২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মসজিদভিত্তিক দলীয় রাজনীতির পরিণাম

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে একটি সুবিশাল মসজিদ নির্মাণের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল স্থানীয় বরো কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ তার অনুমতি দেননি। এমনকি সেখানে যে একটি অস্থায়ী মসজিদ আছে সেটিও সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় তবলীগ জামাত। তারা দশ হাজার নামাজির স্থান সঙ্কুলানের মতো মসজিদ তৈরির ব্যবস্থা করেছিলেন এবং সেজন্য জমি অধিগ্রহণেরও বন্দোবস্ত সেরেছিলেন। এই মসজিদ নির্মাণে তাদের যুক্তি ছিল, মুসলিম জনসংখ্যা হালে দারুণভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় একটি বিশাল মসজিদ তৈরি জরুরী হয়ে পড়েছে।

কাউন্সিল যে এই মসজিদ নির্মাণের অনুমোদন দেয়নি তার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, স্থানীয় লোকজন এই মসজিদের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। এই মসজিদ নির্মিত হলে এই এলাকায় যে বিশাল জনসমাগম হবে এতে এলাকার শান্ত পরিবেশ আর থাকবে না। স্থানীয় মানুষের শান্তিময় জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। এটা সঠিক কারণ হতে পারে। আবার অজুহাতও হতে পারে, স্থানীয় মুসলমানেরা এবং সেন্ট্রাল মস্্ক্্ কমিটি বরো কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং ব্রিটেনে মুসলমান নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।

কিছু কিছু ব্রিটিশ মুসলিম আবার এই প্রতিবাদে গলা মেলাতে রাজি হননি। তারা বলেছেন, ব্রিটেন একটি উদার দেশ এবং সকল ধর্মের সহাবস্থান ও সমঅবস্থানের অধিকার এখানে স্বীকৃত। ব্রিটেনে বিশাল বিশাল হিন্দু মন্দির, বৌদ্ধ প্যাগোডা এবং অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয় তৈরিতে যেমন বাধা দেয়া হয়নি, তেমনি মসজিদ তৈরিতেও বাধা দেয়া হয়নি। ফলে ব্রিটেনে হাজার হাজার মসজিদ গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখন যে মসজিদ নির্মাণে আপত্তি তোলা হচ্ছে তার বড় একটা কারণ সম্ভবত এই যে, হালে দেখা যাচ্ছে লন্ডনসহ ব্রিটেনের বহু মসজিদে ধর্ম প্রচারের আড়ালে দলীয় রাজনীতিÑবিশেষ করে জিহাদিজম প্রচার চলছে।

বহু মসজিদের ইমাম ও খতিব এই জিহাদিজম প্রচারের হোতা। তারা হয় মধ্যপ্রাচ্যের জিহাদিস্টদের সঙ্গে অথবা বাংলাদেশের জামায়াতীদের সঙ্গে যুক্ত। ব্রিটেনে এই জিহাদিস্ট রিক্রুটের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ সরকার এখন সতর্ক হয়েছেন। বহু মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর তারা নজর রেখেছেন। ব্রিটেনে মসজিদের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে তাদের সাম্প্রতিক আপত্তির কারণও সম্ভবত এটাই। সুতরাং মসজিদ নির্মাণ সংক্রান্ত সরকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানানোর আগে ব্রিটেনের মুসলমানদের বিশেষ করে মসজিদ কমিটি ও মুসলিম সংগঠনগুলোর উচিত, বহু ব্রিটিশ মসজিদ ও তাদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জিহাদিস্টদের ও জামায়াতীদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা এবং সেখানে প্রকৃত ধর্মচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা। ব্রিটিশ মুসলমানদের এই উদার অংশের অভিমতের সঙ্গে আমিও সহমত পোষণ করি।

