২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওষুধের বাজার সম্প্রসারণে সব বাধা কাটল

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ রূপকল্প-২১ অনুযায়ী বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর হলেও ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব ছাড় সুবিধা বহাল থাকবে। এই সুবিধার ফলে ওষুধের রফতানি বাজার সম্প্রসারণে আর কোন বাধা থাকল না। একই সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর এবং অভ্যন্তরীণ মার্কেটেও ওষুধের দাম বাড়ার আশঙ্কা কেটে গেল বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এই ঘোষণায়। শুধু তাই নয়, আগামী ১৭ বছর মেধাস্বত্ব ছাড়ের সুবিধা পাওয়ায় গার্মেন্টস শিল্পের পরই এ শিল্প খাতটি রফতানিতে জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনাও।

রবিবার সচিবালয়ে ওষুধশিল্প খাতে মেধাস্বত্বে ছাড় পাওয়ার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেনÑ বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন, সংগঠনটির মহাসচিব ও ইনসেপ্টার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন প্রমুখ।

প্রসঙ্গত, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) স্বল্পোন্নত বা এলডিসি দেশগুলোর জন্য আগামী ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে ছাড় দিয়েছে। এতে বাংলাদেশ আরও ১৭ বছর মেধাস্বত্বের জন্য কোন ব্যয় না করেই ওষুধ তৈরি ও কেনাবেচা করতে পারবে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, গত ৬ নবেম্বর শুক্রবার জেনেভায় ডব্লিউটিও ট্রিপস (ট্রেড রিলেটেড আসপেক্টস অব ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইটস) কাউন্সিলের বৈঠকে অন্তত ২০৩৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওষুধপণ্যের মেধাস্বত্ব কার্যকরের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এই মেয়াদ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ডব্লিউটিওতে এলডিসি দেশের হয়ে কাজ করে আসছিল। এখনও বাংলাদেশ এলডিসি দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই সুবিধা চাওয়ার ড্রাফটিও করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল। সুতরাং এলডিসি দেশগুলোর জন্য তো বটেই, বাংলাদেশের জন্যও এটা বড় ধরনের অর্জন। শুধু তাই নয়, এলডিসি দেশগুলোর অন্তত ৫০টি দেশে কোন ধরনের ওষুধ উৎপাদন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে এখন ১০৭টি দেশে ওষুধ রফতানি করছে। তাই সব এলডিসি দেশের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও বাংলাদেশের জন্য বড় পাওয়া।

তিনি বলেন, এই ছাড়ের ফলে বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি পাবে না। পাশাপাশি রফতানি বাজার বাড়বে। আর ওষুধশিল্পের স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি দেশের চাহিদার ৯৭ শতাংশ পূরণ করছে। আর ৩০টির বেশি কোম্পানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রফতানি করছে। তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষের জন্য ৯৭ শতাংশ ওষুধ তৈরি করছে বাংলাদেশ, এটা কম কথা নয়। বাংলাদেশের এমন উত্থানে অনেকের হিংসাত্মক মনোভাব রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন হোক অনেকে এটা চায় না।

তোফায়েল আহমেদ আরও বলেন, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর ট্রিপসের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অনেকেই ধারণা করেছিলেন পাঁচ বছরের বেশি মেয়াদ বাড়বে না। কিন্তু সরকারসহ সকলের প্রচেষ্টায় নতুন মেয়াদ বেড়েছে। গত ১৯৯৫ সালে ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ট্রিপসের মেয়াদ এত বছর বাড়ানো হয়।

নাজমুল হাসান পাপন বলেন, এটা যুগান্তকারী সুবিধা। আমরা কল্পনা করতে পারিনি যে, এত সময় আমরা পাব। পাঁচ বছর হলেই খুশি হতাম। এখন ১৭ বছর পাওয়া গেল। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যে এ শিল্প খাতটি অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার বিরাট সুযোগ পেল। তিনি বলেন, এলডিসি সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এ সুবিধার প্রয়োজন ছিল। এটা না হলে বর্তমান বাজারে যে ওষুধ চার থেকে পাঁচ টাকায় কিনতে হয় তা ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হতো। আমাদের দেশের গরিব লোকজনের পক্ষে এটা অসম্ভব হতো।

তিনি আরও বলেন, এলডিসি দেশের মধ্যে ৫০টি দেশের ওষুধ বানানোর কোন সক্ষমতা নেই। বাংলাদেশ শুধু ওষুধ বানাচ্ছেই না, বর্তমানে রফতানি শিল্পে সম্ভাবনাময় খাত। সরকার এ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ওষুধ রফতানি করছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ওষুধশিল্প বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানির খাত হিসেবে পরিচিতি পাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, এটা বাংলাদেশের উন্নয়নে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ সুবিধা আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি সকলের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল, যার প্রেক্ষিতে স্বল্পোন্নত দেশের জন্য ট্রিপসের মেয়াদ ১৭ বছর বাড়ানো হয়েছে। আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ওষুধশিল্প খাতে মেধাস্বত্বে ছাড় পাওয়ার সুবিধা যদি না পাওয়া যেত, তাহলে বাংলাদেশের জনগণকে বেশি টাকা ব্যয় করে ওষুধ কিনতে হতো। এটা অনেকের পক্ষে সম্ভব হতো না।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৯ দশমিক ৮২ মার্র্কিন ডলারের ওষুধ রফতানি করেছে বাংলাদেশ। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে করেছে ৬৯ দশমিক ২৪ মার্কিন ডলার। ফলে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭২ দশমিক ৬৪ মার্কিন ডলার রফতানি হয়। প্রতি বছর দেশের চাহিদা মিটিয়ে ওষুধ রফতানি বাড়ছে।