২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অজ্ঞাত লাশের কথা ॥ ঘাতকরা আড়ালেই থাকছে

অজ্ঞাত লাশের কথা ॥ ঘাতকরা আড়ালেই থাকছে
  • খুনীরা অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে স্পর্শকাতর স্থানে লাশ ফেলে যায়, কিছুদিন হৈ চৈ হয় ;###;বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা ও দ্বিখিত অবস্থায় লাশ মেলে ;###;নাম পরিচয় না থাকায় হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি বলে পুলিশ আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দেয়

নিয়াজ আহমেদ লাবু ॥ তিন বছর আগে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদের এমপি হোস্টেল এবং কাফরুল থানাধীন ভাষানটেকের নেভি অফিসার্স কোয়ার্টারের ছাদ থেকে অন্তঃসত্ত্বা দুই অজ্ঞাত যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। দু’জনই বর্বরোচিত খুনের শিকার। দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘাতক গ্রেফতার দূরের কথা দুই যুবতীর পরিচয় পর্যন্ত মেলেনি। হত্যাকা-ের কোন ক্লু বের হয়নি গত তিন বছরে।

দুই যুবতীর লাশ মিলেছিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থানে। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রচার মাধ্যমে চলে তোলপাড়। কিছুদিন পর সবাই ভুলে যায় সব কিছু। চাঞ্চল্যকর মামলা দুটিও চলে গেছে হিমাগারে। আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। হতভাগী দুই তরুণীর স্বজনরা এখনও জানে না তাদের আপনজন না-ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছে। পরিবারের কাছে তারা সারাজীবন নিখোঁজই থেকে যাবে। এক পর্যায়ে লাশ দুটি চলে যাবে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের গবেষণাগারে।

প্রতি বছরই এমন অন্তত ১২শ’ অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়। এদের পরিচয় কোনদিনও পাওয়া যায় না। স্পর্শকাতর ও গুরত্বপূর্ণ স্থানে লাশ পাওয়া গেলে কিছুদিন হৈচৈ হয়। অনেক সময় খুনীরা লাশগুলো পরিকল্পিতভাবে ফেলে রাখে স্পর্শকাতর স্থানে। এসব লাশ বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা ও দ্বিখ-িত অবস্থায় পাওয়া যায়। নাম- পরিচয় না থাকায় হত্যাকারীদের শনাক্ত গুরত্বপূর্ণ স্থানে লাশ পাওয়া গেলে কিছুদিন হৈচৈ হয়। অনেক সময় খুনীরা লাশগুলো পরিকল্পিতভাবে ফেলে রাখে স্পর্শকাতর স্থানে। এসব লাশ বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা ও দ্বিখ-িত অবস্থায় পাওয়া যায়। নাম- পরিচয় না থাকায় হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি বলে পুলিশ আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেয়। নৃশংস খুনগুলোর মামলা আড়ালেই রয়ে যায়। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চলতি বছর ১০ মাসে রাজধানীর ৪৯ থানায় হত্যা, আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনায়সহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ লাশ উদ্ধার করা হয়। এসব লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠিয়েছিল পুলিশ। এর মধ্যে ৬শ’ লাশই অজ্ঞাত। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর পুলিশ ‘ওসব লাশের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি এবং হত্যাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি’ উল্লেখ করে আদালতে ফাইনাল চার্জশীট দিয়ে দেয়।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম সূত্র জানায়, সারাদেশে প্রতিমাসে গড়ে ১শ’ লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে এসব লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এর মধ্যে ট্রেন ও সড়ক দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি। এরপরই খুনের ঘটনা। এগুলোর মধ্যে কারও লাশ বস্তাবন্দী, মস্তকবিহীন, হাত-পা বাঁধা ও দ্বিখ-িত অবস্থায় পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সূত্র জানায়, বর্বরোচিত খুনগুলো পরিকল্পিত। পেশাদার খুনীরা অন্যত্র, তাদের এরিয়া থেকে বহুদূরে লাশগুলো ফেলে যায়, যাতে নিহতদের আত্মীয়স্বজন তাদের স্বজনদের খোঁজ জানতে না পারে। বেশিরভাগই সড়ক ও ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। এসব মৃত ব্যক্তির পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। লাশগুলো অধিকাংশই হাত ও পা কাটা ও খ--বিখ- হয়ে যায়। চেনার উপায় থাকে না। লাশগুলো দাফনের জন্য আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, পুলিশের তদন্তে গাফলতি, দক্ষতার অভাব ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অনেকক্ষেত্রে আড়াল হয়ে যাচ্ছে বর্বরোচিত হত্যার রহস্য। অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ফরেনসিক বিভাগের কতিপয় চিকিৎসক বছরের পর বছর রিপোর্ট আটকে রাখেন। একই অবস্থা মহাখালী রাসায়নিক পরীক্ষাগারের। দীর্ঘ সময় ধরে রিপোর্ট পাওয়া না গেলে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। কোনদিনও এসব হত্যাকা-ের রহস্য উন্মোচিত হয় না। খুনীরাও আবার উৎসাহিত হয়। নির্মম খুনের শিকার এসব নারী-পুুরুষের স্বজনরা জানতে পারে না তাদের আপনজন কোথায় হারিয়ে গেছে। কষ্ট ও বেদনায় স্বজনরা সারাজীবন খুঁজে ফিরে তাদের আপনজনকে। কিছু কিছু হত্যাকা-ের ব্যাপারে অবশ্য ওপর মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এসব ঘটনায় পুলিশও চাপের মধ্যে থাকে। ওপরের চাপ অব্যাহত থাকলে শেষ পর্যন্ত রহস্য উদঘাটিত হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল ফরেনসিক বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত এক মহিলার লাশের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেতে ১৩ মাস সময় লেগেছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন শেরেবাংলা নগর থানার এসআই সঞ্জিত সরকার। তিনি জানান, মামলার তদন্তে বিলম্বের কারণে তার চাকরি খোয়ানোর অবস্থা হয়েছিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না পাওয়ায় তিনি কিছুই করতে পারছিলেন না। দেরিতে চার্জশীট দেয়ার কারণে ওপর থেকে তাকে শোকজ করা হয়। এসআই সঞ্জিত জানান, ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ আনন্দ সিনেমা হলের পাশে মোগল হোটেলের গলি থেকে অজ্ঞাত (২৬) এক মহিলার লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। ওই দিনই লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। প্রায় ১৩ মাস পর চলতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর ওই মহিলার লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়া যায়। সূত্রগুলো জানায়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগে এখনও তিন শ’ রিপোর্ট ঝুলে আছে। বছরের পর বছর ময়নাতদন্ত রিপোর্টগুলো আলোর মুখ দেখেনি।

