১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এটাই সান্ত্বনা ॥ রাজন-রাকিবের মা সন্তান ফিরে পেলেন না, ৬ খুনীর ফাঁসির আদেশ

এটাই সান্ত্বনা ॥ রাজন-রাকিবের মা সন্তান ফিরে পেলেন না, ৬ খুনীর  ফাঁসির আদেশ
  • রাজন হত্যা মামলায় ৪ জনের ফাঁসি, একজনের যাবজ্জীবন, তিনজনের ৭ বছর ও একজনের এক বছরের কারাদ-;###;রাকিব হত্যায় দুইজনের ফাঁসি;###;রাকিব হত্যায় একজন খালাস পাওয়ায় তার মা ক্ষুব্ধ, অজ্ঞান হয়ে যান আদালতে

অমল সাহা/সালাম মশরুর/আরাফাত মুন্না ॥ ছেলেহারা দুই মায়ের দাবি ছিল খুনীদের ফাঁসি। ওদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তাতে ফাঁসি ছাড়া অন্য কিছু হয়ইবা কী করে? কী নির্মমতা, কী ভয়াবহতাই না ছিল সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনার শিশু রাকিব হত্যার ঘটনায়। গোটা জাতি থমকে গিয়েছিল। দেশব্যাপী একই দাবি উঠেছিল, খুনীদের ফাঁসি চাই। অবশেষে প্রাপ্য সাজাই পেল রাজন-রাকিবের হত্যাকারী মানুষরূপী পশুরা। বিচারক খুনীদের ফাঁসির সাজাই দিলেন। রাজন ও রাকিবের মা সন্তান ফিরে পাননি, তবে সন্তান হত্যার বিচার পেলেন, এটাই তাদের সান্ত¡না। রবিবার সিলেট ও খুলনার আদালতে রাজন ও রাকিব হত্যার পৃথক মামলায় ছয় আসামিকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। মামলা দুটির অন্য আসামিদের শাস্তি হয়েছে। বিচার শুরু হওয়ার এক মাসের মধ্যেই এলো এই দুই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার রায়। দেশের ইতিহাসে এই দুই বিচারকও নজির হয়ে থাকবেন।

রবিবার রায় ঘোষণা করা হবে- এ খবর আগে থেকেই জানা সবার। তাই তো সকাল থেকে ভিড় বাড়তে থাকে সিলেট ও খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতপাড়ায়। রায় উপলক্ষে আদালতপাড়ার নিরাপত্তাও কঠোর করা হয়। অনেকেই কাজকর্ম ফেলে এসেছেন রায় শুনতে। এদের অধিকাংশই শুনানির জন্য ধার্য দিনগুলোতেও ছুটে এসেছেন আদালতে। সবার একই কৌতূহলÑ রায় কী হবে? উপস্থিত জনগণের একটাই দাবি ছিল খুনীদের ফাঁসি। কেউ কেউ সকাল থেকে আদালতপাড়ায় সেøাগানও দিয়েছেন। সেøাগানে দাবি একটাইÑ খুনীদের ফাঁসি চাই।

দুপুর ১২টার দিকে সামিউল আলম রাজন (১৩) হত্যা মামলার ৭৬ পৃষ্ঠার রায় পড়া শুরু করেন সিলেট মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা। ১২টা ৪০ মিনিটে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির রায় ঘোষণা করেন বিচারক। রায়ে রাজন হত্যা মামলার মূল আসামি কামরুলসহ চার আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ প্রদান করেছে আদালত। একজনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, তিনজনকে সাত বছরের কারাদ- ও দু’জনকে এক বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। রায়ে খালাস দেয়া হয়েছে তিনজনকে। রায় ঘোষণার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে সিলেটের আদালতপাড়া। রায়ের পর রাজনের পরিবারসহ সকলের একটাই দাবি- দ্রুত রায় কার্যকর করা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা। আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করবে বলে জানিয়েছে।

