২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চেকপোস্টে ছুরি নিয়ে হামলা ॥ এবার মিলিটারি পুলিশ

চেকপোস্টে ছুরি নিয়ে হামলা ॥ এবার মিলিটারি পুলিশ
  • যুদ্ধাপরাধীদের অনুসারীরা এ কাজ করেছে ॥ ডিএমপি কমিশনার;###;পুলিশ, আর্মি ও জনগণ মিলে হামলাকারীকে আটক করেছে;###;কড়া জিজ্ঞাসাবাদ চলছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গাবতলী ও আশুলিয়ায় চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে ছুরিকাঘাতে দুই পুলিশ হত্যার পর ঠিক একই কায়দায় এবার এক মিলিটারি পুলিশকে হত্যাচেষ্টা হয়েছে। মিলিটারি পুলিশের ওই সদস্যকেও ধারালো ছুরি দিয়ে পেছন দিকে থেকে আচমকা এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে আহতের চিকিৎসা চলছে। রাজধানীর কাফরুল থানাধীন কচুক্ষেত এলাকায় মিলিটারি পুলিশ (এমপি) চেকপোস্টে ঘটনাটি ঘটে। হামলাকারী ছুরিসহ ধরা পড়েছে। হামলার কারণ, হামলাকারীর পরিচয়, ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক আদর্শ, স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানা, মূল পেশাসহ যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে গভীর অনুসন্ধান চলছে। কড়া জিজ্ঞাসাবাদ চলছে হামলাকারীকে।

এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর)-এর পরিচালকের পক্ষে সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম শাম্মী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার সময় কাফরুল এলাকায় কর্তব্যরত একজন মিলিটারি পুলিশকে একজন পথচারী পেছন থেকে ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে আঘাত করে। এতে ওই মিলিটারি পুলিশ সদস্য সামান্য আহত হন। কর্তব্যরত অন্য সামরিক সদস্যগণ সন্দেহভাজন এক হামলাকারীকে আটক করেছে। বিস্তারিত জানার জন্য ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে।

এমন ঘটনার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। তাদের অনুসারীরা এ বিচার ব্যাহত করার জন্য এমন হামলা চালিয়েছে।

মঙ্গলবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর কচুক্ষেত বাজার সংলগ্ন ভাগ্যকূল মিষ্টান্ন ভা-ারের সামনে ঘটনাটি ঘটে। ঘটনাস্থলটি সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই)-এর অফিসের খুব কাছে। সেখানকার তিন রাস্তায় স্থায়ীভাবে মিলিটারি পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টাই সেখানে যানবাহন ও সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হয়। প্রতিদিনের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন ১৩ মিলিটারি পুলিশের ল্যান্স কর্পোরাল সামিদুল ইসলাম। যথারীতি যানবাহনে তল্লাশি করছিলেন তিনি। ওই রাস্তায় রিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছিলেন, ঘটনার সময় একটি রিক্সা ঠিক ওই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছিল। যথারীতি রিক্সাটিকে থামার নির্দেশ দেন মিলিটারি পুলিশের ওই সদস্য। রিক্সাচালক যথারীতি সেখানে দাঁড়ায়। রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল রিক্সাচালক। কথা বলতে বলতেই আচমকা শরীরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা অন্তত ২ ফুট লম্বা ধারালো ছুরি দিয়ে মিলিটারি পুলিশকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। পেছন থেকে আচমকা কোপাতে থাকায় মিলিটারি পুলিশের ওই সদস্য রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যান। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মিলিটারি পুলিশের ওই সদস্যের বাঁ ঘাড় ও চোয়ালে মারাত্মক জখম হয়। বাধা দিলে সামিদুলের হাতেও আঘাত করে হামলাকারী। ঘটনাস্থলের পাশেই ব্যবসায়িক ও আবাসিক এলাকা। স্বাভাবিক কারণেই প্রচুর লোকের সমাগম ছিল ওই সময়।

আচমকা এমন ঘটনায় হতভম্ব মিলিটারি পুলিশের ওই সদস্য ও আশপাশের লোকজন। তার চিৎকারে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য মিলিটারি পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও ডিজিএফআইর সদস্যরা ছাড়াও স্থানীয়রা হামলাকারীকে ধরতে পিছু নেয়।

হামলাকারী ছুরি নিয়েই রিক্সা ফেলে সোজা রাস্তা পার হয়ে উত্তর কাফরুল এলাকার গলির ভেতর ঢুকে পড়ে। দ্রুত দৌড়াতে থাকে। মিলিটারি পুলিশ, সেনা সদস্য, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ছাড়াও স্থানীয় জনতাও হামলাকারীর পিছু পিছু দৌড়াতে থাকে। বিভিন্ন গলি দিয়ে পালিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে রাজধানীর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন উত্তর কাফরুলের ২৩৯/১/খ নম্বর ৫ তলা বাড়ির পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে। সেই ফ্ল্যাটটিতে সাখাওয়াত হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী পরিবার ও ছোট ভাইকে নিয়ে বসবাস করেন। বাড়িটির মালিক আব্দুর রশীদ খান। তিনি দ্বিতীয় তলায় বসবাস করেন।

সাখাওয়াত হোসেন পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানান, বাড়িতে ঢোকার সময় বাড়িটির মূল গেটের ভেতরে থাকা পকেট গেটটি খোলা ছিল। নিরাপত্তা প্রহরী হারুন বাইরে ছিল। মূল বাড়িতে ঢোকার জন্য কলাপসিবল গেটটিও খোলা ছিল। দুটি গেট খোলা থাকায় হামলাকারী দ্রুত দৌড়ে ৫ তলা বাড়িটির ছাদের দিকে উঠে যায়। ছাদে তালা দেখে পাঁচ তলার দরজা নক করে। ছোট ছেলে না বুঝে তার চাচা এসেছে বলে অনুমান করে, দরজা খুলে দেয়। এর পরই হামলাকারী রক্তাক্ত ছুরি দেখিয়ে বাড়ির সবাইকে জিম্মি করে ফেলে। হামলাকারীর বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। শক্তিশালী পুরুষ। মুখ ভর্তি লম্বা দাঁড়ি। দাঁড়ি প্রায় নাভি পর্যন্ত নেমে গেছে। হামলাকারীকে রিক্সাচালক বলে মনে হচ্ছিল না। এমন দাবি করেছেন, প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই।