চলতি বছরে বর্বরোচিত খুনগুলো ॥ গত ৩ মে গভীর রাতে দারুস সালাম থানা এলাকায় চট্টগ্রাম থেকে আসা ঈগল পরিবহনের একটি বাসের লকার থেকে অজ্ঞাত (২৫) এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। দারুস সালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, বাসটির লকার বক্সে একটি লোহার ট্রাঙ্কের ভেতরে রাখা ছিল মরদেহটি। নিহত তরুণীর পরনে হলুদ ছাপা সালোয়ার-কামিজ ছিল। তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করে। গত ২৫ জুন গভীর রাতে পুলিশ উত্তরা পূর্ব থানাধীন ৪ নম্বর সেক্টরের ৬/এ নম্বর সড়কের পাশের স্যুয়ারেজের ম্যানহোল থেকে অজ্ঞাত এক যুবতীর পচাগলা লাশ উদ্ধার করে। উত্তরা পূর্ব থানার ওসি আবু বকর মিঞা জানান, কে বা কারা ওই নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে স্যুয়ারেজ লাইনে ফেলে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে কয়েকদিন আগে হত্যা করা হয়েছিল। এ কারণে তার শরীরে পচন ধরেছে। নিহতের শরীরে চেক সালোয়ার ও কামিজ ছিল। পাঁচ মাসেও পুলিশ দুই যুবতীর পরিচয় ও খুনীদের গ্রেফতার করতে পারেনি।