অন্যদিকে, দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিলরুবা সুলতানা ঘোষণা করেন চাঞ্চল্যকর শিশু রাকিব (১২) হত্যা মামলার রায়। রায়ে দুই আসামিকে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছে আদালত। তিন আসামির অপরজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছে আদালত। এ রায়ে সন্তুষ্ট হলেও এক আসামিকে খালাস দেয়া মেনে নিতে পারেননি রাকিবের মা লাকি বেগম। তিনি কেঁদে কেঁদে বলেন, যাকে খালাস দেয়া হয়েছে ওর কথামতোই আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আশা করেছিলাম খুনীদের সবার ফাঁসি হবে। তাদের ফাঁসি হলে রাকিবের আত্মা শান্তি পাবে। একজনের কোন শাস্তি না হওয়া এই রায় মানি না বলে আহাজারি করতে থাকেন রাকিবের মা। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। ওই সময় গোটা খুলনা আদালতপাড়ায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা। রাকিবের মায়ের আহাজারিতে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।

এদিকে, চাঞ্চল্যকর এই মামলা দুটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে বলেছেন, দেশের ইতিহাসে এত দ্রুত হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হওয়া নজিরবিহীন। ভবিষ্যতে সব মামলার বিচার যদি এমনভাবেই নিষ্পত্তি হয় তাহলে দেশের মামলাজট অনেকটাই কমে যাবে। সংশ্লিষ্টরা এই দুই বিচারককেও ধন্যবাদ জানান।

রাজন হত্যা ॥ চাঞ্চল্যকর রাজন হত্যা মামলার মোট ১৩ আসামির মধ্যে চার আসামিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ প্রদান করেছে আদালত। একজনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, তিনজনকে সাত বছরের কারাদ- ও দু’জনকে এক বছরের কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। রায়ে খালাস দেয়া হয়েছে তিনজনকে।

মৃত্যুদ-প্রাপ্ত চার আসামি হলেনÑ মহানগরীর জালালাবাদ থানার কুমারগাঁও এলাকার শেখপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে কামরুল ইসলাম (২৪), চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না (৪৫), তাজ উদ্দিন বাদল (২৮) ও জাকির হোসেন পাভেল। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ময়না চৌকিদারকে অপর দুটি ধারায় পৃথকভাবে সাত বছর ও এক বছর করে কারাদ- প্রদান করে আদালত। হত্যাকা-ের ভিডিওচিত্র ধারণকারী নূর মিয়াকে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করে আদালত। সাত বছরের সাজা হয় কামরুলের দুই ভাই মুহিত আলম ও আলী হায়দার ওরফে আলী এবং পলাতক শামীম আহমদের। অপর দুই আসামি আয়াজ আলী ও দুলালকে এক বছর করে কারাদ- দেয় আদালত। দ-প্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে দশ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাস করে সশ্রম কারাদ- প্রদান করে আদালত। অপরদিকে, অপরাধ সন্দেহজনকভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস পান ফিরোজ মিয়া, আজমত আলী ও রুহুল আমিন।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ॥ আদালত তার পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার আইনের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং বাংলাদেশের শিশু অধিকার রক্ষা আইনের ধারা উল্লেখ করে আদালত বলেছে, প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা আইনের বাধ্যবাধকতা এবং এটা নিশ্চিত করা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যত ও অধিকার রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা সর্বস্তরের মানুষের কর্তব্য। পর্যবেক্ষণে আদালত আরও বলেছে, শিশু রাজনের ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে এটা আমাদের মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বাংলাদেশ একটি আধুনিক রাষ্ট্র। বাংলাদেশ একটি ওয়েলফেয়ার স্টেট। এটি একটি কল্যাণকামী রাষ্ট। এই রাষ্ট্রে কোনভাবেই কোন নাগরিক বা শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করা হোক এটা আমরা চাই না। এটা আধুনিক বিশ্বের কোন নাগরিকই চায় না। সুতরাং এটা আমাদের জন্য কলঙ্কজনক এবং এ ধরনের ঘটনার যাতে আর পুর্নরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য সকল নাগরিকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন থাকতে হবে।

গত ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় সদর উপজেলার কান্দিরগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের আজিজুল ইসলাম আলমের ছেলে সামিউল আলম রাজনকে। নৃশংস এ হত্যাকা-ের পর মরদেহ গুম করতে গিয়ে জনতার হাতে আটক হন কামরুলের ভাই মুহিত আলম। হত্যাকারীদের নির্যাতনের ২৮ মিনিটের ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। খুনীদের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে জনতা।

