২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুশফিক-সাকিব ঝড়ে উড়ে গেল জিম্বাবুইয়ে

মুশফিক-সাকিব ঝড়ে উড়ে গেল জিম্বাবুইয়ে
  • সাকিবের ক্যারিয়ার সেরা বোলিং, মুশফিকের শতক

মিথুন আশরাফ ॥ একজন ব্যাটিংয়ে ঝড় তুললেন। তিনি মুশফিকুর রহীম। করলেন ১০৭ রান। ক্যারিয়ারের চতুর্থ শতক করলেন। আরেকজন বোলিংয়ে ঝড় তুললেন। টপাটপ উইকেট নিতে থাকলেন। তিনি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। একাই ৫ উইকেট তুলে নিলেন। ক্যারিয়ারে প্রথমবার ওয়ানডেতে এক ম্যাচে ৫ উইকেট শিকার করলেন। দুইজনের এ নৈপুণ্যে প্রথম ওয়ানডেতে উড়েই গেল জিম্বাবুইয়ে। ১৪৫ রানের বড় জয়ে শুরু হল সিরিজ। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে রানের দিক দিয়ে সবচেয়ে বড় জয়ও তুলে নিল বাংলাদেশ।

মুশফিকুর রহীমের শতকের সঙ্গে সাব্বির রহমানের (৫৭) অর্ধশতকে ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৭৩ রান করে বাংলাদেশ। সাকিবের সঙ্গে শতভাগ ফিট না থাকা মাশরাফির (২/১৩) দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৩৬.১ ওভারে ১২৮ রানেই অলআউট হয়ে যায় জিম্বাবুইয়ে। আয়েশি জয় তুলে নিল বাংলাদেশ। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই জিম্বাবুইয়ে দলটি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। বাংলাদেশ ইনিংসের মাঝপথে দলটির ওপেনার উইকেটরক্ষক রিচমন্ড মুতুম্বামি ফিল্ডিং করার সময় যে গোঁড়ালিতে ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়লেন, তাকে এ্যাপোলো হাসপাতালে পর্যন্ত নিতে হল। সিরিজ খেলাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ল মুতুম্বামির। ব্যাটিংই করতে পারলেন না। তাইতো ৯ উইকেট পড়তেই জিম্বাবুইয়ে ইনিংসের পতন হয়ে গেল। মুতুম্বামির ইনজুরিতে জিম্বাবুইয়ে কী আরও দুর্বল হয়ে পড়ল না? সোমবার দ্বিতীয় ও বুধবার তৃতীয় ওয়ানডে অনুষ্ঠিত হবে। যে কোন একটি ম্যাচ জিতলেই এখন সিরিজ জিতে নেবে মাশরাফি বাহিনী।

গতবছর জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে ৫-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই থেকে দেশের মাটিতে আর কোন সিরিজ হারেনি মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, তামিমরা। পাকিস্তানকে হোয়াইট ওয়াশ করার পর ভারতকেও সিরিজে হারিয়ে দেয়। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজে হারায়। এবার জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজে জিতলে দেশের মাটিতে টানা পাঁচ ওয়ানডে সিরিজ জেতার গৌরব মিলবে। পারবে বাংলাদেশ তা করতে? প্রথম ওয়ানডে শেষ হতে সেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে সহজেই যে সিরিজ জেতা যাবে, তাও ধারণা হয়ে গেছে। প্রথম ওয়ানডেতে যে জিম্বাবুইয়েকে উড়িয়েই দিয়েছে বাংলাদেশ।

প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশ হারের পর একটা শঙ্কা তৈরী হয়েছিল। জিম্বাবুইয়ে না আবার কোনভাবে জিতে যায়। কিন্তু বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা এরপরও দাপটের সঙ্গেই জেতার কথা বলেছেন। প্রথম ওয়ানডেতে যে অবস্থা দেখা গেল, তাতে বাংলাদেশ যে সিরিজে দাপটের সঙ্গেই জিতবে; তা বোঝাই যাচ্ছে।

টস জিতে জিম্বাবুইয়ে। অথচ আগে বাংলাদেশকেই ব্যাট করতে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের মাথায় প্রস্তুতি ম্যাচই ছিল বোধহয়। টার্গেট অতিক্রম করে যদি জেতা যায়। তাছাড়া যদি বাংলাদেশকে দ্রুত বেঁধে ফেলা যায়, তাহলে জয় সম্ভব হলেও হতে পারে। শুরুতে সেই সম্ভাবনা যে তৈরি হয়নি এমনটি নয়। ১২৩ রানে লিটন (০), মাহমুদুল্লাহ (৯), তামিম (৪০), সাকিবের (১৬) আউটে বাংলাদেশ বিপাকেই পড়ে যায়। বাংলাদেশ বেশিদূর যেতে পারবে কিনা সেই শঙ্কাই তৈরি হয়। কিন্তু মুশফিক ও সাব্বির মিলে সেই বিপদ থেকে দলকে রক্ষা করেন। শুধু রক্ষা করেই ক্ষান্ত হননি। দুইজন মিলে পঞ্চম উইকেটে ১১৯ রানের জুটি গড়ার সঙ্গে বড় ইনিংসও গড়েছেন।