চল্লিশ বছর আগে আমি যখন লন্ডনে আসি, তখন আমার পাড়া হ্যারোতে একটি মসজিদও ছিল না। বাঙালী অধ্যুষিত ইস্ট লন্ডনে একটি ছোট মসজিদ ছিল। সেন্ট্রাল লন্ডনে রিজেন্ট স্ট্রিটে ছিল একটি বড় মসজিদ। সেটি এখন আরও বড় হয়েছে। হ্যারোতে ঈদের নামাজ, জুমার নামাজ পড়তে হলে বিভিন্ন খ্রিস্টান চার্চের হলঘর ভাড়া নিতে হতো। অনেক সময় বিনা ভাড়াতেও তা পাওয়া যেতো। আমার মনে আছে, আমি সত্তর ও আশির দশকে হ্যারোতে একটি মেথডিস্ট চার্চে দুই ঈদের নামাজ পড়েছি। স্থানীয় চার্চগুলোর কর্তৃপক্ষ ঈদ, জুমার নামাজ, মিলাদুন্নবী ইত্যাদি পালনের জন্য তাদের ধর্মগৃহের দরোজা আমাদের জন্য খুলে দিতেন।

সেই হ্যারোতে এখন একটি বিশাল মসজিদ গড়ে উঠেছে এবং আশপাশে অসংখ্য ছোট বড় মসজিদ। এসব মসজিদ নির্মাণে ব্রিটিশ সরকার অথবা জনগণ কখনও বাধা দেননি। বরং সহায়তা জুগিয়েছেন। এমনকি ব্রিটেনের ইহুদী সম্প্রদায় পর্যন্ত মসজিদ নির্মাণে সহায়তা জুগিয়েছেন। হোয়াইট চ্যাপেলের ইস্ট লন্ডন মসজিদ কমপ্লেক্স এবং ব্রিকলেনের জামে মসজিদ দুটিই আগে ছিল ইহুদীদের ধর্মগৃহ বা সেনাগ্গ, এই সেনাগ্গ মসজিদে রূপান্তরের জন্য মুসলমানের কাছে হস্তান্তর করতে তারা অসম্মত হননি।

ব্রিটেনে বহু আগে একটি মাত্র বড় মসজিদ ছিল। লন্ডনের অদূরে ওকিং নামক স্থানে মসজিদটি স্থাপিত হওয়ায় তার পরিচয় ছিল ওকিং মসজিদ। এই মসজিদ ইসলাম ধর্ম প্রচারেরও একটি কেন্দ্র ছিল। তাতে ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার ছিল এবং ‘ইসলামিক রিভিয়্যু’ নামে একটি উচ্চমানের সাময়িকী বের হতো। এই মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করতেন আহমদীয়া মুসলমানেরা। তখন শিয়া-সুন্নি ও আহমদীয়াদের মধ্যে ভেদাভেদ তেমন প্রকট ছিল না বলে ওকিং মসজিদ সকল মুসলমানের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেখানে দলীয় রাজনীতি বা হালের জিহাদি রাজনীতির চর্চা হতো না। ফলে ইউরোপে ইসলাম প্রচারের জন্য ওকিং মসজিদ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পেরেছিল। বর্তমানে সৌদি আরব ও ওয়াহাবিদের কল্যাণে শিয়া-সুন্নি-আহমদীয়া ইত্যাদি মজহাবি বিবাদ দেখা দেয়ায় এবং মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট হওয়ায় ওকিং মসজিদ তার আগের গুরুত্ব হারিয়েছে এবং ব্রিটেনের বহু মসজিদ নানা ধরনের বিবাদ-বিসম্বাদের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

লন্ডনের বাঙালী অধ্যুষিত এলাকার সর্ববৃহৎ মসজিদ ইস্ট লন্ডন মসজিদ সম্পর্কে বহুদিনের অভিযোগ, এটি বাংলাদেশের জামায়াতীদের খপ্পরে রয়েছে। এই মসজিদ সংলগ্ন লন্ডন মুসলিম সেন্টারটি আসলে ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রচারের আড়ালে জামায়াতের উগ্র রাজনৈতিক দর্শন প্রচারের কেন্দ্র বলে অনেকেই মনে করেন। ব্রিটেনের যেসব মসজিদে জামায়াতীরা ইমাম বা খতিবের পদ দখল করে বসে আছে, তারা সেখানে জুমার নামাজের খোতবা পাঠের আড়ালেও জামায়াতের রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রচার করেন। শুনেছি, একবার এক মসজিদের ইমাম ঈদের নামাজের খোতবা পাঠ করার সময় বলে উঠেছিলেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা হারাম এবং শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিলে দোজখে যেতে হবে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনারও কেন্দ্র ছিল মসজিদ। তখন মুসলমানদের মধ্যে কোন মজহাবী বিভেদ ছিল না, রাজনৈতিক দল ছিল না। কিন্তু পরে ধর্ম ও রাষ্ট্রনীতির পার্থক্যের কারণেই মহানবী (দ.) সম্ভবত মক্কার কাবাগৃহ থেকে ইসলামী খেলাফতের রাজধানী মদিনায় সরিয়ে নেন। পরে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন এবং আব্বাসীয় ও উমাইয়াদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আল্লার ঘর হিসেবে বিবেচিত মসজিদকে এই আত্মঘাতী রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের উর্ধে রাখার জন্য শুধু ধর্মগৃহ হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। মক্কা থেকে মরক্কো পর্যন্ত সমস্ত মসজিদ হয়ে ওঠে মুসলমানদের ঐক্যকেন্দ্র এবং মুসলিম স্থাপত্য শৈলীর সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক।

