১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

(৯ নবেম্বরের পর)

সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজে

১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আমাদের প্রবেশিকা পরীক্ষা শুরু হয়। সুতরাং বলা যায় যে, ১৯৪৯ সাল শুরুই হয় লেখাপড়ার বছর হিসেবে এবং তখনই আমাদের জীবন প্রবাহের ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়। তাই বলা যেতে পারে ১৯৪৯ সালের শুরুতেই ছেলেবেলার অবসান ঘটে। প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি মন্দ ছিল না কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার স্পৃহাটি ছিল স্তিমিত। সারা প্রদেশে প্রায় ৫০ হাজার পরীক্ষার্থী ছিলাম। নিজের বিদ্যালয়ের অথবা শহরের আরও কিছু ছাত্রছাত্রী ছাড়া আর কোন প্রতিযোগীর খবর ছিল না। বহু বছর পর শিক্ষা বোর্ডের বকশীবাজারের দফতর থেকে জানলাম যে, সিলেট মহকুমায় (বর্তমান জেলায়) আমরা মোট পরীক্ষার্থী ছিলাম ৭৫৯ জন, যাদের মধ্যে আমাদের স্কুল থেকে ছিলাম ৮৮ জন। আমরা ৬৪ জন পাস করি (৭২%)। অবশ্য সারা প্রদেশে পাসের হার ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। আমিই এই মহকুমায় সবচেয়ে ভাল করি। এই প্রথমবার আমি কোন একটি পরীক্ষা স্বল্প বলয়ে হলেও প্রথম স্থান দখল করি। আমাদের প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল জুলাই মাসে ঘোষণা করা হয় এবং সেই মাসেই আমি মুরারীচাঁদ কলেজে ভর্তি হই। যেদিন কলেজে ভর্তি শুরু হয় সেদিনই প্রস্তুত হয়ে প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা নিয়ে কলেজে গেলাম। আমাদের ভর্তির দায়িত্বে ছিলেন অংকের প্রখ্যাত অধ্যাপক সোলেমান চৌধুরী (পরবর্তীকালে ঢাকা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ এবং মুরারীচাঁদ কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন)। তার সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পরিচয় ছিল। তার শ্বশুরবাড়িতে আমরা প্রায়ই যেতাম। আমি কলা বিভাগে ভর্তি হতে চাইলাম; কিন্তু অধ্যাপক সোলেমান চৌধুরী তাতে আপত্তি করলেন। তার যুক্তি ছিল যে, আমি অঙ্কে ভাল এবং আমার মোটামুটি ফল বেশ উন্নতমানের। সুতরাং আমার পক্ষে বিজ্ঞান শিক্ষাই ছিল যথাযথ। তিনি ঠিক করলেন যে, বিষয়টি নিয়ে আমার আব্বার সঙ্গে ফয়সালা করে অতঃপর আমাকে ভর্তি করবেন। আমি চেয়েছিলাম যে, ভর্তির তালিকায় আমার নামটি হবে প্রথম। সুতরাং খুবই অসন্তুষ্ট হয়ে কলেজ থেকে বিদায় নিলাম। অধ্যাপক সাহেব সেদিনই রাতে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হলেন এবং আব্বার সঙ্গে আমার ভর্তির ব্যাপারে আলোচনা করলেন। তিনি ফিরে যাবার সময় আমাকে ডাকলেন এবং বললেন যে, পরবর্তী দিনে আমি যেন ভর্তি হই। পরবর্তী দিনে যখন ভর্তি হতে গেলাম তখন আমার কোন অসুবিধা হলো না। আমি সেদিনই যথাযথ ফিস দিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন দেখা গেল যে, আমার আগে আর কোন ছাত্রই কলা বিভাগে ভর্তি হয়নি। তাই আমার রোল নম্বর হলো ২০১। (প্রথম ২০০ আসন ছিল বিজ্ঞান বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট)।

কলেজে প্রবেশ করার শুরুতেই একটি সমস্যা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। সে সময় কলেজের কতিপয় শিক্ষক এবং অত্যন্ত নির্দিষ্টসংখ্যক কিছু ছাত্র কলেজের নাম পরিবর্তনের একটি উদ্যোগ নেন। তারা হিন্দু মুরারীচাঁদের নামে কলেজের পরিচিতিটি গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। এই উদ্যোগের বিপরীতে ছিলেন কিন্তু বিপুলসংখ্যক শিক্ষক এবং অভিভাবক। এই গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নেন আরবীর অধ্যাপক মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক। আমার আব্বা তখন কলেজ পরিচালনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং তিনিও এই হীন উদ্দেশ্যের বিরোধিতা করেন। আমরা কিছু মুসলমান ছাত্র এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করি। তাতে কতিপয় শিক্ষকের আমরা বিরাগভাজন হই। কিন্তু তাদের উদ্যোগটি একেবারেই ব্যর্থ হয়।

কলেজের ছাত্র হিসেবে আমার একটি বিপদ হলো যে, প্রতি সপ্তাহে আমার একটি ইংরেজী ও একটি অঙ্ক ক্লাস ছিল একই সময়ে। অধ্যাপক সোলেমান চৌধুরী বললেন যে, আমি যখন অঙ্ক নিয়েছি এবং ঐ ক্লাসটি তিনিই নেবেন সুতরাং আমাকে যে করেই হোক অঙ্কের ক্লাসটি করতে হবে। ইংরেজী ক্লাসের অধ্যাপক ছিলেন অধ্যাপক আবু সাইদ আহমদ। তার কাছে গিয়ে আমি আমার সমস্যাটি তুলে ধরলাম। তিনি আমাকে বেশ ভাল চিনতেন এবং হেসে বললেন যে, তুমি ইংরেজীর জন্য মাঝে মাঝে এসে আমার সঙ্গে কথা বললেই হবে। আহমদ সাহেব আসলে খুবই ছাত্রবান্ধব ছিলেন। আমার চাকরি জীবনে তাকে আমি খুলনার দৌলতপুর কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে পাই এবং সে সময় আমি যখনই খুলনা যেতাম তার সঙ্গে কিছু আনন্দঘন সময় কাটাতাম। তিনি তখনও খুলনাতে খুব জনপ্রিয় প্রিন্সিপাল ছিলেন।

ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরেই কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচন সামনে আসল। আমি সেখানে ইংরেজী সাব-এডিটর পদের জন্য প্রার্থী হলাম। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তওফিক সিরাজ চৌধুরী। নির্বাচনে আমি ৬ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হলাম। দ্বিতীয় বর্ষে আমি আবার চিফ এডিটর পদের জন্য প্রার্থী হলাম। তখন ছাত্রমহলে আমাদের যারা নেতৃত্ব দিতেন তারা চাইলেন যে, আমরা যারা প্রগতিশীল বলে পরিচিত ছিলাম তারা যেন একটি জোট গঠন করে সর্বসম্মত প্যানেল ঠিক করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। আমি সেই সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করলাম না এবং বললাম যে, এখানে জোট করা যথাযথ হবে না। চলবে...