১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আজ শ্যামাপূজা ও দীপাবলী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আজ মঙ্গলবার হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী শ্যামাপূজা (কালীপূজা) ও দীপাবলী। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, শ্যামা দেবী হলো শান্তি, সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় সংগ্রামের প্রতীক। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভক্তের জীবনে অবারিত কল্যাণের অঙ্গীকার নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আগমন ঘটে দেবী শ্যামার। আজ জননীরূপে বাঙালীর জীবনে আবির্ভাব ঘটবে মহাশক্তি ত্রিনয়নী মা শ্যামার।

হিন্দু শাস্ত্র মতে, দুর্গা-চ-ী-কালী একই সত্তায় মহাশক্তির রূপ। ‘দেবঃ তেজঃ সম্ভবা’ রূপে তিনিই কালী কাত্যায়নী, চ-ীরূপে তিনি বধ করেন চ--মু- অসুরদ্বয়কে। দুর্গা রূপে বধ করেন মহিষাসুরকে। আবার তিনিই কালীরূপে পান করেন রক্তবীজ অসুর-রক্ত। তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়া। কোথাও তিনি দুর্গা ও কালীর যৌথ রূপ। নানা বৈচিত্র্যের সমাহারে কালীমাতাকে আবাহন করা হয়- কারণ তিনি সনাতনী, ক্যাত্যায়নী, মহামায়া, অপরাজিতা, চ-ী, কালী, শতাক্ষী, কৌশিকী, ভিমা, ভামরি, ভৈরবী, শাকন্তরী, করালিনী, রক্তদন্তিকা, বিন্ধবাসিনী, দুর্গা। তিনি ‘শক্তিরূপেন সংস্থিতা।’

কালিকাপুরাণে আমরা দেখি আদি শক্তি রূপে তিনি যোগীদের মন্ত্র ও তন্ত্র উদ্ঘাটনে তৎপর। তিনি চতুর্ভুজা, খড়্গধারিণী, বরাভয়দায়িনী, নরমু-ধারিণী। তিনি লোলহিহ্বা ও মু-মালা বিভূষিতা। তিনি মুক্তকেশী, কৃষ্ণবর্ণা, শিববক্ষে দ-ায়মানা মাতৃমূর্তি। তিনি মূলত শাক্তদের দ্বারা পূজিত হন এবং একাধার দশ মহাবিদ্যার প্রথমা দেবী ও বিশ্বসৃষ্টির আদি কারণ। অন্ধকারবিনাষিনী তিনিই, দেবতা তথা শুভাশুভ শক্তির সম্মিরিত রূপ। আর বহু নামেই তিনি বিরাজিতা। কালী, মাতঙ্গী কালী, চ্ছিন্নমস্তা কালী, শ্মশান কালী, ভৈরবী বা ভদ্রকালী, দক্ষিণাকালী ইত্যাদি।

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে শক্তি ও শান্তির দেবী শ্যামা মায়ের আগমনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে এখন আনন্দ-উচ্ছ্বাস। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দমুখর পরিবেশে আজ অমাবস্যা তিথিতে দিবাগত মধ্যরাতে দেশব্যাপী উদযাপিত হবে শ্যামাপূজা ও দীপাবলী। সন্ধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিটি ঘরে, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে জ্বালানো হবে মঙ্গল প্রদীপ (দেওয়ালী)। বিশ্বব্যাপী অবারিত মঙ্গল কামনায় হিন্দু সম্প্রদায় জাঁকজমকভাবে শ্যামাপূজা ও দীপাবলী উদযাপনে নিয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র আজ দিবাগত মধ্যরাতে শুরু হবে শ্যামাপূজা। ঢাক-ঢোল, কাঁসর-মন্দিরা আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে দেশের পূজাম-পগুলো। দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত চলবে মহাশক্তি দেবীর আরাধনা। মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত একটানা উপবাসব্রত ও অমাবস্যার নিশিপালনের মাধ্যমে ভক্তরা শ্যামা মায়ের আনুকূল্য লাভে অঞ্জলি দেবেন। নৈবদ্য সাজিয়ে দেবীর পায়ে তারা উৎসর্গ করেন। সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শক্তির দেবী হিসেবে এভাবেই যুগ যুগ ধরে শ্যামাপূজার আয়োজন করে আসছেন।

কোথাও শ্যামাপূজার আনন্দ-উৎসব চলবে আজ থেকে টানা তিন দিন। আবার কোথাও পূজা শেষে কাল বুধবার রাতে প্রতিমা বিসর্জন দেবে। স্বর্গীয় মাতা-পিতা, আত্মীয়স্বজনের নামে ঘরে ঘরে প্রদীপ প্রজ্বলন করবে হিন্দু সম্প্রদায়। রাতে শ্মশানে গিয়ে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালিয়ে, প্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে স্বর্গীয় বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করবে। অনেক বাড়িতে অশুভশক্তি অর্থাৎ অলক্ষ্মী তাড়াতে ভূত পোড়ানো হবে।

রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রতিবছরের ন্যায় এবারও সবচেয়ে বেশি শ্যামা মায়ের পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সরকার থেকেও নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। ঢাকার অধিকাংশ পূজাম-পে আনা হয়েছে নানা বৈচিত্র্য। বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়েছে পূজাম-পগুলো। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে আজ সন্ধ্যায় সহস্র প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমের পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। পোস্তগোলা জাতীয় মহাশ্মশানে ২০টির মতো কালীপূজা অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, গোসাইবাড়ী, যমুনামাঈ আশ্রম, বড় কালীবাড়ী, কালীচরণ সাহা রোড, বিহারীলাল আখড়া, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, পাঁচ শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী বনগ্রাম রাধা গোবিন্দ জিওমন্দির, জয়কালী মন্দির, রামসীতা মন্দির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রমনা কালীমন্দির, রাজারবাগের বরদেশ^রী কালীমন্দিরসহ বিভিন্ন পূজাম-পে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে আলোকসজ্জা, ফানুস ওড়ানো, প্রদীপ প্রজ্বলন, ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, আরতী, প্রসাদ বিতরণ প্রভৃতি।