১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাহসী হলে সন্ত্রাসীরা পরাজিত হবে- এগিয়ে আসুন

সাহসী হলে সন্ত্রাসীরা পরাজিত হবে- এগিয়ে আসুন
  • সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী;###;‘যার হাতে মানুষ পোড়ে তার সঙ্গে সংলাপের ইচ্ছা আমার নেই’

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জাতীয় সংলাপের আহ্বান নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, এত দৈন্যদশায় বাংলাদেশ পড়েনি, এত রাজনৈতিক সঙ্কট পড়েনি যে, এ ধরনের একজন খুনীর সঙ্গে বসতে হবে। দয়া করে আমাকে ওই (খালেদা জিয়া) খুনীর সঙ্গে বসতে বলবেন না। উনার সঙ্গে বসলেই পোড়া মানুষের গন্ধ পাব। যার হাতে মানুষ পোড়ে, তার সঙ্গে সংলাপের ইচ্ছা আমার নেই। আর যারা ওই সংলাপের কথা বলছেন তাদের বলবÑ এ কথা বলার আগে বিএনপি নেত্রী বলুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার উনি সমর্থন করেন। উনি বলুকÑ একাত্তরে গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার হচ্ছে, তা সঠিক হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ুক, তারপরই সংলাপের বিষয়টি দেখা যাবে। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কঠোর অবস্থানে। তিনি নিজের জীবনের হুমকিকে পরোয়া না করার কথা উল্লেখ করে বলেন, যে কোন পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। জনগণকে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে আসতে বলেন তিনি। সাহসী হলে সন্ত্রাসীরা পরাজিত হবে।

বাংলাদেশকে ‘আফগানিস্তান, সিরিয়া বা পাকিস্তানের’ মতো ব্যবহার করার জন্য সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যা ও হামলার পেছনে আইএস বা জঙ্গীগোষ্ঠী জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দিতে ‘চাপ’ থাকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে যে কোনভাবে অনিরাপদ প্রমাণে ‘আর্টিফিশিয়ালি’ এসব হত্যা-হামলা ঘটানো হচ্ছে। বাংলাদেশে আইএস আছে এটি প্রমাণ করতে চাইছে। বাংলাদেশকে সিরিয়া, মিসর, ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান বানানোর জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি দেশীয় ষড়যন্ত্রও আছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে কোনভাবে যদি অনিরাপদ করা যায়; জঙ্গী আছে, আইএস আছে, এটা যদি স্বীকার করানো যায়, তাহলে বাংলাদেশে হামলা করা যায়Ñ এ পরিকল্পনা কিন্তু অনেকেরই আছে। এ বিষয়ে দেশের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা চাই না এদেশ অস্থির ভুখ- হোক। সিরিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তানের মতো অবস্থার সৃষ্টি হোক বাংলাদেশে। এ ব্যাপারে যদি জাতি হিসেবে সচেতনতা অর্জন না করি তাহলে এদেশের সর্বনাশ হবে। কারণ ওই সব দেশের মতো আমাদের দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হোকÑ এটা আমাদের কাম্য নয়।

রবিবার গণভবনে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আইএস-জঙ্গী আছে প্রমাণ করা গেলে বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে, তা দেশবাসীকে অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সিরিয়ায় কী হচ্ছে? লিবিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে কী হচ্ছে? এসব দেশে যা হচ্ছে, তারা বাংলাদেশেও সে অবস্থা সৃষ্টি করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে তেমন অবস্থা সৃষ্টি হোক, তা আমাদের সরকারের কাম্য নয়। প্রচ- চাপ আছে যে আমরা কেন স্বীকার করি না। আমরা দেখতে পাচ্ছি কে এবং কারা এসব করছে। আমাদের যে সমাজ, তাতে সবাই চেনা।

তিনি বলেন, যারা ধরা পড়ছে তারা একটি বিশেষ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হয়ত ছাত্রজীবনে শিবির করেছে নয়ত ছাত্রদল করেছে। আর কাউকে তো দেখছি না। বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখনই ‘অনিরাপদ অনিরাপদ’ বলে চিৎকার করা হচ্ছে। তাদের আরও পরিকল্পনা আছে। তারা অনেকদূর এগোতে চায়। যারা বলছে বাংলাদেশ নিরাপদ নয়, তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অনেকে বাংলাদেশকে অনিরাপদ করতে চায়। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানকে মারছে। সূত্রটা কার? ক্রীড়ানক কে? খেলছে কে? এটা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু আশুরার আগের রাতের বোমা হামলার ঘটনাকে ‘শিয়া-সুন্নীর গোলমাল’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ যে দু’জন মারা গেছেন তারা সবাই সুন্নী। এ সময় তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্পষ্ট কথা বলছি। কারণ আমি দেশকে ভালবাসি। আমি আমার বাবার সন্তান। বাবা-মা, ভাই সবাইকে হারিয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। তাই কোন হুমকি-ধমকিকে পরোয়া করি না।

