১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যবিত্তের বিস্তার

বাংলাদেশের মধ্যশ্রেণী বা মধ্যবিত্ত বলতে যাদের বোঝায়, তাদের উদ্ভব ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে। এই শ্রেণীটির নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কিছু ছিল না। তারা ছিলÑ ঔপনিবেশিক শাসকদের অধীনস্থ এবং তাদেরই ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল একটি শ্রেণী। এদের উদ্ভব হয়েছিল মধ্যস্বত্বভোগী ভূস্বামী শ্রেণী থেকে। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাঙালী মধ্যবিত্তের চরিত্র উনিশ শতকীয় মধ্যবিত্তের থেকে গুণগতভাবে পৃথক ছিল না। পাকিস্তানকালে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের স্বাধিকার, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্তের রয়েছে একটি বিশাল ভূমিকা। সাংস্কৃতিক আন্দোলনসহ বাঙালীর নানা অর্জন এবং বিকাশের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত সব সময় অগ্রগামী ছিল। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তের প্রাধান্যই ছিল সর্বাধিক। সবকিছুর নেতৃত্বে এগিয়ে আসার শীর্ষে ছিল তারাই। তাদের অবস্থান কখনও দোদুল্যমান, কখনও সুবিধাবাদী হলেও শেষ পর্যন্ত তারাই সংগ্রামে-আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছে। স্বাধীনতার পর মধ্যবিত্ত শ্রেণী ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে বেড়ে উঠলেও তার পক্ষে শ্রেণীগত বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি। গত তিন দশকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা অংশ উচ্চবিত্তে পরিণত হয়ে পড়েছে। সুবিধাবাদ তাদের গ্রাস করায় ওপরে ওঠার সিঁড়ি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার ধারক মধ্যবিত্তদের মধ্যে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে বলে উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী নির্ধারণে সর্বজন স্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই। সাধারণত কারও দৈনিক আয় দুই ডলার থেকে তিন ডলার হলে সে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এ আয় তিন ডলার থেকে চার ডলারের মধ্যে হলে ওই ব্যক্তি উচ্চ মধ্যবিত্তের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ হিসেবে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে যেখানে ৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী মধ্যবিত্ত ছিল। দুই দশক ধরে তা দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত দুই দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশের ৩ কোটি ৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমা পেরিয়ে মধ্যবিত্তের কাতারে উঠে এসেছে। তাই দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটির মধ্যে মধ্যবিত্তের হার বর্তমানে ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটি। এই হার বেড়ে চলেছে অব্যাহতভাবে। ২০৩৩ সালের মধ্যে মোট জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হবে। তার আগে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়াবে ২৫ শতাংশে।

মধ্যবিত্তের আকার বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয় টেকসই। মধ্যবিত্তের আকার যত শক্তিশালী হবে, অর্থনীতি তত মজবুত হবে। এই শ্রেণী এখন আর চাকরিনির্ভর নয়। মধ্যবিত্তের এক-পঞ্চমাংশ এখন পেশায় ব্যবসায়ী। শেখ হাসিনার সরকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থার পরিবর্তন করে ওপরের ধাপে নিতে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছে। তবে মধ্যবিত্তের হার বাড়লেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের হার প্রকটভাবে বেড়েই চলেছে। সরকার মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণ করবে এমনটা প্রত্যাশা তাদেরও। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ মূলত দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। তাই তাদের বিকশিত হবার পথ করতে হবে সুগম।