২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ

বছরের শুরুতেই সুপরিকল্পিতভাবে মুক্তচিন্তার লেখকদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির অভিপ্রায়ে ধর্মান্ধ উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা তৎপরতা শুরু করেছিল। প্রথম মরণ আঘাত হানার জন্য তারা বেছে নেয় এমন একটি স্থান যেটি দেশের লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের ক্ষেত্রে তীর্থস্থান- একুশের বইমেলা। আলোর পথযাত্রীদের ওই মিলনমেলা থেকে ফিরবার সময়েই মুক্তমনা লেখক অভিজিত রায়ের ওপর নৃশংস হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। হন্তারকরা ভেবেছিল হুমকির মুখে জ্ঞানের মেলা বইমেলা বন্ধ হয়ে যাবে; মুক্তচিন্তক লেখকরা লেখার জগত থেকে নির্বাসিত হবেন। তাদের সেই অভিলাষ কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। একুশের বইমেলা তার নির্ধারিত সময়সীমা সম্পন্ন করেছে। এরপর দেশের নানা জায়গায় এবং ঢাকায় নিয়মিত বিরতি দিয়ে বিভিন্ন বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। লেখকদের লেখায়ও সামান্যতম ছেদ পড়েনি। যদিও জাতি মর্মপীড়া নিয়ে প্রত্যক্ষ করেছে তরুণ লেখকদের খুন করা হয়েছে অভিন্ন নৃশংস কায়দায়। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে তার প্রতিবাদ উঠেছে। খুনীদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি তোলা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে খুনীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে উল্লেখ করার মতো সাফল্য আমরা দেখতে পাইনি। পক্ষান্তরে মুক্তচিন্তাবিনাশী অপশক্তি বসে থাকেনি।

সর্বশেষ তারা হামলা চালায় দুই লেখক-প্রকাশকের কার্যালয়ে। এ দুজনের ভেতর আহমেদুর রশীদ টুটুলকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া সম্ভব হওয়ায় তার প্রাণ রক্ষা পায়। অপর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে বাঁচানো যায়নি। আমরা আগেও বলেছি, এই হামলা সুস্পষ্টভাবে স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপরই বর্বর আক্রমণ। এর ফলে সঙ্গত কারণেই দুটি বিষয় সামনে চলে এসেছে। প্রথমত, মুক্তচিন্তার সপক্ষ শক্তি, সৃষ্টিশীল ও মননশীল লেখকবৃন্দ এবং বুদ্ধিজীবীরা মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে আছেন। অনেক প্রকাশকও হুমকির বাইরে নন। দ্বিতীয়ত, হত্যাকারীরা সংঘবদ্ধ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী একের পর এক হত্যাকা- সংঘটিত করলেও তারা প্রায় সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বলা সমীচীন, এ অবস্থা একটি সমাজের জন্য চরম বিপজ্জনক, যার সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এখানে দুটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া সমীচীন। তরুণ মুক্তচিন্তকরা আজ মৌলবাদ-জঙ্গীবাদের শিকার। সমাজে অনেকের ভেতরেই এদের ব্লগার বলে সম্বোধন করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এরা মূলত অনলাইনে লেখালেখি করেন বলে এমন একটি পরিচিতি দাঁড় করানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এরা প্রত্যেকেই লেখক, সাহিত্যিক, মুক্তচিন্তক। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, এরা সবাই তরুণ বুদ্ধিজীবী, আগামী দিনে চিন্তা-চেতনায়, জ্ঞানে-দর্শনে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তাই তাদের ওপর আক্রমণের বিষয়টি সুদূর পরিকল্পনারই অংশ। দ্বিতীয়ত, আমরা স্মরণ করতে পারি একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে মুক্তচিন্তার মানুষগুলোকে হত্যার মূল অভিপ্রায়কে। আজকে যারা মুক্তচিন্তক ও মুক্তচিন্তার পক্ষের মানুষগুলোকে হত্যা করছে, হত্যার হুমকি দিচ্ছে ,তারা কোনভাবেই মানবতাবাদ, সমাজের সুস্থতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অনুসারী হতে পারে না। বরং আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়Ñ তারা দেশের মানুষের শত্রু, তারা দেশদ্রোহী।

দীপন হত্যাকা-ের পর বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে প্রতিবাদ উচ্চারিত হচ্ছে। এটাও স্বাভাবিক যে দল মতের উর্ধে উঠে প্রগতিশীল সংগঠনসমূহ সকল প্রগতিশীল তরুণ লেখক হত্যার বিচার দাবি করবে। তবে ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চ থেকে না করে একটি অভিন্ন প্লাটফর্ম থেকে সম্মিলিতভাবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললে তা আরও শক্তিশালী ও লক্ষ্যঅভিমুখী হবে। এজন্য মৌলবাদ-জঙ্গীবাদবিরোধী সংগঠনগুলোর ভেতর সমন্বয় প্রয়োজন। লেখক-প্রকাশক-সংস্কৃতিকর্মী ও পেশাজীবীদের ভেতর ঐক্য জরুরী। দেশের প্রতিটি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের আলোয় স্নাত তারুণ্যশক্তির সতর্ক সজাগ থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।