১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মোটরসাইকেল শিল্পে মন্দা

  • ‘অস্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন খরচের কারণে সাধারণ মানুষ মোটরসাইকেল কিনছে না’

কাওসার রহমান ॥ রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল চলাচলে বাধা, অস্বাভাবিক রেজিস্ট্রেশন খরচ, পুঁজিবাজারে মন্দাভাব এবং কৃষকের ধানের মূল্য না পাওয়ার কারণে দেশের মোটরসাইকেল শিল্পে মন্দাভাব বিরাজ করছে বলে মনে করছেন এ শিল্পের উদ্যোক্তারা।

এ প্রসঙ্গে দেশীয় মোটরসাইকেল শিল্প রানার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন বলেন, পুঁজি বাজারের ধস নামায় দেশের মোটরসাইকেলের বাজারেও মন্দা চলছে। তবে চলতি ২০১৫ সালে এই মন্দা অনেকটা কেটে যাবে। এ বছর দেশে দুই লাখ থেকে দুই লাখ ১০ হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি হবে। এর মধ্যে রানারের অংশ থাকবে ২৩ থেকে ২৪ হাজার। আগামী বছর থেকে মোটরসাইকেলের বাজারের সমস্যা কেটে যাবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধানের দাম না পাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ কমে যায়। এতে মোটরসাইকেলের বাজারও পড়ে যায়। এছাড়া গত জুলাই থেকে সরকার ঘোষণা দিয়েছে রেজিস্ট্রেশনবিহীন কোন মোটরসাইকেল রাস্তায় চলতে পারবে না।

এ ঘোষণার কারণেও মোটরসাইকেল বিক্রি থমকে গেছে। কারণ ৭০ শতাংশ ক্রেতা মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করে না। একটি মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করতে ২০ হাজার টাকা লাগে। মানুষ মনে করে এটা বাড়তি টাকা। ফলে ক্রেতাদের একটি বড় অংশ মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন করে না। তাই রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করার কারণে মোটরসাইকেলের কেনাবেচা কমে গেছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে রেজিস্ট্রেশন ফি কমানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, বর্তমানে অফিস কর্মীরা শুধু মোটরসাইকেল কিনছে। সাধারণ মানুষ মোটরসাইকেল কিনছে না। এ কারণেই এ সাইকেলের বাজার পড়ে গেছে। উদ্যোক্তারা জানান, বর্তমানে দেশীয় মোটরসাইকেলের যে বাজার রয়েছে তার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ রানার গ্রুপের। উল্লেখ, দেশে বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল উৎপাদন করছে। রানার গ্রুপের বাইরে অপর দুটি প্রতিষ্ঠান হলো- আরবি গ্রুপ (ওয়ালটন) এবং যমুনা গ্রুপ।

ব্র্যান্ড মোটরসাইকেলগুলোও এদেশে উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাপানী কোম্পানি হোন্ডা এবং ভারতীয় কোম্পানি বাজাজ এদেশে সংযোজনের পরিবর্তে মোটরসাইকেল উৎপাদনের আয়োজন করছে। এই উদ্যোগকে দেশীয় উদ্যোক্তারা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। তারা বলছেন, দেশে ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল তৈরি হলে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। এতে দেশীয় মোটরসাইকেল শিল্পেরই ভাল হবে। এ প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ব্র্যান্ড কোম্পানিগুলো এদেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন করলে দেশে এ শিল্পের যন্ত্রাংশের হাব গড়ে উঠবে। আবার যে সকল কোম্পানি এই যন্ত্রাংশ তৈরি করছে তাদের উৎপাদন বেড়ে যাবে। ফলে খরচ কমে আসবে। হোন্ডা বা বাজাজ নিজেরাও এখানে কিছু যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। ফলে দেশে যন্ত্রাংশ প্রাপ্তি সহজ হবে এবং দামও কম পড়বে। এতে দেশীয় মোটরসাইকেলের উৎপাদন খরচ কমবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে ভয়ের কিছু নেই বলে তিনি মনে করেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে ঠাকুরগাঁওয়ে মোটরসাইকেলের চ্ইেন এবং ফরিদপুরে সিটকভার উৎপাদিত হচ্ছে।

একটি মোটরসাইকেল শিল্পের জন্মকথা ॥ ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে রানার গ্রুপ। পুঁজি বলতে ছিল নিজেদের মেধা আর অভিজ্ঞতা। শুরুটা ছিল আমদানি করা মোটরসাইকেল বিক্রির মাধ্যমে। এ সময় অনেকেই ভারত ও চীন থেকে মোটরসাইকেল আমদানি করত। তবে অনেকেই সুবিধা করতে পারেনি। ফলে তাদের যেসব মোটরসাইকেল অবিক্রীত ছিল, তা রানার কর্তৃপক্ষ কিনে নেয়। বিক্রিতেও বেশ সফলতা পান। এর কারণ ছিল আগে বিদেশী প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এতে তাদের লাভ হয় বেশ। দিন দিন পুঁজিও বাড়তে থাকে।

বছর না ঘুরতেই ২০০১ সালের সেপ্টম্বর-নবেম্বর মাসে নিজেরাই আমদানি শুরু করেন। ওই বছরই প্রায় ৩ হাজার মোটরসাইকেল আমদানি করে রানার। এ সময় মোট বিক্রি দাঁড়ায় ৩৫০৯টি মোটরসাইকেল। তবে এ সময় বাজারে ছিল অনেক বড় বড় প্রতিযোগী। এটলাসের মতো প্রতিষ্ঠান হোন্ডা ও হিরো হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল আমদানি করত। কেউ আমদানি করত বাজাজের মোটরসাইকেল। এরপরও রানারের আমদানির পরিমাণ বাড়তে থাকে। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ মোজাম্মেল হোসেন বলেন, শুরু থেকেই রানারের লক্ষ্য প্রান্তিক মানুষের চাহিদা অনুযায়ী মোটরসাইকেল সরবরাহ করা। তাই প্রতি বছরই তাদের বাজার বাড়তে থাকে। এভাবে কোন বছর তাদের আমদানির প্রবৃদ্ধি হয় ৪০ শতাংশ, কোন বছর প্রবৃদ্ধি হয় ৩০ শতাংশ, আবার কোন ২৫ শতাংশ ছিল। এভাবে গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ২০ শতাংশ।

তবে ২০০৭ সালের ১/১১-এর ধাক্কা লাগে মোটরসাইকেল আমদানিতেও। এ সময় মোটরসাইকেল বিক্রি অনেক কমে যায়। এ বছর মাত্র ২১০০ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। পরের বছর ২০০৮ সালে তা আরও কমে। এ সময় ১৩শ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়। এরপর গণতান্ত্রিক অবস্থা ফিরে এলে ২০১১ সালে দেশে মোটরসাইকেল আমদানি হয় প্রায় ৩৪ হাজার। এ সময় রানারের বিক্রি দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮শ।

এই প্রবৃদ্ধি দেখেই রানারের উদ্যোক্তারা সিদ্ধান্ত নেন দেশে মোটরসাইকেল কারখানা করার। ফলে আমদানির পাশাপাশি দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদনের কার্যক্রম চলতে থাকে।

২০১১ সালে ময়মনসিংহের ভালুকায় ৩৫ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা রানার অটোমোবাইলস কারখানা উদ্বোধন করা হয়। ফলে রানার গ্রুপ বিআরটিএর কাছ থেকে মোটরসাইকেল শিল্পের স্বীকৃতি লাভ করে। কারখানার প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা ৫০০ মোটরসাইকেল। এ কারখানায় ৫০ থেকে ১৫০ সিসি পর্যন্ত চার সিরিজের ১২টি মডেলের মোটরসাইকেল উৎপাদিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হোসেন বলেন, আমরা প্রতিটি মোটরসাইকেল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পর কম্পিউটারের মাধ্যমে মান পরীক্ষা করে বাজারজাত করছি। ফলে বাজারে দ্রুত চাহিদা বাড়ছে রানারের মোটরসাইকেলের। এ ব্যাপারে সরকারও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে বলে তিনি জানান।

