১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দেখা হয় ইজারাদারের স্বার্থ

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ দেশের উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে সংগৃহীত ১৪টি সী-ট্রাকের ১০টিই এখন বন্ধ। এমনকি বরিশালের সঙ্গে লক্ষ্মীপুরের নিরপদ নৌ-যোগাযোগের সরকারী একমাত্র সী-ট্রাকটিও গত ১৬ অক্টোবর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে ইজারাদার।

অভিযোগ রয়েছে, এ কারসাজির সঙ্গে বিআইডব্লিউটিসির কারিগরি ও বাণিজ্য পরিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোগসাজস রয়েছে। অথচ গত কয়েক মাস পূর্বে এ সীÑট্রাকের ইজারাদার বরিশাল-লক্ষ্মীপুর রুটে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের অনুমোদিত নক্সায় বিআইডব্লিউটির সময়সূচী অনুযায়ী চলাচলকারী বেসরকারী নিরাপদ নৌযানের চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে উচ্চ আদালতে চারটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিল। তবে শেষপর্যন্ত বেসরকারী ওই নৌ-যানটি চলাচলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান জানান, বেশিরভাগ সী-ট্রাক বন্ধ থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি এ ধরনের আরও কয়েকটি নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিআইডব্লিউটিসির তত্ত্বাবধানে ত্রাণ তৎপরতায় ব্যবহৃত ‘এসটি গিতালী’ ও ‘এসটি রূপালী’ নামের দুটি সী-ট্রাকের পাশাপাশি উপকূলীয় রুটে নিরাপদ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০১ সালে সরকার প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে তৈরি ৪টি সী-ট্রাক বিআইডব্লিউটিসিকে হস্তান্তর করে। চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ২০০২ সালে আরও চারটি এবং ২০০৯ সালে দেশে তৈরি ৪টি সী-ট্রাক নির্মাণ করে সংস্থাটিকে হস্তান্তর করা হয়। সূত্রে আরও জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে সরকার দেশের উপকূলীয় নৌ-যোগোযোগকে ‘গণ দায়বদ্ধ সেবাখাত’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এ লক্ষ্যে আরও ২টি পুরনো উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযান পুনর্বাসনে সরকার সংস্থাটিকে ২০ কোটি টাকা প্রদান করেন। পাশাপাশি বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটের জন্য ২০০২ সালে চীনা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় ‘এমভি বার আউলীয়া’ নামের আরও একটি নৌযান সংগ্রহ করা হয়। উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে সরকার প্রতিবছর সংস্থাটিকে নগদ ভর্তুকিও প্রদান করে আসছে। ২০০৯ সালে দুটি নৌযান পুনর্বাসনের পর দেশের দীর্ঘতম উপকূলীয় বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে যাত্রী পরিবহন অব্যাহত রাখতে পারেনি সংস্থাটি। এমনকি ২০০২ সালে সংগৃহীত ‘এমভি বার আউলীয়া’ নৌযানটি গতবছর প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে পুনর্বাসন থেকে মেরামতের পর উদ্বোধন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী ‘বরিশাল-চট্টগ্রাম রুটে পুনরায় উপকূলীয় যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল শুরু করা হবে বলে ঘোষণা দিলেও গত একবছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বরিশাল-চট্টগ্রাম উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনে সরকার আরও দু’টি নতুন নৌযান সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে। আগামী দু’বছরের মধ্যে এসব নৌযান সংস্থার বহরে যুক্ত হলে বরিশাল-চট্টগ্রাম নৌপথে পুনরায় যাত্রী পরিবহন শুরু করা হবে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব আশার বাণীর মধ্যেও দেশের উপকূলীয় নৌপথে রাষ্ট্রীয় জাহাজ চলাচল প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসির নিরাপদ সী-ট্রাকগুলোর চলাচল এখন আর নির্বিঘœ নেই। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সংস্থাটির ১৪টি সী-ট্রাকের মধ্যে ১০টিই বন্ধ। সংস্থার বহরে ‘এসটি-মিতালী’ সী-ট্রাকটি ২০০৩ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাঘাটে পড়ে আছে। ‘এসটি রূপালী’ ২০১৩ সালের শেষভাগ থেকে সংস্থার ১ নম্বর ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। অথচ এ নৌযানটি সন্দ্বীপে উপকূলীয় জাহাজ থেকে যাত্রী ও পণ্য খালাসে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘এসটি শেখ জামাল’ সী-ট্রাকটি গত ৪ জানুয়ারি থেকে বিকলাবস্থায় সংস্থার ১ নম্বর ডকইয়ার্ডে পড়ে আছে। ‘এসটি-শেখ রাসেল’ ২০১২-এর ১৫ নবেম্বর থেকে সংস্থার ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে। ‘এসটি-সুকান্ত বাবু’ একবছর থেকে সংস্থার নারায়ণগঞ্জ পতেঙ্গায় পড়ে রয়েছে। ‘এসটি ভাষা শহিদ সালাম’ গত মধ্য এপ্রিল থেকে ১ নম্বর ডকইয়ার্ডে, ‘এসটি- ভাষা শহিদ জব্বার’ ১৪ অক্টোবর থেকে চট্টগ্রামে রয়েছে। তবে এ সী-ট্রাকটি কুমিড়া-গুপ্তছড়া রুটে যাত্রী পরিবহনে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চীন থেকে সংগৃহীত ‘এসটি খিজির-৫ প্রায় দেড় বছর ধরে বরিশালে অচলবস্থায় এবং একই সিরিজের ‘এসটি খিজির-৬’ ২০১২ সালের শেষভাগ থেকে সংস্থার ২ নম্বর ডকইয়ার্ডে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। ‘এসটি খিজির-৭’ নামের সী-ট্রাকটি ইজারাদার এখনও ভোলার ইলিশা থেকে লক্ষ্মীপুর রুটে যাত্রী পরিবহন করছে। ‘এসটি খিজির-৮’ নানা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে ইজারাদার ১৬ অক্টোবর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। মূলত লাভের মৌসুমে (১৫ মার্চ থেকে) এসব সী-ট্রাক সচল হয়। আর কম লাভের সময় (১৫ অক্টোবরের পর) তা বন্ধ করে দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, প্রতিবছর এ নৌযানটি ১৫ মার্চ থেকে উপকূলীয় নৌপথে ঝড়ঝঞ্ঝা মৌসুম শুরু হলে সংস্থাটির বাণিজ্য ও কারিগরি পরিদফতরের সহযোগিতায় সচল করে বরিশাল-লক্ষ্মীপুর রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। আর ১৫ অক্টোবরের পরে শান্ত মৌসুম এলেই রহস্যজনক কারণে তা আবার বিকল হয়ে যায়। গত ২২ জুলাই ‘মার্কেন্টাইল মেরিন ডিপার্টমেন্ট’ থেকে ‘এসটি খিজির-৮’এর পরিচালনার বিষয়ে ১০ দফা পর্যবেক্ষণ প্রদান করে তিন মাসের মধ্যে তা নিরসনের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণের সময়সীমার মধ্যে সংস্থার বাণিজ্য ও কারিগরি পরিদফতরে বিষয়টি নিয়ে কোন মাথাব্যথাই ছিল না। ইজারাদারের স্বার্থেই নৌযানটি মেরামত ও ত্রুটিসমূহ দূর না করে ১৬ অক্টোবর থেকে নৌযানটি পরিচালনা বন্ধ করে দেয়া হয়। বরিশাল-লক্ষ্মীপুর রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীরা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু শান্ত মৌসুমে এসব উপকূলীয় নৌপথে বেসরকারী মাঝারি ধরনের নৌযানসমূহ চলাচল শুরু হলে ইজারাদারগণ সরকারী সী-ট্রাকের চলাচল বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসির শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল মহল অবগত থাকলেও আজ পর্যন্ত এর কোন সুরাহা হয়নি। এমনকি ‘উপকূলীয় নৌপথে যাত্রী পরিবহনে লোকসানের বিষয়টি ধরে নিয়ে সরকার থেকে ভর্তুকি প্রদান করা হলেও ইজারাদার, বিআইডব্লিউটিসির কারিগরি ও বাণিজ্য পরিদফতরের কতিপয় কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যোগসাজসে এ সমস্যার কোন সমাধান হচ্ছে না। বরং নৌযানগুলোর ক্ষতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। এ ব্যাপারে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টির খোঁজ-খবর নিয়ে যাত্রীদের সুবিধার্থে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।