মুশফিক শেষপর্যন্ত ১০৯ বলে ৯ চার ও ১ ছক্কায় ১০৭ রান করেছেন। আর সাব্বিরের ব্যাট থেকে আসে ৫৮ বলে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৫৭ রান। দুইজনই মূলত দলকে বড় স্কোর গড়ার দিকে নিয়ে গেছেন। সাব্বিরের আউটের মধ্য দিয়ে ২৪২ রানে গিয়ে এ দুইজনের জুটি ভেঙ্গে যায়। এরপর ১ রান যোগ হতেই নাসির (০) ও মুশফিক আউট হয়ে যান। শেষে গিয়ে মাশরাফি ও আরাফাত সানি দুর্দান্ত ব্যাটিং করেন। অষ্টম উইকেটে মাশরাফি-আরাফাত মিলে ২১ রানের যে জুটি গড়েন, সেখানেই দলের স্কোর আড়াইশ ছাড়িয়ে যায়। মাশরাফির ব্যাট থেকে আসে ১৪ রান ও আরাফাত ১৫ রান করেন। ৫০ ওভারে ৯ উইকেট হারিয়ে ২৭৩ রান করে বাংলাদেশ। ম্যাচ জেতার সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়। শেষপর্যন্ত ম্যাচও জিতে নেয় বাংলাদেশ।

উদ্বোধনী জুটিতে শুধু একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারে জিম্বাবুইয়ে। চিভাবা ও জঙ্গে মিলে ৪০ রানের জুটি গড়েন। এরপর থেকে আর কোন জুটিই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ম্যাচে জিম্বাবুইয়ের ইনিংসে এরচেয়ে বড় জুটি আর হয়নি। চিভাবাকে আউট করেই সাকিবের দিন উদযাপন শুরু হয়। এরপর এক এক করে এরভিন, উইলিয়ামস, ক্রেমার ও পানিয়াঙ্গারাকে আউট করে দিয়ে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৫ উইকেট শিকার করলেন সাকিব। মাঝপথে শতভাগ ফিট না হলেও ৬ ওভার বল করে মাত্র ১৩ রান দিয়ে ২টি উইকেট তুলে নিলেন মাশরাফি। সিকান্দার রাজা ও ওয়েলারকে সাজঘরে ফেরান। ৪০ রানে চামু চিভাবার (৯) উইকেট পতনের পর ৪৮ রানে ক্রেইগ এরভিন (২), ৫৪ রানে লুক জঙ্গে (৩৯), ৬৫ রানে শিন উইলিয়ামস, ৭৯ রানে সিকান্দার রাজা (৩), ৮৩ রানে ম্যালকম ওয়েলার (১) আউট হন। একটা সময় মনে হয়েছিল, ১০০ রানও করতে পারবেনা জিম্বাবুইয়ে। শেষপর্যন্ত ১৩০ রানের কাছাকাছি চলে যায়। ১২০ রানে গ্রায়েম ক্রেমার (১৫) আউটের পর ১২৮ রানে গিয়ে টিনাসে পানিয়াঙ্গারা (৫) ও জিম্বাবুইয়ের হয়ে এ ম্যাচে সর্বোচ্চ রান করা এলটন চিগুম্বুরা (৪১) আউট হতেই জিম্বাবুইয়ের ইনিংস শেষ হয়। সাকিব ১০ ওভার বল করে ৪৭ রান দিয়ে একাই ৫ উইকেট তুলে নেন। এরআগে ওয়ানডেতে ৬ বার চার উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব দেখালেও এবারই প্রথম কোন দলের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৫ উইকেট নিতে সক্ষম হলেন টেস্টে ১৪ বার ৫ উইকেট শিকার করা সাকিব।

বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিতীয় সর্বনি¤œ রান করে জিম্বাবুইয়ে। ২০০৯ সালে চট্টগ্রামে ৪৪ রানে অলআউটের পর এবার ১২৮ রানে গুটিয়ে গেল জিম্বাবুইয়ে। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় পেল বাংলাদেশ। এরআগে গতবছর মিরপুরেই যে ১২৪ রানে জিতেছিল, জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সেটিই সবচেয়ে বড় জয় ছিল বাংলাদেশের। এমন বড় জয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় বড় জয়ও মিলল। ২০১২ সালে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৬০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটিই এখন পর্যন্ত রানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয়। এরআগে ২০০৬ সালে যে মিরপুরে স্কটল্যান্ডকে ১৪৬ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ, সেটি দ্বিতীয় বড় জয়। শনিবার জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের তৃতীয় বড় জয় মিলল। এ জয় আসল ম্যাচ সেরা মুশফিকের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পর সাকিবের অসাধারণ বোলিং ঝড়ে। তছনছ হয়ে গেল জিম্বাবুইয়ে। উড়ে গেল।