রাজন হত্যাকা-ের পর মহানগরীর জালালাবাদ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে মুহিত আলমসহ অজ্ঞাত ৪-৫ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে গিয়ে হত্যাকারীদের সঙ্গে আর্থিক সমঝোতার অভিযোগে বরখাস্ত হন জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন, এসআই জাকির হোসেন ও আমিনুল ইসলাম। এরই মধ্যে দেশ ছাড়েন মামলার প্রধান আসামি কামরুল। সৌদি আরবে পালিয়ে যান তিনি। পরে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীরা কামরুলকে বাংলাদেশ দূতাবাসে হস্তান্তর করেন।

গত ১৬ আগস্ট সৌদি আরবে আটক কামরুল ইসলামসহ ১৩ আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে এ হত্যা মামলার চার্জশীট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর সুরঞ্জিত তালুকদার। ৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আদালতের বিচারক সাহেদুল করিম। ১৬ সেপ্টেম্বর এ আদালতে মামলার প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ২২ সেপ্টেম্বর আদালতের বিচারক চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলায় সৌদি আরবে আটক কামরুলসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। ১ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ কার্যদিবসে মোট ৩৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। কামরুলের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২১ অক্টোবর ১১ জন সাক্ষী ফের সাক্ষ্য দেন তার উপস্থিতিতে। ২৫ অক্টোবর এ মামলায় ৩৪২ ধারায় আসামিদের মতামত গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুরু হয়। গত ২৭ অক্টোবর তিন কার্যদিবসে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আসামিদের উপস্থিতিতে ৮ নবেম্বর রায়ের দিন নির্ধারণ করেন আদালতের বিচারক।

এদিকে, নির্মম এ হত্যাকা-ের পর মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম সৌদি আরবে পালিয়ে গিয়েও রক্ষা পাননি। প্রবাসীরা তাকে ধরে বাংলাদেশ দূতাবাসে হস্তান্তর করেন। পুলিশ সৌদি আরবে গিয়ে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গত ১৫ অক্টোবর তাকে দেশে নিয়ে আসে। আসামিদের মধ্যে গ্রেফতারকৃত কামরুল, তাজ উদ্দিন বাদল ও রুহুল আমিন ছাড়া অন্য ৮ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন।

রাকিব হত্যা ॥ খুলনায় আলোচিত শিশু রাকিব (১২) হত্যা মামলার দুই আসামিকে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছে আদালত। তিন আসামির অপরজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। ফাঁসির দ-াদেশপ্রাপ্ত আসামিরা হলেনÑ মোঃ শরীফ (৩০) ও মোঃ মিন্টু খান (৩৫)। খালাস পেয়েছেন আসামি বিউটি বেগম (৪৫)। বিউটি বেগম এ মামলার প্রধান আসামি মোঃ শরীফের মা।

আদালত তার রায়ে আসামি শরীফ ও মিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দু’জনকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দিয়েছে। আসামি বিউটি বেগমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। রায় ঘোষণার সময় এজলাসে বিপুলসংখ্যক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা।

শিশু রাকিব হত্যার রায়কে কেন্দ্র করে রবিবার সকাল থেকে খুলনা মহানগর ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণসহ আদালতের সামনের রাস্তায় উৎসুক মানুষের ভিড় জমতে থাকে। সকাল সাড়ে দশটার দিকে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন রাকিবের বাবা মোঃ নুরুল আলম, মা লাকি বেগম ও ছোট বোন রিমি। এরপর উৎসুক মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। সংবাদকর্মী ও আইনজীবীরাও সেখানে জড়ো হন। টুটপাড়া এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ও শিশুরা আদালত চত্বরে আসে। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আসামিদের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে আনা হয়। এ সময় রাস্তায় ও আদালত চত্বরে রাকিবের খুনীদের ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই বলে সেøাগান দেয়া হয়। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত ও আদালত এলাকায় পুলিশের কর্মকর্তাসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এ্যাডভোকেট সুলতানা রহমান শিল্পী সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামি শরীফ ও মিন্টুকে ফাঁসির দ-াদেশ দিয়েছে আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অপর আসামি বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতে শুধু রায়ের অংশটুকু পড়ে শোনানো হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ কী তা না জেনে বলা সম্ভব নয়। তবে বিউটি বেগম খালাস পাওয়ায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি রাকিবের পরিবার।