আফ্রিকায় মোটরসাইকেল রফতানি করবে রানার ॥ দেশে উৎপাদনের পাশাপাশি বিদেশে মোটরসাইকেল রফতানিরও উদ্যোগ নিয়েছে রানার গ্রুপ। আগামী বছর থেকে আফ্রিকায় রানারের মোটরসাইকেল রফতানি শুরু হবে। এছাড়া সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতেও রানার গ্রুপ মোটরসাইকেল রফতানি শুরু করবে বলে জানান উদ্যোক্তারা।

এ প্রসঙ্গে রানার গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বিশ্বের ভারত এবং চীন হচ্ছে মোটরসাইকেলের বড় উৎপাদক। সে তালিকায় আমরাও স্থান করে নিচ্ছি। এই দুই দেশ ১৫০ সিসি মোটরসাইকেল রফতানি করে। তবে আমরা ৮০ সিসি মোটরসাইকেল রফতানিতে জোর দেব। কারণ ৮০ সিসি মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে আমরাই হচ্ছি ‘মার্কেট লিডার’।

তিনি বলেন, আমরা আফ্রিকা, ভারত ও নেপালে মোটরসাইকেল রফতানির লক্ষ্যে কাজ করছি। আশা করছি, আগামী বছর থেকে আফ্রিকায় রফতানি শুরু করতে পারব। তবে ভারতে রফতানি শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগবে। ভারতে আমরা মূল লক্ষ্য হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বাজার। সেখানে আমাদের মোটরসাইকেলের একটি বড় বাজার হতে পারে। তবে সমস্যা হচ্ছে ভারত যত সহজে আমাদের বাজারে মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকতে পারছে, আমরা তত সহজে ভারতের বাজারে ঢুকতে পারছি না। আমাদের নানা অশুল্ক বাধা পেরোতে হচ্ছে। তাদের সব শর্ত পূরণ করতে দুই বছর লেগে যাবে। দুই বছর পর আমরা ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে মোটরসাইকেল রফতানি করতে পারব বলে আশা করছি। সেখানে বর্তমানে বছরে তিন লাখ মোটরসাইকেলের চাহিদা। এর ১০ শতাংশ বাজার ধরতে পারলেও তিন হাজার মোটরসাইকেল বিক্রি করা সম্ভব।

মোটরসাইকেলের চাহিদা প্রসঙ্গে মোজাম্মেল হোসেন বলেন, বাজার থাকলেও বাইকের চাহিদা সৃষ্টি হয়। ভারতে এক কোটি ১০ লাখ মোটরসাইকেল লাগে বছরে। চীনে প্রয়োজন হয় এক কোটি ১৫ লাখ। আর পাকিস্তানের বার্ষিক চাহিদা ১০ লাখ। সে তুলনায় ১৬ কোটি জনগণের দেশে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা এখনও খুব কম। মাত্র জনসংখ্যার ১ শতাংশ। এ চাহিদা সাত গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। আগামী পাঁচ বছরে দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা ১০ থেকে ১২ লাখে চলে যবে। এটা বিবেচনায় নিয়েই আমরা দেশে মোটরসাইকেল শিল্প গড়ে তুলেছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মোটরসাইকেল শিল্পের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে এ বাজারের বড় অংশই দখল করে আছে ভারতের বাজাজ কোম্পানি। আমাদের মার্কেট শেয়ার ২৩ শতাংশ। এই শেয়ার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ শতাংশে উন্নীত হবে।