নেদারল্যান্ডস সফরের সফলতা, অর্জন ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দুই বিদেশীসহ লেখক-প্রকাশক-পুলিশ হত্যা, বাংলাদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র বানাতে দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং এ্যামনেস্টির বিবৃতিসহ নানা ইস্যুতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মান্নান এমপি, ড. হাছান মাহমুদ এমপি, আবুল কালাম আজাদ এমপি, ক্যাপ্টেন (অব) এ বি তাজুল ইসলাম এমপি, প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন এমপি, হাজী মোহাম্মদ সেলিম এমপি, জাসদের শিরিন আখতার এমপি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদ, প্রেসসচিব ইহসানুল করিমসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিজয়ী হওয়ায় সকল খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানান।

হত্যা-হামলায় খালেদা জিয়ার হাত আছে ॥ এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিবৃতিতেই প্রমাণ হয় দেশে যেসব হত্যা-হামলার ঘটনা ঘটছে এসবের সঙ্গে তার হাত আছে। মানুষ হত্যা করে উনি বলছেন, জাতীয় সংলাপ ও নির্বাচন হলেই নাকি সঙ্কটের সমাধান হবে! তার মানে এসবে উনার হাত আছে। হয়ত উনার গুণধর পুত্র লন্ডনে বসে এসব ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। তিনি বলেন, উনার বক্তৃতা-বিবৃতিতে যেখানে উনি জাতীয় সংলাপের কথা বলছেন, সেখানে আমাকে কী নামে অভিহত করা হয়েছে সেটাও আপনাদের (সাংবাদিক) দেখতে হবে। উনি এই নামে অভিহিত করেন, আবার বসতেও চানÑ এটা আবার কেমন কথা? তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কথার মধ্য দিয়েই বেরিয়ে গেছে যেখানে যেটা ঘটছে তার সঙ্গে উনার একটা সংযোগ আছে। এটা যে তারই (খালেদা জিয়া) উৎসাহে হচ্ছেÑ এটা তো স্পষ্ট।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার উৎখাতের নামে জ্বালাও-পোড়াও, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার পরও যখন দেখল কাজ হচ্ছে না, তখনই গুপ্তহত্যায় নেমে পড়েছে একটি মহল। টার্গেট করে এসব হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। এখন বিদেশী হত্যা করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হচ্ছে। যারা এটা করছেন তারা কী দেশের কল্যাণ বয়ে আনছেন? আজ দেশে যখন উন্নয়ন হচ্ছে, দেশের মানুষ খেয়ে পড়ে ভাল আছে, প্রত্যেকের উপার্জন বাড়ছে, আজ ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে, যখন মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে অনিরাপদ বলে একটি আওয়াজ তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে সচেতন হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা শক্ত হাতে জঙ্গী দমন করেছি। জনগণকে আহ্বান করব বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ রাখতে এসব খুনী-সন্ত্রাসী ও ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে সরকারকে সাহায্য করতে।

এ ধরনের হামলা যারা চালিয়েছে এবং যারা এর পেছনে রয়েছে, তাদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, অর্থায়ন মূলত একটি দল করছে, আর মাঠে খুনখারাবির কাজ আরেকটি দল করছে। এর বেশ কিছু তথ্য আছে, আরও তথ্য যোগাড় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি। এর সুফল যেমন পুরো দেশের মানুষ পাচ্ছে, তেমনি কিছু কুফলও আছে। এত বেশি আমরা থ্রিজি, ফোর-জিতে গেছি, ইন্টারনেট-ভাইবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের এ্যাপ ব্যবহার করে এই জঙ্গীরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভাইবারসহ নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপকর্ম করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দেখব এটা যদি খুব বেশি-ই করে, হয়ত একটি সময়ের জন্য, কিছু দিনের জন্য অন্তত এটা বন্ধ করে দিয়ে এই লিংকগুলো ধরার চেষ্টা করব। জঙ্গী অর্থায়ন কীভাবে হচ্ছে তাও খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।

