১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেনারা সুচিকে সুযোগ দেবে কি!

  • জান্তা যুগের বৈরীরা এখনও বড় বড় পদে ॥ দেশ শাসনে দরকার হবে রাজনৈতিক দক্ষতার

মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী আউং সান সুচি গতবারও নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু তখন দেশের শাসক সেনা-জেনারেলরা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন, তাকে গৃহান্তরীণ করেন এবং তার হাজার হাজার সমর্থককে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করেন। তাদের অনেককে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়।

সেটি ছিল ১৯৯০ সালের ঘটনা। ২৫ বছর পর ‘আসে সু’ (মাতা সু) ও তাঁর ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) আবারও একবার জয়ী হয়েছেন। সেনাবাহিনী জনগণের রায় মেনে নিয়ে তাকে দেশ শাসন করতে দেবে কি না, সেটিই কিন্তু এখন প্রশ্ন।

তারা তাকে সেই সুযোগ দেবে বলে দাবি করছে। প্রেসিডেন্ট সাবেক জেনারেল সেইন ফলাফলকে অনিবার্য বলে গ্রহণ করেছেন বলে দেখা যায়। তিনি বলেন আমাদেরকে আমাদের ভোটারদের ইচ্ছা মেনে নিতে হবে। তিনি বলেন, যিনিই দেশ চালান না কেন, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেনা সমর্থিত ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) নেতা বলেন, আমরা হেরেছি। আমাদের হারার কারণ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। তবে আমরা নির্বাচনী ফলাফলকে অবশ্যই নিঃশর্তে গ্রহণ করছি। কিন্তু এসব সম্প্রতিসূচক কথাবার্তা বেশি গুরুত্ব নাও বহন করতে পারে। ভবিষ্যতে কি ঘটবে, তা ক্ষমতাসীন মহলের পুরনো কট্টরপন্থী সদস্যদের ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করবে। তারা ২০১১ সালের আগে জান্তা পরিচালনা করতেন এবং সুচিকে এক অপ্রকাশ্য শত্রু বলে গণ্য করতেন। সেই বছর এক ভুয়া নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দেশের সামরিক জান্তার হাত থেকে প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের কাছে অর্পণ করা হয়। পুরনো সদস্যরা তাদের ভরাডুবির জন্য এখন থেইন সেইনের মধ্যপন্থী সংস্কারবাদকে দোষারোপ করবেন। তাদের সাবেক শত্রুরা ক্ষমতায় গেলে তাদের নির্যাতনের প্রতিশোধ নেবেন বলেও তারা আশঙ্কা করছেন। অথচ সুচি শান্তিপূর্ণ ও অহিংস দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের কথা বলেছেন। পুরনো রক্ষণশীলদের বৈরী প্রভাবের কথা বাদ দিলেও সেনাবাহিনী এখনও অনেক রাজনৈতিক পদে আসীন থাকায় সুচির জন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি যদি এনএলডি পার্লামেন্টের ৬৬৪টি আসনের এক বিরাট অংশ লাভ করে, তা হলেও ইউএসডিপি অর্থাৎ সেনাবাহিনী জান্তা প্রণীত সংবিধানের আওতায় আপনা আপনিতেই পার্লামেন্টের শতকরা ২৫ ভাগ আসন নিজেদের হাতে রাখবে। অধিকন্তু, আউং সান সুচি প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য হবেন না। কারণ তিনি এক বিদেশীকে বিয়ে করেছিলেন এবং তার দু’ছেলে ব্রিটিশ নাগরিক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নির্বাচনে হারলেও সেনাবাহিনী কয়েকটি বড় মন্ত্রণালয় নিজেদের হাতেই রাখবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, সীমান্ত ও পুলিশ। সংবিধান অনুযায়ী, প্রয়োজন মনে করলে সেনাবাহিনী অর্থনীতির ব্যবস্থানাসহ সামগ্রিকভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করতে পারে। বাস্তবে সেনাবাহিনীর ন্যাশনাল ডিফেন্স এ্যান্ড সিকিউরিটি কাউন্সিল পার্লামেন্টের চেয়েও ক্ষমতাশালী সংস্থা। এরূপে, দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি সেনাবাহিনী জাতিগত সংখ্যালঘু দলগুলোর ওপর হামলা এবং ভোটাধিকারবঞ্চিত রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যেতে চায়, তা হলে কোন এনএলডি সরকারের বলার মতো কিছু থাকবে না। সে জন্যই মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এনএলডির সাফল্য সত্ত্বেও প্রকৃত ক্ষমতা সব সময়ই যেখানে ছিল, সেখানেই থেকে যাবে।

মিয়ানমারের অনেক বিভেদ ও সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি যদি সেনাবাহিনীকে পক্ষে ও ব্যারাকে রাখতে হয়, তা হলে সুচিকে এ জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় খুবই রাজনৈতিক দক্ষতা ও তীক্ষèবুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে। সুচির অতুলনীয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও মর্যাদাশীল পারিবারিক ঐতিহ্য তার জন্য সহায়ক হবে। তিনি মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা এবং সে দেশের সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আউং সানের কন্যা। কিন্তু বৌদ্ধ স্বাদেশিকতা, চলমান রাজনৈতিক নির্যাতন এবং চরম দারিদ্র্য তার কাজকে জটিল করে তুলবে। আউং সান সুচি ২৫ বছর পর আবার গৌরবোজ্জ্বল বিজয় অর্জন করেছেন। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন, তিনি জেনারেলদের স্মরণীয়ভাবে পরাজিত করেছেন। তারা তার ও অন্য অনেকের ওপর দীর্ঘদিন নির্যাতন চালিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জেনারেলদের ছাড়া দেশ শাসন করতে পারবেন না। গার্ডিয়ান অনলাইন।

নির্বাচিত সংবাদ