম ভোকাল রুডি ওয়ালাঙ্গের অনবদ্য গিটার বাদন মাতিয়ে রাখে শ্রোতাদের। তিপৃতির পাশাপাশি গান গেয়ে শোনান রুডিও। এ দলের গানের শুরুতেই বাংলাদেশের সঙ্গীতানুরাগীদের প্রশংসা করেন তিপৃতি। তিনি বলেন, ‘সুরের কোন সীমা নেই। তাই আমরা প্রাচ্যের সুরের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছি। নতুন ধারার ফিউশন সৃষ্টি করেছি। আশা করি তা আপনারা উপভোগ করবেন।’ এরপরই শুরু হয় সোলমেটের সামষ্টিক সুরের খেলা।

সোলমেটের পর মঞ্চে আসে ব্রাজিলের গানের দল এসড্রাস নোগুয়েরা কোয়ার্টেট। দলটি ঢাকার শ্রোতাদের শোনায় জ্যাজ ঘরানার যন্ত্রসঙ্গীত। তাদের পরিবেশনায় মূল যন্ত্রানুষঙ্গ ছিল সাক্সোফোন। মঞ্চে যখন বইছিল সাক্সোফোনের সুর, তখন তালে তালে নাচছিল দলটির সদস্যরা। সুর ও নৃত্যের সমন্বয়ে পরিবেশনাটি হয়ে ওঠে আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ।

রাত ১০টার পর মঞ্চে আসেন আইয়ুব বাচ্চু ও তার দল এবি ব্লুজ। এলআরবির সদস্যদের নিয়েই গঠিত হয় এ ব্লুজ দল। বাড়তি ছিল শুধু সাক্সোফোন ও হারমোনিকা বাদন। এ দুই যন্ত্রানুষঙ্গ বাজিয়ে শোনান এবি ব্লুজের শাশা। আইয়ুব বাচ্চু শুরুতেই গেয়ে শোনান ‘আমি অন্ধকারের অন্ধ মানুষ’ গানটি। ব্লুজের তালে তখন নেচে উঠে উন্মুক্ত মাঠের হাজারো দর্শকশ্রোতা। গানের মাঝে বাংলাদেশে এ ধরনের আয়োজনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্লুজ গান সম্পর্কে বাচ্চু বলেন, বাংলায় যদি রক গান হয়, ব্লুজ কেন হবে না। আমরা চেষ্টা করছি বাংলায় নিজস্ব ব্লুজ ঘরানার তৈরির। সংক্ষিপ্ত কথা শেষে গেয়ে শোনান ‘বাড়ি ফিরে বন্ধুরে এরপর একে তুই মাকে বলিস’। তারপর গেয়ে শোনান বি বি কিংয়ের ইংরেজী গান ‘দ্যা থ্রিল ইজ গন’ ও ‘রক মি বেবি’ । ‘নয় ফুল নয় লতা মাধবী’সহ তার জনপ্রিয় ব্লুজ সুরের গানগুলো।

সব শেষে হাজির হন সমাপনী রাতের অন্যতম আকর্ষণ ফ্রান্সের জ্যাজ শিল্পী চায়না মোজেস। রাত পৌনে ১২টায় মঞ্চে আসেন জ্যাজ স্টোরি টেলার হিসেবে বিশ^খ্যাত এই ফরাসি শিল্পী। শুরুতেই কথা দিয়ে শ্রোতার সংযোগ ঘটান। বলেন, গুড ইভিনিং ঢাকা। তোমরা বাংলার মানুষেরা খুব ভাল। এরপর চলে যান সুরের স্রোতে। বিশুদ্ধ জ্যাজের আশ্রয়ে গেয়ে শোনান ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ ডু রাইট’, ‘অল অব মি’, ‘কাম ব্যাক টু মি’, ‘লাবি কল’, ‘ডায়নাস ব্লুজ’সহ অনেকগুলো গান। আর এভাবেই নেশা ধরিয়ে দেয়া জ্যাজের সুরে অনবদ্য কণ্ঠের খেলায় আলোড়ন তোলেন শ্রোতার অন্তরের অলিন্দে। গানের সঙ্গে বেজেছে তার সঙ্গী যন্ত্রীদের স্যাক্সোফোন, ড্রামস, গিটার ও পিয়ানোর মধুময় শব্দ। মধ্যরাতে তার কণ্ঠসঙ্গীতের মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে হেমন্তের হালকা কুয়াশায়। এর মধ্য দিয়েই ভাঙে সঙ্গীতজ্ঞ ও সমঝদারদের এ মিলনমেলা, শেষ হয় উৎসব। পর্দা ওঠে মহাযজ্ঞের। তখন হেমন্তের স্নিগ্ধ মাঝরাত। সঙ্গীতের অলৌকিক ধ্বনিমাধুর্য আর ঐকতান প্রাণে প্রাণে বহন করে বিদায় নেয় রোমাঞ্চিত, বিমুগ্ধ সব দর্শক-শ্রোতা।