কোন তদন্ত ছাড়াই এসব ঘটনাকে সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলা হচ্ছে, যা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তাদের (বিএনপি-জামায়াত) ষড়যন্ত্রের মধ্যে কি পা দেব? এসব তো পরিকল্পিত ঘটনা। তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা তো কী বলব? বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো ‘সহজ’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমেরিকায় প্রতিটি মিনিটে কত ক্রাইম হচ্ছে? সে হিসাবে বলব বাংলাদেশ নিরাপদ। অনিরাপদ না। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের বহু বাংলাদেশী খুন হয়েছে, সেদেশের রাষ্ট্রপতিকে কী আপনারা এ নিয়ে প্রশ্ন করতে পারতেন? পাল্টা প্রশ্ন রাখেন প্রধানমন্ত্রী।

যারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের খুঁজে দিতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হাঁড়ির ভাত একটা টিপলেই যেমন বোঝা যায় সব ভাত সিদ্ধ হয়েছে। তেমনি একটি ঘটনায় যদি আমি টের পাই বা লিংক পাই বা তথ্য পাইÑ সেখান থেকেও তো ধরে নিতে পারি ঘটনাগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে। তাহলে এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলবে না তো কি বলবে?

বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সংলাপ নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এত রাজনৈতিক সঙ্কট পড়েনি যে, এই ধরনের একজন খুনীর সঙ্গে বসতে হবে। যার হাতে মানুষ পোড়ে, তার সঙ্গে বসার কোন ইচ্ছা আমার নেই। আমি অনেক টলারেট করেছি। বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত। জিয়া ও তার স্ত্রী বঙ্গবন্ধুর খুনীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পুরস্কৃত করেছে। তা জেনেও রাজনীতির স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এদের সঙ্গে বসেছি, কথা বলেছি। তিনি বলেন, আমি রাজনীতি করলেও একজন মানুষ। আমার একটা দেশ, দল আছে। আমার দলের সম্মানটাও বড়।

তিনি বলেন, এখন উনি (খালেদা জিয়া) সংলাপের কথা বলছেন। কী উদ্দেশ্যে বলছেন সেটাই আমার প্রশ্ন। আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। সংলাপে বসার আগে উনি বলুক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। যারা সংলাপের কথা বলছেন আগে উনার (খালেদা জিয়া) মুখ থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গ ছাড়ার কথা বলুন। আর নির্বাচন বানচাল ও আন্দোলনের নামে উনি যে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন, তাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বলুন। যারা আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে- তাদের সুস্থ করে দিতে বলুন।

এ সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি কারও বাড়িতে গেলে যদি আপনার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, তাহলে কি আপনি তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন? আমি রাজনীতি করি, আমরা একটা দল আছে, দেশ আছে। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী হয়েও আমি টেলিফোন করে অফার দিয়েছিলাম, আসুন সর্বদলীয় সরকার গঠন করি। কোন্ কোন্ মন্ত্রণালয় চান তা দেয়ারও প্রস্তাব দিয়েছিলাম। উনি কি এসেছিলেন? তার উত্তর কী দিয়েছিলেন? কী ঝাড়ি খেতে হয়েছে ওনার কাছ থেকে তা দেশবাসী দেখেছে। তিনি বলেন, যখন সত্যিকারভাবে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করার সুযোগ এসেছিল তখন উনি সাড়া দেননি। সাড়া না দিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছেন।

তিনি বলেন, উনার (খালেদা) সঙ্গে বসতে গেলেই পোড়া মানুষের গন্ধ পাব। নির্বাচন বর্জনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যাসহ কী পৈশাচিকতাই না উনি চালিয়েছেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারলেন। উনার ছেলে মারা গেল তখন আমি গেলাম, উনি ঢুকতে দিলেন না। গেট বন্ধ করে দিয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিলেন। এখনকার ঘটনাগুলোও যে তার উৎসাহে হচ্ছে এটা তো স্পষ্ট।

মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কঠোর অবস্থানে ॥ নিজের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে একজন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কথায় আছে- বনের বাঘ খায় না, মনের বাঘ খায়। দেশের উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সবাইকে সাহস রাখতে হবে। খুনের কত তালিকা হয়। ১৯৮১ সালে যেদিন দেশের মাটিতে পা রেখেছিলাম, সেদিন থেকেই সব তালিকার শীর্ষে আমি রয়েছি। তবুও আমি তো ভীত নই। এমনিতেই গভীর চক্রান্ত চলছে এ দেশকে অনিরাপদ প্রমাণ করতে। মানুষের মধ্যে প্যানিক সৃষ্টি করতেই এসব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। তাই নিজেরা সতর্ক-সাহসী না হলে চক্রান্তকারীদের উদ্দেশ্য সফল হবে।

