২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ এমন কঠিন সময় বহুকাল দেখা যায়নি

  • অজয় দাশগুপ্ত

মানুষের জীবন নিয়ে এমন কা- এমন ধরনের জঘন্য নির্মমতা দেখা যায়নি কোনকালে। দেশ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকি আমরা। ইমেডিয়েট বা একক পরিবার বলতে যা বোঝায়, যাদের বোঝায় তাদের সঙ্গে থাকি। তাদের নিয়ে বসবাস করি। ফলে আতঙ্ক বা আশঙ্কার কারণ থাকার কথা নয়। দেশের এক শ্রেণীর মানুষ সেটা ভেবে নিয়ে প্রবাসীদের গালমন্দ করতেও ছাড়েন না। তাদের ধারণা প্রবাসীদের আবেগ উচ্ছ্বাস বা শোকার্ত হবার ঘটনাগুলো ‘মার চেয়ে মাসির দরদ’ বেশির মতো শোনায়। হলে হতেও পারে। কিন্তু ব্যক্তি জীবনের একটি উদাহরণ দেই : আমাদের পরিবারের মেজদি যখন একমাত্র প্রবাসী তখনকার আমলে কম্পিউটার, মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার ছিল না। ফোনে মার্কিন মুলুকে লাইন পাওয়া? হাতে চাঁদ পাবার মতো ঘটনা। বাকি আমরা সবাই দেশে মাকে দেখতাম প্রায়শই মন খারাপ আর কথায় কথায় মেজদির গল্প, সবাই মিলে একদিন ছেঁকে ধরে জানতে চেয়েছিলাম কেন এই পক্ষপাত? এটা কি বাড়াবাড়ি না? মা হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘ও তোরা বুঝবি না। যে সন্তান কাছে থাকে না। তার জন্য মার দরদ ও উদ্বিগ্নতা কত বেশি।’ দেশের যে সব ভাই-বোন আত্মীয় বন্ধুরা আমাদের পর ভাবেন তাদের বলি দেশ মা যে অন্তর থেকে তার পরবাসী সন্তানের জন্য আকুল। অদর্শন আর দূরগামী ভালবাসার এই টানই হয়ত আমাদের ব্যাকুল করে তোলে, কথায় বলে জননী ও জন্মভূমি হচ্ছে নাড়ির টানে বাঁধা।