আসামিপক্ষের আইনজীবী চৌধুরী তৌহিদুর রহমান তুষার তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এ রায় হয়নি। আবেগতাড়িত হয়ে এই রায় দেয়া হয়েছে। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপীল করবেন বলে তিনি জানান।

রাকিব হত্যা ঘটনার মাত্র ৯৮ দিনের মাথায় মাত্র ১১ বিচারিক কার্যদিবসে রায় ঘোষণা করল আদালত, যা খুলনাসহ সারাদেশের বিচার ও আইন-আদালতের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। রাকিব হত্যাকা-ের শিকার হয় চলতি বছরের ৩ আগস্ট। ৪ আগস্ট রাকিবের বাবা নুরুল আলম তিনজনকে আসামি করে খুলনা থানায় মামলা দায়ের করেন। ২৫ আগস্ট এজাহারভুক্ত তিন আসামি মোঃ শরীফ, মোঃ মিন্টু খান ও বিউটি বেগমকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করা হয়। বিচারিক কাজ শুরু হয় ১ অক্টোবর। ওই দিন চার্জশীট আমলে নেয় আদালত। ৫ অক্টোবর আসামিদের বিরদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ১১ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচদিন এবং ২২ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২৮ অক্টোবর আসামিদের পরীক্ষা করা হয়। ১ নবেম্বর যুক্তিতর্ক শেষে ৮ নবেম্বর রায় ঘোষণার জন্য দিন ঠিক করেন বিচারক। মামলায় মোট ৩৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।

দ্রুততম সময়ে এই রায় ঘোষণাকে নজিরবিহীন ঘটনা বলেছেন খুলনা পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য প্রবীণ আইনজীবী এ্যাডভোকেট এনায়েত আলী। তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ে বিচার নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার মানুষ চায়। এটা তাদের মৌলিক অধিকার। শিশু রাকিব হত্যা মামলাটির রায় এত কম সময়ের মধ্যে হলো যা একটি নজির স্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতায় এটা সম্ভব হয়েছে। অন্যক্ষেত্রে এই ধারা বজায় রাখা গেলে বিচারপ্রার্থীরা উপকৃত হবে। নিরাশার মাঝে মানুষ আশার আলো দেখতে পাবে। তিনি বলেন, বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে যে কোন আদালতে দ্রুতবিচার নিষ্পত্তি ও ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, রাকিব হত্যা মামলাটির রায় দ্রুততম সময়ে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সকলে প্রশংসার দাবিদার। চাঞ্চল্যকর অপরাধগুলোর যদি দ্রুত ন্যায়বিচার সম্পন্ন করা যায় তাহলে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আস্থার ভাব ফিরে আসবে। তিনি রাকিব হত্যা মামলার দৃষ্টান্তটি সংশ্লিষ্ট সকলের মাথায় রাখা উচিত বলে মনে করেন।

গত ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনা মহানগরীর টুটপাড়া কবরস্থান এলাকার মোটরসাইকেল গ্যারেজ শরীফ মোটর্স নামক একটি গ্যারেজের মধ্যে রাকিববে আটকে রেখে মোটরসাইকেলে হাওয়া দেয়া কম্প্রেসার মেশিনের পাইপের মুখ তার পায়ুপথে ঢুকিয়ে পেটে হাওয়া দেয়া হয়। এতে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। রাকিবের অপরাধ ছিল শরীফ মোটর্সের কাজ ছেড়ে অন্য গ্যারেজে সে কাজ নিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আগের মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টু রাকিবকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করে। পেটে হাওয়া দেয়ার সময় শরীফের মা বিউটি বেগম রাকিবকে মেঝেতে চেপে ধরেন। এ ঘটনায় স্থানীয় জনতা ওই মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক মোঃ শরীফ (৩০) ও মিন্টু খানকে (৩৫) গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। পরে শরীফের মা বিউটি বেগমকেও পুলিশ গ্রেফতার করে। ঘটনার পরদিন (৪ আগস্ট) নিহত শিশুর বাবা নুরুল আলম ওই তিনজনকে আসামি করে খুলনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ২৫ আগস্ট মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা খুলনা থানার এসআই কাজী মোস্তাক আহমেদ এজাহারবুক্ত তিন আসামিকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন