২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মাতল ‘জ্যাজ এ্যান্ড ব্লুজ ফেস্টিভ্যাল’

  • পান্থ আফজাল

বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যে সঙ্গীত বেশ পরিচিত আর বৈচিত্র্যপূর্ণ হিসেবে সর্বজনবিদিত। বর্তমান সময়ে এদেশের মানুষ বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের নিকট বিভিন্ন ধারার গান আর বিনোদনের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে ব্যাপকভাবে। মানুষের রুচির পরিবর্তন আর উন্নতি সাধনে দেশ-বিদেশের তথা উপমহাদেশের সঙ্গীত অনুরাগ আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিকমানের সঙ্গীতের রস আস্বাদনের সুযোগ এদেশের তরুণ-তরুণীরা লুফে নিতে কখনই কার্পণ্য করে না; আর ওদিকে তো আছেই দেশের অফুরন্ত সঙ্গীত ভাণ্ডার।

জ্যাজ ধারার সঙ্গীত উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই বিখ্যাত। বিশেষ করে ঢাকার মানুষ সরাসরি এই ধারার সঙ্গীত উপভোগ করার জন্য বরাবরই উদগ্রীব ছিল। তাই ২০১২ সালের ‘বেঙ্গল মিউজিক ফেস্ট’ এর মতো ব্লুজ কমিউনিকেশন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করে ‘জ্যাজ ও ব্লুজ উৎসব’। জ্যাজ ও ব্লুজ দুই ধারার সঙ্গীতেরই বিশেষত্ব হচ্ছে এর আলাদা একটা ধুন আছে। একটা ধুনের ভেতরে ডুবে শিল্পীরা খেলতে থাকেন কর্ড আর নোটের খেলা। আর তার সঙ্গে মাঝে মাঝেই যোগ হয় ভাঙা তাল-লয়ের খেলা। বিশ্বখ্যাত সব জ্যাজ ও ব্লুজ-শিল্পীদের সেই সুর-লয়ের খেলাই পরপর তিন রাতব্যাপী উপভোগ করলেন বাংলাদেশের সঙ্গীত অনুরাগীরা। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বিজয় সরণীর সামরিক জাদুঘর মাঠ প্রাঙ্গণজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এই জ্যাজ এ্যান্ড ব্লুজ ফেস্টিভ্যাল।

উৎসব প্রাঙ্গণের আঙ্গিনার প্রধান ফটক পেরোতেই চোখে পড়ল দেয়ালজুড়ে আঁকা বড় বড় সঙ্গীত-কিংবদন্তির ছবি আর তাদের বিভিন্ন উক্তি। কে নেই এই এখানে! স্মৃতির দেয়াল জুড়ে শোভা পাচ্ছে এরিক ক্ল্যাপটন, এ্যামি ওয়াইনহাউস, জিমি হ্যানড্রিক্স বি বি কিং, অর্নেট কোলম্যানসহ আরও কিংবদন্তি সব সঙ্গীতবোদ্ধাদের প্রোট্রেট। স্মৃতির আঙিনায় দোলা দিয়ে যাবে এইসব চেনা মুখগুলো। তবে ফটক পেরিয়েই একটু এগুলেই সব বিশাল আয়োজন সম্ভার আর জাঁকজমকপূর্ণ আবহ পাল্টে দেয় সব ধারণা। শহরের নামী-দামী খাবারঘরগুলোর অস্থায়ী পসরা দেখে আমার মতো ভোজনরসিক আর সঙ্গীতপ্রেমীদের কিছুসময় বুঁদ হয়ে থাকতে হয়েছিল সন্দেহ নেই। মাঠের শেষ প্রান্তে থাকা নীল আলোয় ঘেরা মঞ্চ কাউকে ভ্রমে পড়তে দেয় না। বিশাল মঞ্চটি মনে করিয়ে দেয় এই সন্ধ্যা শুধু জ্যাজ অ্যান্ড ব্লুজে বুঁদ হওয়ার জন্য। এত আয়োজন শুধুই সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য। তাই জাদুঘরের বিস্ময় আর ভোজের মায়া কাউকে মাঠের বাইরের প্রান্তে বেঁধে রাখতে পারে না।

স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, ব্রাজিলের বেশকিছু প্রখ্যাত শিল্পী এতে অংশ নিচ্ছেন। উৎসবটি বাংলাদেশের গানের ধারা ও চর্চাকে এগিয়ে নেয়ার। তাই শুরুটা হলো বাংলাদেশের দল নিয়ে। মঞ্চে উঠল বাংলাদেশের দল ইমরান আহমেদ কুইনটেট। প্রথম পরিবেশনাটি ছিল তাদের মৌলিক সুর, নাম ‘লাইটস’। ইমরানের দলে তাঁর সঙ্গে বাজান রবার্ট জ্যাসন (পিয়ানো), রাহিন হায়দার (স্যাক্সোফোন), মোহাইমেন করিম (বেইজ) এবং তৌফিক তূর্য (ড্রামস)।

ইমরান আহমেদ কুইনটেটের পরিবেশনার পর খানিক বিরতি। সঙ্গীত পরিবেশনার সামনে কিছু সময়ের জন্য ঝিমিয়ে পড়া খাবার দোকানগুলো আবার চাঙা হয়ে উঠল। প্রায় ১৭টি খাবারের দোকান মাঠজুড়ে তাদের পসরা সাজিয়েছে। দ্য ওয়েস্টিন, নান্দোস, লক্ষেèৗ, লাইভ কিচেন, নর্থ এ্যান্ড কফিরোস্টার, দোসা এক্সপ্রেস, ম্যাড শেফের মতো খাবারের দোকানগুলো তাদের সেরা তালিকা নিয়ে হাজির হয়েছে এই উৎসবে।

বিরতি শেষ হতেই মঞ্চে উঠলেন ভারতের জ্যাজ শিল্পী বসুন্ধরা বিদ্যালুর তাঁর দল নিয়ে। মঞ্চে উঠেই তিনি জানালেন অজানা নতুন তথ্য। ইংরেজীতে বললেন, আমার শিকড় এ দেশেই, বরিশালে। কিন্তু মজার বিষয়, এত দিনে এ দেশের মঞ্চে গান করার সুযোগ মিলল। নতুন তথ্য দিয়ে বিদ্যালর শুরু করলেন তাঁর প্রথম গান, নির্ভানার ‘অ্যাজ ইউ আর’। এরপর একে একে গান দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ আর অবাক করেই গেলেন। বসুন্ধরার ব্যাপারে আরও একটি তথ্য আছে জানার মতো। গত বছর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত ভারতীয় চিলড্রেন অব ওয়ার ছবিতে দুটি গান করেছেন তিনি।

এরপরে মঞ্চে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সাই মাইস্ট্রো ট্রিওর। তবে মঞ্চমুখী সকল দর্শকেরা অধীর অপেক্ষা জন ম্যাকলাফলিনকে শোনার জন্য। রাত যত গভীর হতে থাকে, ম্যাকলাফলিনের জন্য সঙ্গীত অনুরাগীদের অপেক্ষা হয়ে ওঠে আরও গভীর। চারদিকে হৈ-হুল্লোড় আর চিৎকার। বিশাল স্টেজে আলোর ঝলকানিতে মোহনীয় পরিবেশে জ্যাজ মাস্টারের সুরের মূর্ছনায় ভেসে যাওয়ার জন্য সবাই তখন প্রস্তুত। যার জন্য এত অপেক্ষা তিনি আর কেউ নন, বিশ্বের প্রথম সারির গিটারিস্ট ও জ্যাজসঙ্গীত ব্যক্তিত্ব জন ম্যাকলাফলিন; যার সঙ্গীতে সারা দুনিয়ায় মানুষ মোহাবিষ্ট সেই ষাটের দশক থেকে। ‘মহাবিষ্ণু অর্কেস্ট্রায়’ তার জ্যাজ ও প্রগেসিভ মিউজিক যেমন মাত করেছে, ঠিক তেমনি ‘শক্তি’ ব্যান্ডের ওস্তাদ জাকির হোসেন ও লক্ষ্মীনারায়ণ শংকরের সঙ্গে জ্যাজ ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনবদ্য ফিউশন সঙ্গীত উপহার দিয়েছেন তিনি। বিশ্ব সঙ্গীতের সবচেয়ে সম্মানজনক গ্র্যামি এ্যাওয়ার্ডজয়ী ব্রিটিশ এই সঙ্গীত তারকার সঙ্গীতসুধা পান করার সুযোগ প্রথমবারের মতো গতকালই পেলেন বাংলাদেশের শ্রোতারা। জ্যাজ মিউজিকে এমনিতেই উচ্ছ্বাসের একটা ব্যাপার সবময় থাকে। ম্যাকলাফলিনের গিটারের সুরে সেটা যেন আরও প্রাণ ফিরে পেল। একটার পর একটা ইন্সট্রুমেন্টাল দিয়ে তিনি মাত করতে লাগলেন শ্রোতাদের। তার গিটারের মোহ আর সুরের-মাদকতা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

উৎসবের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ শুক্রবার মঞ্চ মাতালেন বাংলাদেশের রাজেফ খান ও তার ফরাসী বন্ধু ফ্লোরিয়ান এবং দ্য ব্লুজ ব্রাদার্স, ভারতের লুই ব্যাংকস ও যুক্তরাষ্ট্রের কিংবেবি।

শনিবার ছিল ব্লুজ কমিউনিকেশন্সের আয়োজনে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত জ্যাজ এ্যান্ড ব্লুজ উৎসব-২০১৫-এর শেষ রাত। রাজধানীর বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘর মাঠে প্রবেশ করতেই দেখা গেল সঙ্গীতপ্রেমীরা দলে দলে জড়ো হয়েছেন মন মাতানো মিউজিকের স্বাদ নিতে। সবুজ তৃণভূমি আচ্ছাদিত মাঠে বসে পড়েন শ্রোতারা। সমাপনী রাতে কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতের পরিবেশনায় অংশ নেয় চার দেশের শিল্পীরা। সমাপনী রাতে সুরে সুরে শ্রোতাদের মোহবিষ্ট করে রাখেন আইয়ুব বাচ্চু ও তার দল এবি ব্লুজ, ভারতের সোলমেট, ব্রাজিলের এসড্রাস নোগুয়েরা কোয়ার্টেট ও ফ্রান্সের শিল্পী চায়না মোজেস। তবে রাতের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফ্রান্সের শিল্পী চায়না মোজেস।

পরিবেশনার শুরুতেই মঞ্চে আসেন ভারতের দল সোলমেট। তারা মূলত ব্লুজ গান পরিবেশন করেন। তবে তাদের গানে ব্লুজের পাশাপাশি রক এ্যান্ড রোল, হার্ডরক ও সোল সঙ্গীতের সংমিশ্রণ বেশ স্পষ্ট ছিল। ভারতের মেঘালয়ের এই ব্যান্ডটির প্রধান গায়িকা তিপৃতি টিপস খারবাঙ্গার। দলটি তাদের প্রকাশিত তিনটি এ্যালবাম শিলং, মুভিং অন ও টেন স্টোরিজ আপ থেকে নিজেদের গানগুলো পরিবেশন করেন। এর মধ্যে লাই, ব্লুজ ইজ মাই বিজনেস গানগুলো অন্যতম। দলের রুডি ওয়ালাঙ্গের গিটারের অনবদ্য সুর দর্শক শ্রোতাদের মোহিত করে। তিপৃতির পাশাপাশি গান গেয়ে শোনান রুডিও।