সউদি আরবে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা এবং কট্টর ওয়াহাবিজমের আবির্ভাব মসজিদের ইসলামী সার্বজনীনতাকে নষ্ট করে এবং মজহাবিভিত্তিক মসজিদ প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। ওয়াহাবিরা মসজিদে ইসলাম প্রচারের নামে কট্টর ওয়াহাবিজম প্রচার শুরু করে। অন্য মজহাবের মুসলমানদের অমুসলমান ঘোষণা করে। শুরু হয় মজহাবি যুদ্ধ। যার পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-সুন্নি রক্তাক্ত যুদ্ধ। ওয়াহাবিজম থেকে উদ্ভূত মওদুদীবাদের অনুসারীরা গত শতকের পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানে আহমদীয়াবিরোধী এমন দাঙ্গা শুরু করেছিল যে, সেনাবাহিনীকে মসজিদে ঢুকে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষ হত্যা করতে হয়েছিল। বাংলাদেশও স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াতীদের উস্কানিতে আহমদীয়াদের মসজিদগুলোর ওপর হামলা শুরু হয়েছিল।

এখন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশসহ বহু দেশে বহু মসজিদে জামায়াতিরা ধর্ম প্রচারের আড়ালে তাদের উগ্র ধর্মীয় রাজনীতির তত্ত্ব প্রচার করছে এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করছে। পাশাপাশি জিহাদিস্ট রিক্রুটমেন্ট সেন্টার হিসেবেও বহু মসজিদ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে যে পাকিস্তান ইসলামের হোমল্যান্ড হিসেবে জন্ম নিয়েছে, সেই পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কামান দেগে লাল মসজিদের মতো ঐতিহাসিক মসজিদ ধ্বংস করেছে। প্রায় প্রত্যহ চলছে শিয়া মসজিদের ওপর বোমা হামলা। মরছে ডজন ডজন লোক। জামায়াতী-রাজনীতি শুধু শান্তির ধর্ম ইসলামেরই সুনাম নষ্ট করে তাকে টেরোরিজমের পোশাক পরায়নি, আল্লাহর ঘর হিসেবে প্রতিটি মুসলমানের কাছে বিবেচিত মসজিদের পবিত্রতা ও সার্বজনীনতাও নষ্ট করছে।

বাংলাদেশেও জামায়াত এবং সন্ত্রাস সমার্থ বোধক শব্দ। নতুন নতুন জঙ্গী গ্রুপ জামায়াতের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়েই বেড়ে উঠেছে। একশ্রেণীর মসজিদ ও মাদ্রাসা তাদের রিক্রুট কেন্দ্র। বর্তমান সরকারের সন্ত্রাস দমনের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি সন্ত্রাসের উৎসমুখ তারা বন্ধ করতে না পারেন। পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের ট্রেনিং কেন্দ্র দু’হাজার মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তা মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর হস্তক্ষেপ নয়। সন্ত্রাসীদের ট্রেনিং ও রিক্রুটমেন্টের কেন্দ্র হিসেবেই এগুলো বন্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও জামায়াতী ও উগ্রপন্থীদের দ্বারা অধিকৃত মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। মসজিদে ধর্মীয় রাজনীতির চর্চা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে যেসব মাদ্রাসা জিহাদিস্ট তৈরির কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোকে উগ্রপন্থীদের প্রভাবমুক্ত করতে হবে।

এটা একটা কঠিন টাস্ক। কিন্তু সরকারকে সমস্যার গোড়ায় অবশ্যই হাত দিতে হবে।

[লন্ডন ১০ নবেম্বর, সোমবার, ২০১৫]