গত ৯ অক্টোবর অজ্ঞাত (৩০) এক নারীর মৃতদেহ নিয়ে বিপাকে পড়ে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ এ্যান্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, আগেরদিন রাতে সাভারের কোন এক এলাকা থেকে ওই নারীকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে অজ্ঞাত কয়েক যুবক। পরে তারা আর ওই নারীর খোঁজ নিতে আসেনি। পরেরদিন দুপুরে ওই নারীর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ওই নারীর শরীর ও মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর পুলিশ শাহ আলী থানাধীন বেড়িবাঁধের ফারইস্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ফাঁকা জায়গা থেকে অজ্ঞাত (৩৫) এক মহিলার পচাগলা লাশ উদ্ধার করে। ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ হাতিরঝিল লেক থেকে অজ্ঞাত (৩৫) এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে । ২৭ আগস্ট ডেমরায় অজ্ঞাত (৩৫) এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার পর রাস্তায় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। ওইদিন সকালে পুলিশ আশুলিয়া আতিক মার্কেট সংলগ্ন রাস্তার ঢাল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। ২৮ জুলাই বনানীর বেলতলা এরশাদনগর বস্তির একটি বাসায় অজ্ঞাত (২৫) এক তরুণীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ওইদিন সকালে পুলিশ ওই বস্তির ওই কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। বনানী থানার উপ-পরিদর্শক মোস্তাক আহম্মেদ জানান, চলতি মাসের ২০ তারিখে দুই তরুণ-তরুণী নিজেদের স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে এরশাদনগর বস্তিতে রুমটি ভাড়া নেন। তিনি জানান, তরুণীর কথিত স্বামী তাকে হত্যা করে ফেলে পালিয়ে যায়। আজও তার পরিচয় উদ্ধার হয়নি। আর হত্যাকারী কথিত স্বামীর খোঁজ মেলেনি। ১৮ জুন খিলগাঁওয়ে মস্তকবিহীন এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, আগেরদিন খিলগাঁওয়ের নন্দিপাড়া শেখের জায়গা আলী আহমদ স্কুলের পাশে বালুভর্তি খোলা স্থান থেকে তার মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করা হয়। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুস্তাফিজ ভূঁইয়া জানান, তাকে অন্যস্থানে হত্যা করে তার মস্তকবিহীন লাশ এখানে ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। কাটা মাথা খুঁজে পেলে ওই যুবকের পরিচয় শনাক্ত করা যেতে পারে। পহেলা মে শ্রমিক দিবসের ছুটিতে যাত্রাবাড়ী-কুতুবখালী এলাকার এক নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অবনী শংকর কর জানান, ৫/৬ দিন আগে তার স্বামী তাকে হত্যা করে পালিয়েছে। তার শরীর পচেগলে বিকৃত হয়ে গেছে। চেনার উপায় নেই। ২৮ এপ্রিল খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকায় অজ্ঞাত (২০) এক তরুণীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। খিলগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক মুহম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, ৩-৪দিন আগে দুর্বৃত্তরা ওই তরুণীকে হত্যার পর তার লাশ এখানে ফেলে গেছে। এখন পর্যন্ত ওই লাশের পরিচয় ও হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। ২১ মার্চ পুলিশ শাহবাগ থানাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে থেকে অজ্ঞাত (২৭) এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে। শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিয়ার রহমান জানান, পথচারীর মাধ্যমে খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ওই স্থান থেকে অজ্ঞাত ওই যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত যুবকের পিঠের ডান পাশে ও কপালে জখমের চিহ্ন রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কোথাও তাকে হত্যা করে পরমাণু শক্তি কমিশনের সামনে এনে ফেলে রাখা হয়েছে। যুবকের পরনে লাল গেঞ্জি ও নীল জিন্স প্যান্ট রয়েছে। ১৭ মার্চ পুলিশ তুরাগ থানাধীন দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে অজ্ঞাত (৩০) এক যুবকের হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার করে। তুরাগ থানার উপ-পরিদর্শক কামাল হোসেন জানান, অজ্ঞাত ওই যুবকের দুই হাত মাফলার ও দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল। ছাই রঙের গেঞ্জি ও লাল চেক গামছা দিয়ে গলা পেঁচানো ছিল। মুখ ও মাথা থেঁতলানো ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, যুবককে অন্য স্থানে পিটিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা পর তার লাশ এখানে ফেলে গেছে। নিহতের শরীরে ঘিয়া রঙের শার্ট ও ব্লু জিন্স ছিল। ১০ মার্চ পুলিশ মতিঝিলে ফকিরাপুলে এক তরুণীর পাঁচ খ- লাশ উদ্ধার হয়েছে। ওসব খ- উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। এ পর্যন্ত পুলিশের কাজ শেষ। এরপর তাদের লাশের পরিচয় না পাওয়া বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম দাফন করে। এখন পর্যন্ত পুলিশ এসব লাশের পরিচয় উদ্ধার ও খুনীদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। ১০ মাসে এদের মতো অজ্ঞাত হিসেবে শত শত লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হয়ে যায়। পুলিশ এসব হতভাগার লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। তাদের মৃত্যু রহস্য উদঘাটন দূরের কথা পরিচয় পর্যন্ত জানা যায়নি।

আলোচিত দুটি হত্যাকা- ॥ ২০১২ সালের ২১ এপ্রিল রাতে শেরেবাংলা নগর পুলিশের এসআই মিজানুর রহমান এমপি হোস্টেল থেকে অজ্ঞাত(২৮) এক নারীর পচাগলা লাশ উদ্ধার করে। তার গলায় ওড়না পেঁচানো এবং পেটে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নাড়িভুড়ি বের হয়েছিল। পচেগলে মুখম-ল বিকৃত হয়ে যায়। লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক মর্গে পাঠায় পুলিশ। নিহতের পরণে লাল, কাল প্রিন্টের ম্যাক্সি ও পেটিকোট ছিল। এক সপ্তাহে ওই নারীর পরিচয় উদ্ধার না হওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সাড়ে তিন বছরেও পুলিশ এমপি হোস্টেলে নৃশংস হত্যাকা-ের কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি। পরিচয় পায়নি ঐ নারীর। পুলিশ জানায়, এমপি হোস্টেলের যে স্থান থেকে নারীর লাশটি পাওয়া গেছে তার পাশে প্রভাবশালী এমপি ও মন্ত্রীদের অফিস। সেখানে প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী যাওয়া-আসা করেছে। দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংসদ ভবনের এমপি হোস্টেলে অজ্ঞাত ওই নারী খুনের তদন্ত করতে গিয়ে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। তদন্ত কাজে কেউ সহায়তা করেনি। ঘটনার পর সংসদ সদস্যদের কাছে নির্দেশনা সংবলিত একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন স্পীকার। এরপর কিছুই হয়নি। এ ব্যাপারে সেই সময় ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই আজিমুদ্দিন জনকণ্ঠকে জানান, অজ্ঞাত ওই নারীর লাশের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিল। কতদিনে এবং কিভাবে ওই মহিলাকে হত্যা করা হয়েছে, সে ধর্ষিত ও অন্তঃসত্ত্বা ছিল কিনা নানা ধরনের রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল। হত্যাকা-ের তদন্তকাজে এমপি হোস্টেলের কয়েকটি কক্ষ তল্লাশি করা হয়েছিল। একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়েছে।

ওই ঘটনার ২৮দিন পর ’১২ সালের ১৯ মে কাফরুলের নবগঠিত ভাষানটেক থানাধীন মিরপুর ১৪ নম্বর সেকশনে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত নেভি অফিসার্স কোয়ার্টারের ছাদ থেকে অন্তঃসত্ত্বা অজ্ঞাত(৩৫) আরেক সুন্দরী যুবতীর লাশ উদ্ধার করা হয়। এসআই রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলার বাদী তার সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিহতের পরনে ছিল সালোয়ার-কামিজ। তার নাক, মুখ ও গলাসহ মাথায় আঘাতের জখম ছিল। তাকে ৩/৪দিন আগে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ ডীপফ্রিজে রাখা ছিল। সুযোগ বুঝে হত্যাকারীরা গোপনে এই ছাদে ফেলে যায়। হতভাগীর পরিচয়ের জন্য লাশটি দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিক্যালের হিমঘরে রাখা হয়েছিল। পুলিশ হত্যাকা-ের কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত সুরক্ষিত নেভি অফিসার্স কোয়ার্টারের ওই ভবনের ভেতর ২০টি পরিবার বসবাস করে। ভবনের মূল প্রবেশ পথে রয়েছে নিরাপত্তা কর্মী ও নিবন্ধন খাতা। ভবনের ভেতর সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ। ভবনের বাসিন্দাসহ বহিরাগত অতিথিদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে মূল ফটকে কঠোর নিয়মাবলী পালন করতে হয়। মামলার তদন্তে গিয়ে তিনিসহ তার সঙ্গী নিরাপত্তাকর্মীদেরও এসব নিয়ম মানতে হয়েছে। ভবনের সবাই হত্যাকা-ের আগে-পরে কোন দিনই এই মহিলাকে দেখেননি বলে জানান। এক পর্যায়ে ওপর মহলের অনুরোধে তিনি তার তদন্ত কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে আসতে বাধ্য হন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মর্গে গিয়ে সিআইডির মাধ্যমে নিহতের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া হয়েছে। নিহত যুবতীর দাঁত-উরুর আংশিক মাংস এবং গর্ভের পরিপূর্ণ মৃত কন্যাসন্তানের উরুর মাংস নেয়া হয়েছে এবং তা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডিএনএ ল্যাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ যদি নিহত ওই যুবতীকে নিজের বলে দাবি করেন বা পরিচয় মেলাতে ডিএনএ পরীক্ষা করতে চান তবে কাজে লাগবে।