সঙ্গীতাসর রবি পরিক্রমায় নজরুল ॥ গানে গানে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন দুই দেশের দুই শিল্পী। বাংলাদেশের শিল্পী গাইলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত আর ভারতের শিল্পীর কণ্ঠে গীত হলো নজরুলসঙ্গীত। রবি ঠাকুরের গান শোনান এদেশের শিল্পী লিলি ইসলাম। আর নজরুলের গান গেয়ে শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করেন জাতীয় কবির নাতনি ভারতের শিল্পী অনিন্দিতা কাজী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক ছিল নানামাত্রায়। সেই সম্পর্কের চুম্বকীয় অংশ গান আর কথামালা তুলে ধরেন দুই শিল্পী। রবীন্দ্র ও নজরুলকে একসূত্রে গাঁথা এ সঙ্গীতানুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘রবি পরিক্রমায় নজরুল’। শনিবার হেমন্ত সন্ধ্যায় চমৎকার সঙ্গীতাসরটির আয়োজন করে ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি)। হৃদয় আলোড়িত করা এ গানের আসরটি উপভোগ করতে শ্রোতায় পরিপূর্ণ ছিল আইজিসিসির লাইব্রেরির মিলনায়তন।

আয়োজনের শুরুতেই রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন লিলি ইসলাম। শোনালেন ‘দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার’। এর পর পরিবেশন করেন ‘তোমারে জানিনে নাথ’ গানটি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পর নজরুলের গান পরিবেশন করে আয়োজনের আরেক শিল্পী অনিন্দিতা কাজী। তিনি গাইলেন ‘অঞ্জলি লহ মোর’। তার এই গানের পরিবেশনার আবারও রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করে লিলি ইসলাম। এবার তিনি দুটি গান পরিবেশন করেন। শিরোনাম ছিল ‘আমার নয়ন ভোলানো’ ও ‘তোমার পূজার ছলে’। এরপর অনিন্দিতা কাজী গাইলেন ‘মোর ঘুমঘরে এলে মনোহর’। ১৫টি গানে সাজানো সঙ্গীতাসরে লিলি ইসলাম আরও গেয়ে শোনান ‘আমার মাথা নত করে’, ‘তোমার হলো শুরু’, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’, ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি’। অনিন্দিতা কাজী গাইলেন ‘সৃজন ছন্দে আনন্দে’, ‘আসিবে তুমি জানি প্রিয়’ ও ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে’। লিলি ইসলামের গাওয়া ‘আজি ঝড়ের তোমার অভিসার’ গানের মধ্যে দিয়ে শেষ অনুষ্ঠান।

পারফরম্যান্স আর্ট ও স্থাপনাশিল্প প্রদর্শনী আইডি-ক্ল্যাশ ॥ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় গ্যোয়টে ইনস্টিটিউট আইডি-ক্ল্যাশ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক পারফরমেন্স আর্ট এ্যান্ড স্থাপনাশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। বৃহস্পতিবার থেকে শিল্পকলা একাডেমির প্লাজা চত্বরে তিন দিনব্যাপী এ পারফরমেন্স প্রদর্শনীর শেষ দিন ছিল শনিবার। এদিনও সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় পারফরমেন্ট আর্ট। ভিন্নধর্মী এ আয়োজনে বাংলাদেশের দুইজন হিজরা শিল্পী ছাড়াও জার্মানির এনজি হিসেল প্রোডাকশনের একাধিক পারফরমেন্স আর্টিস্ট পরিবেশনায় অংশ নেন। প্রদর্শনীটির মাধ্যমে ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠীর জীবনের বিভিন্ন বিষষ তুলে ধরা হয়।

দেশের শিল্পীদের পারফরমেন্স করেন অনন্যা ও কথা। জার্মানির শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন মিশেল নইশে, বুরখাট, গ্রেটা পিমেন্টো প্রমুখ। ট্রান্সজেন্ডার মানুষেরা জন্মের সময় নির্ধারিত লিঙ্গ ভূমিকার সঙ্গে নিজেদের মিলাতে পারেন না কারণ এটা তাদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাদের মনে হয় তারা একটি ভুল শরীরে অবস্থান করছেন এবং তাই তারা প্রায়ই অবস্থানচ্যুত অনুভব করেন। যদিও তাদের নিজস্ব লৈঙ্গিক পরিচয় সম্পর্কে তাদের অনুভূতি প্রায়ই সমাজে বিভ্রান্তির উদ্রেক করে, তবে ক্রমশ তারা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করছেন। এমন বিষয়কে উপজীব্য করেই পরিবেশিত হয় পারফরমেন্স আর্ট।

আয়োজনটির পরিচালনা করেছেন এনজি হিসেল ও রোল্যান্ড কায়সার। ১৯৮০ সাল থেকে একাধারে নির্দেশক, কোরিওগ্রাফার, পারফরমেন্স এবং ইনস্টলেশন শিল্পী এনজি হিসেল তার ইন্টারডিসিপ্লিনারি কাজ উপস্থাপন করে আসছেন। তিনি জার্মানিতে স্থানকেন্দ্রিক কোরিওগ্রাফির ধারণা বিকাশে কাজ করা কোরিওগ্রাফারদের মধ্যে অন্যতম। রোল্যান্ড কায়সার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার ফর্মস এবং নৃত্য বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি একাধারে নির্দেশক, কোরিওগ্রাফার ও অভিনেতা।