২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দৃষ্টিনন্দন লাল শাপলা হারিয়ে যাচ্ছে, আছে শুধু কচুরিপানা

দৃষ্টিনন্দন লাল শাপলা হারিয়ে যাচ্ছে, আছে শুধু কচুরিপানা
  • হুমকির মুখে জাবির লেক

দীপঙ্কর দাস ॥ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগরের সৌন্দর্যের প্রতীক লাল শাপলা শোভিত লেকগুলো। আর শীতের সময় লাল শাপলার সঙ্গে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসা অতিথি পাখিদের বিচরণে এই সৌন্দর্য যেন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এই সৌন্দর্যের আহ্বানে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে সৌন্দর্যপ্রেমীরা ছুটে আসেন জাহাঙ্গীরনগরে। কিন্তু প্রশাসনের উদাসীনতা, অযতœ, অবহেলায় এই সৌন্দর্য এখন বিনষ্টের পথে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা আর সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে লাল শাপলা শোভিত লেকগুলো। লাল শাপলার পরিবর্তে লেকগুলো এখন কচুরিপানা, শেওলা আর জলজ উদ্ভিদে পরিপূর্ণ। সৌন্দর্যের বিপরীতে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে অতিথি পাখিদের বিচরণক্ষেত্র জলাশয়গুলো।

সরেজমিন দেখা গেছে, জাবির মেডিক্যাল সংলগ্ন আনন্দদীঘি, আল-বেরুণী হলের পার্শ্ববর্তী লেক, পুরাতন কলা ভবন সংলগ্ন লেক, জিমনেশিয়ামের পার্শ্ববর্তী লেক, মীর মোশাররফ হোসেন হলের পার্শ্ববর্তী লেক, বিশমাইল এলাকার লেক, অডিটরিয়ামের সামনের দুটি লেক, রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেক, ট্রান্সপোর্টের পাশের লেক প্রভৃতি লেকগুলোতে ঘাস, শেওলা আর কচুরিপানার আধিপত্য। এর ফলে লেকের মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। এদিকে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশের লেকগুলো সংস্কার করা হয় না প্রায় দু’বছর ধরে। যতেœর অভাবে লেকগুলো ঘাস আর আগাছায় পূর্ণ রয়েছে। এই লেক এখন মাছের বদলে গরুর চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। কয়েকটি লেক খননের প্রয়োজন থাকলেও সে বিষয়ে প্রশাসনের কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই।

অন্যান্য বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেকসহ বিভিন্ন লেকে অতিথি পাখির অবাধ বিচরণের জন্য কৃত্রিমভাবে শাপলা লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর এসব লেকের বেহাল অবস্থা। শেওলা আর জলজ আগাছায় ছেয়ে গেছে লেক। লেকে লাল শাপলার দেখা মেলা ভার। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে অতিথি পাখিতে ক্যাম্পাসের লেকগুলো মুখরিত থাকলেও এ বছর লেকের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে অতিথি পাখি দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছর শীতের সময়টায় অতিথি পাখি দেখতে হাজারও পাখিপ্রেমী ভিড় করেন জাহাঙ্গীরনগরে। তবে এ বছর এখনও পাখি না আসায় অনেকেই হতাশ। পাখি না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জাবির সাবেক শিক্ষার্থী জয়ন্ত সরকার বলেন, অন্যান্য বছর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসের মধ্যেই সবাই মিলে অতিথি পাখি দেখতে আসি। কিন্তু এ বছর নবেম্বরেও পাখির দেখা মিলছে না। লেকগুলোতে পাখিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে প্রশাসনের মনযোগী হওয়া উচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা ও সংস্কারের দায়িত্ব এস্টেট অফিসের ওপর ন্যস্ত। এ বিষয়ে এস্টেট অফিস সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৭টি লেকের মধ্যে কয়েকটি লেক ইজারা দেয়া। ইজারাদারদের সঙ্গে কথা না বলে লেক সংস্কার করা যাচ্ছে না। পাখিদের জন্য বিশেষায়িত ৩টি লেকসহ অন্যান্য লেকগুলো ইজারামুক্ত থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ও টাকার অভাবে সংস্কার করা হচ্ছে না।

লেকগুলোর বেহাল অবস্থা ও পাখি বিলম্বে আসার বিষয়ে জাবির প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পাখি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা ফিরোজ জানান, সাধারণত অক্টোবর মাসের মধ্যেই ক্যাম্পাসের লেকগুলোতে অতিথি পাখির বিচরণ দেখা যায়। তবে এবছরের গরম আবহাওয়া পাখি দেরিতে আসার একটি কারণ। অন্যদিকে এস্টেট অফিসের সমন্বয়হীনতার কারণে লেকগুলো এখনও সংস্কার করা হয়নি। প্রতিবছর এ সময়টায় অনেক শাপলা দেখা গেলেও এবছর লেকে শাপলা অনেক কম। পাখি দেরিতে আসার ক্ষেত্রে লেকের পরিবেশকেও অনেকাংশে দায়ী করেন তিনি। এস্টেট অফিসের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে তিনি বলেন, এস্টেট অফিস লেক সংস্কারের দায়িত্বে থাকলেও গাছ কাটা ছাড়া তাদের কোন কর্মকা- দেখা যায় না। পাশাপাশি এস্টেট অফিসের জলাশয় বিষয়ক কমিটিতে পাখি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাউকে রাখা হয় না। ফলে জলাশয়গুলো সুষ্ঠুভাবে সংস্কার হয় না।

এ বিষয়ে দর্শন বিভাগের শিক্ষক রায়হান রাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে প্রশাসনের সক্রিয় তৎপরতা নেই। ক্যাম্পাসের প্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপারে প্রশাসনের চরম অবহেলা রয়েছে, যার কারণে অক্টোবর মাস চলে যাওয়ার পরও অতিথি পাখির দেখা মেলেনি। পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের মনোযোগের অভাব রয়েছে। প্রশাসনের এমন অবহেলার কারণে ক্যাম্পাসের পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লেক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অমনযোগিতাকে দায়ী করে জাবির ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু রায়হান বলেন, ক্যাম্পাসের পরিবেশ ঠিক রাখার ক্ষেত্রে প্রশাসনের অমনযোগিতার কারণেই লেকগুলোর বেহাল দশা। কর্তৃপক্ষের অবহেলা না থাকলে লেকে লাল শাপলায় শোভিত থাকার পরিবর্তে কচুরিপানা থাকত না।

এ বিষয়ে রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক বলেন, যে লেকগুলোতে পাখি বসে সে লেকগুলো পরিষ্কার করা হবে না। যে লেকগুলোতে কচুরিপানা রয়েছে সেই লেকগুলোতে পাখি বসে না। এই লেকগুলো পরিষ্কার করা হবে।