বলছিলাম দেশের কথা। সিডনির সন্ধ্যায় হাজার হাজার বাঙালীর সাপ্তাহিক ছুটির দিনটি মাটি করে দিয়েছিল সে দুঃসংবাদ। প্রথমটার তিনজন আহত হবার খবরের পর পরই দীপনের অপমৃত্যু। দেশের সীমানা পেরিয়ে সে রক্তস্রোত কতটা তীব্রভাবে আমাদের মনে আঘাত হানে দেশে থাকতে থাকতে ঘটনা অপঘটনায় অভ্যস্ত মানুষজন হয়ত তা ধারণাও করতে পারেন না। একটা বিষয় তো মানতেই হবে আমরা যে সব দেশে বসবাস করি সেগুলোর জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই। দু-একটা দুর্ঘটনা কালেভদ্রে খুনোখুনি যে হয় না তা তো নয় কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ঘটে না। বিস্ময়ের সঙ্গে দেখি তারপরও তুলনার অপচেষ্টা চলছে। কেনা জানে আমেরিকার গায়ে এখন তার নিজের আঁচড় দাগ কটেছে। কিন্তু সব দেশ তো আর আমেরিকা নয়। টুইন টাওয়ার বা স্কুল স্যুটিংও এক বিষয় নয়। টুইন টাওয়ারের প্রসঙ্গ টেনে যারা দেশের অরাজকতাকে জায়েজ করতে চায় তারা মতলববাজ। একটা বিষয় মানতে হবে পরিবর্তিত এই মানসিকতাই আজ দেশের প্রধান শত্রু। বহুজাতিক ও আন্তর্জাতিক প্রগতির দুশমনরা আমার ধর্মাবলম্বী হলেই গলার সুর মিনমিনে হতে হবে কোন দুঃখে? ব্যক্তিজীবনে আমি হিন্দু, তাই বলে শ্রীলঙ্কার কোন তামিল জঙ্গী আমার চেতনা ও মন স্পর্শ করতে পারেনি। তামিল টাইগারদের জঙ্গীপনাকে চিরকাল সমানভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছি। বিদেশের কোথাও মুসলমানদের ওপর অনাচার বা যে কোন জাতিগোষ্ঠীর ওপর অন্যায়কে একইভাবে সমালোচনা করেছি। দেশে এখন এমনও ভ- বুদ্ধিজীবী আছেন কাফনের কাপড় পরে সভা-সমিতি আর টকশোতে ঘুরে বেড়ান। বড়াই করে বলেন মধ্যপ্রাচ্যের দুর্দশাজনিত কারণে এই বেশভূষা, ভাল কিন্তু জনাব আপনি কি শ্রীলঙ্কার গণহত্যার বিরুদ্ধে কোনদিন কিছু বলেছেন? আফ্রিকার জাতিগত দাঙ্গা বা নেপালে ভারতীয় আগ্রাসনের বেলায় আপনার বুক কেঁপেছে কোনদিন? তাহলে আপনার আচরণে মানবিকতা কোথায়? এতো আরেক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, ধীরে ধীরে বুদ্ধিবৃত্তিকে গ্রাস করে নেয়া এই অপইচ্ছা এখন খুনীদের বেলায়ও আমাদের স্বর ও ভূমিকা ম্লান করে দিচ্ছে। একদল বুদ্ধিজীবী গোঁ-ধরা আরেক দল পোঁ-ধরা। এদের দ্বারা দেশের প্রগতি বা অগ্রযাত্রা অসম্ভব। যারা জাতির ভুল ধরিয়ে দেবেন বা ভ্রান্তিমোচন করবেন তারাই আজ বিভ্রান্ত। দীপনের বাবা ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে তৃতীয়মাত্রায় অতিথি হবার সুযোগ হয়েছিল আমার। তাঁর মতাদর্শ যাই হোক এখন তিনি পুত্রহারা। এই শোকসন্তপ্ত পিতাকে নিয়েও রাজনীতি হচ্ছে, অন্তত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার পর তাহলে আপত্তি ছিল না। কিন্তু এই যে কূটতর্ক আর বিবাদ এর ফাঁকেই টুপ করে পার পেয়ে যাবে ঘাতক।

এভাবে চলতে দেয়া যায় কি? আবারও বলছি এক শ্রেণীর মানুষ প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিপক্ষে সোচ্চার। মূলত: ঈর্ষা আর দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্যে এরা তা করে থাকেন কিন্তু ভুলে যান বাংলা মায়ের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি আর কল্যাণে এদের কষ্টার্জিত অর্থের অবদান কতটা। এদের গাত্রদাহের আর একটা বড় কারণ বিদেশে গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক সমাজে বসবাসরত প্রবাসীদের উজ্জ্বল অথবা খোলা চিন্তা ও সৃজনের হাতিয়ার। যখন দেশের লেখক শিল্পী বুদ্ধিবৃত্তি ও সাধারণ মানুষ চাপাতির তলায় ভীত অসহায় তখন এরা নির্বিঘেœ কথা বলতে পারেন বলেই হয়ত এই ক্ষুব্ধতা। যেভাবেই হোক দেশ ও দেশের বাইরের বাঙালীর মনে এক চিন্তা, এক ভাবনা, একই হতাশা, আশার আলোও এক। ফলে আমরা নিশ্চুপ থাকতে পারি না। এটা বুঝি সরকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানোর মরিয়া চেষ্টায় আঘাত হানছে জামায়াতীরা সঙ্গে আছে বিএনপি ও অন্যান্য অপশক্তির ইন্ধন। তারপরও আমরা বলছি ‘দুর্বৃত্ত’ এও এক হিপোক্রেসী বৈকি। এমন কঠিন সময় বহুকাল দেখা যায়নি। সত্যি বলতে কি এক পাশে বদলে যাওয়া ধোলাই খাওয়া পথভ্রষ্ট মগজের বাঙালী অন্যদিকে অসহায় মুক্তবুদ্ধি। রাষ্ট্র যদি এর বিহিত করতে না পারে, সরকার যদি সমাধান করতে ব্যর্থ হয় হয়ত দেশ বাঁচবে কিন্তু চাপাতি আক্রান্ত অবয়বে তাকে আর পরিচিত বা চেনা কিছু মনে হবে না। আমরা যদি তা না চাই কঠোরতার বিকল্প নেই। কবে তার প্রমাণ দেখব?

dasguptaajoy@hotmail.com