খুনী-হামলাকারী ও নেপথ্যের কুশীলবদের ধরতে সারাদেশে কম্বিং অপারেশন চলছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু নিরাপত্তা দেয়া দরকার, সেটা দেয়া হচ্ছে। যখনই যেখানে যা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এখন কোথাও যদি সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, তবে তাদের ধরতে সাংবাদিকসহ সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

তিনি বলেন, যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলার সাহস থাকতে হবে। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন হতে হবে। কারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে, কারা ইন্ধন দিচ্ছে- তা খুঁজে বের করাসহ জনগণকে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্র নিরাপত্তা দেবে, নিজেরও সতর্ক থাকতে হবে। পুলিশের মানসিক শক্তিকে দুর্বল করতে তাদের ওপরও হামলা করা হচ্ছে। এমন সময় প্রধানমন্ত্রী খুনী-ঘাতকসহ ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে দেশবাসীসহ গণমাধ্যমেরও সহযোগিতা কামনা করেন।

ধর্ম নিয়ে বিকৃত লেখালেখি বন্ধের পরামর্শ ॥ এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ধর্ম নিয়ে বিকৃত রুচির লেখালেখি না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এ ধরনের লেখা যেন লেখা না হয়। আমরা ধর্মনিরপেক্ষ। কিন্তু সেক্যুলারিজম মানে ধর্মহীনতা নয়। তাই কেউ ধর্ম মানবে কী মানবে না, সেটা তার ব্যাপার। কিন্তু অন্যের ধর্মে আঘাত দিতে পারবে না। বিকৃত লেখা মানবিক গুণ নয়। কারও অনুভূতিতে যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখাই মানবিকতা।

জামায়াত নিষিদ্ধ সম্পর্কে অপর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়টি আদালতে প্রক্রিয়াধীন। আদালতের বিষয়। দেশের বিচার বিভাগ স্বাধীন। আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ প্রসঙ্গে দুই শিশু হত্যা মামলার রায় দ্রুত প্রকাশ করায় বিচার বিভাগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করব সব হত্যাকা-সহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াও যেন দ্রুত শেষ হয়। এটা যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই দেশের মঙ্গল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক বিবৃতির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ্যামনেস্টি অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছে। তারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করেছে। আমরা এর কঠোর প্রতিবাদ করেছি, আবারও করব। তিনি বলেন, এ্যামনেস্টির স্মরণ করা উচিত- সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদরা একাত্তরে কী অপরাধ করেছে। দুর্নীতি করে তারা (বিএনপি-জামায়াত) বিপুল অর্থের মালিক হয়েছে। এ্যামনেস্টি নিশ্চয়ই মোটা অঙ্কের কিছু পেয়েছে, এজন্য এসব মন্তব্য করেছে। তবে কে কী বলল তাতে কিছু যায় আসে না। তবে যত দ্রুত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, তত এই উৎপাত বন্ধ হবে।

লেখক-প্রকাশক-ব্লগার হত্যার বিচার প্রসঙ্গে আরেক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লেখক-ব্লগার হত্যাকারীরা ধরা পড়ছে, অনেক মামলার বিচারও শুরু হয়েছে। অন্যগুলোর তদন্ত চলছে। খুনীদের কোন তথ্য দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অবশ্যই সব খুনের বিচার করা হবে, কেউ রেহাই পাবে না।

বিএনপি ও জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে কাউকে না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত থেকে যারা আমার দলে আসতে চায়, তাদের আমরা নেব না। তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, গ্রুপিংয়ে দল ভারি করতে অনেকে ভিন্ন দল থেকে যোগদান করান। তারা (যোগদানকারী) আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করে। আওয়ামী লীগের লোক মারা গেলেই শুধু কোন অসুবিধা নেই। তারা ভাল সেজে দলে ঢুকেই নেতাকর্মীদের হত্যা করে। এসব লোক আমাদের দরকার নেই।

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস সফর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রশংসা করেছেন এবং এ খাতে সহযোগিতার কথা বলেছেন। তিনি বলেন, নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আন্তরিক ও উষ্ণ এবং এ সম্পর্ক আরও গভীর, জোরদার ও বিস্তৃত হবে। ইতোমধ্যে চর উন্নয়ন ও সমুদ্র ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন, সমুদ্র ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা পাবে বলেও জানান শেখ হাসিনা।