সাখাওয়াত হোসেন আরও জানান, সবাইকে ফ্ল্যাটের বাইরে বের করে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয় ওই হামলাকারী। ১০ থেকে ১৫ মিনিট কারও সাড়া শব্দ না পেয়ে নিজেই দরজা খুলে আবার পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় দারোয়ান হামলাকারীকে পালানোর প্রলোভন দেখিয়ে ধৈর্য ধরতে বলেন। এরপর সুযোগ বুঝে দরজার বাইরে তালা লাগিয়ে দেয়। ততক্ষণে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকা সশস্ত্র বাহিনীর লোকজন, পুলিশ ও স্থানীয় জনতাও সেই বাড়িতে হাজির হয়। তারপর সেই বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় হামলাকারীকে। তাকে সামরিক গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই) কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

স্থানীয়রা বলছিলেন, হামলাকারী রক্তাক্ত বিশাল ছুরি নিয়ে একটি ফার্নিচারের দোকানে ঢুকে আত্মগোপনের চেষ্টা করে। সেখানকার লোকজন কাঠ নিয়ে হামলাকারীকে তাড়া করে। এরপর হামলাকারী পালিয়ে ওই বাড়িতে আত্মগোপন করেছিল।

কি উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে সে বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। হামলাকারীর স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানা, তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক পরিচিতি জানার চেষ্টা চলছে। হামলায় ব্যবহৃত ধারালো ছুরিটি কোথায় কিভাবে, কি উদ্দেশ্যে রেখেছিল সে বিষয়েও বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। হামলাকারীর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আদর্শ জানার চেষ্টা চলছে।

এদিকে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হয় সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, সিআইডিসহ অন্যান্য সংস্থার লোকজন। ঘটনাস্থলটি ঘিরে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেনানিবাসে রিক্সা প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। যানবাহনে বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে তল্লাশি চলছে। পুরো এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কাফরুলসহ আশপাশের এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কাফরুল থানা পুলিশ বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী হারুন, পাঁচতলার বাসিন্দা সাখাওয়াতের ভাই ডিশ ব্যবসায়ী সুমনসহ ৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তবে তাদের আটক বা গ্রেফতার করা হয়নি। শুধু হামলাকারী ও ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রগুলো বলছে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন মামলা হয়নি বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জানান।

মঙ্গলবার ডিএমপি সদর দফতরে গাড়ি প্রদান অনুষ্ঠানে সেনা সদস্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যাচেষ্টার ঘটনার বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, গাবতলী ও আশুলিয়ায় চেকপোস্টে যেভাবে ছুরিকাঘাতে দুই পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, ঠিক একই কায়দায় এবার সেনা সদস্যকে হত্যাচেষ্টা হয়েছে। একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী, যারা নিকট অতীতে মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, আন্দোলনের নামে যারা জনগণের নিরাপত্তা বিঘিœত করেছে, কচি শিশুদের পুড়িয়ে মেরেছে; আজকে তারাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করছে।

তিনি আরও বলেন, রাজধানীতে পুলিশের তল্লাশি চৌকি বৃদ্ধি ও পুলিশ সদস্যরা সতর্ক থাকার কারণেই মিলিটারি পুলিশ সদস্যের ওপর হামলাকারীকে ধরা সম্ভব হয়েছে। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। মূলত তাদের অনুসারীরাই এ ধরনের হামলা চালাচ্ছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। কারা এদের অর্থ দাতা, কারা মদদদাতা তা বের করার চেষ্টাও করা হচ্ছে। তদন্তে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। নাশকতাকারীদের দমনের জন্য তথ্যানুসন্ধান চলছে। যারা এ রকম করছে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। পুলিশকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে যে কোন পরিস্থিতিতে তারা তা ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি পরিকল্পিতভাবে পুলিশকে আঘাত করতে চায়, সেটা শতভাগ নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে ঢাকার গাবতলীর আমিনবাজার ব্রিজের ঢালে পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাশিকালে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় দারুস সালাম থানার এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে। হত্যাকা-ের পর পালানোর সময় গ্রেফতার হয় বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাথী মাসুদ রানা। তার তথ্যমতে ওই রাতেই রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে এক জামায়াত নেতা ও দুই ছেলে ছাত্র শিবিরের সদস্যকে ৫টি হ্যান্ডগ্রেনেডসহ গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধারকৃত হ্যান্ডগ্রেনেডের সঙ্গে হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলে হামলায় ব্যবহৃত হ্যান্ডগ্রেনেডের হুবহু মিল রয়েছে। তাজিয়া মিছিলে হামলায় ২ জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। মাসুদ রানা জানায়, বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি প্রকাশ ওরফে কামাল পুলিশ কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এ ছাড়া গত ৪ নবেম্বর সকালে সাভারের আশুলিয়ার নন্দনপার্কের সামনে পুলিশ চেকপোস্টে ছুরিকাঘাতে নিহত হন শিল্প পুলিশের কনস্টেবল মকবুল হোসেন। গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নূরে আলম সিদ্দিকী। হামলাকারীরা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আচমকা হামলা চালায়। হামলাকারীরা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়।

নির্বাচিত সংবাদ