১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সুচির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ-রোহিঙ্গা সঙ্কট

  • নয়া সরকারের সম্ভাব্য নীতির প্রশ্নে সবাই সজাগ

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম/এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ মিয়ানমারে দীর্ঘ ২৫ বছর পর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। বিরোধীদল আউং সান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডি (ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি) নিরঙ্কুশ বিজয়ের খবর পৃথিবীজুড়ে চাউর হয়েছে। এখন এ ফলাফল সরকারী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার অপেক্ষার প্রহর চলছে। আর নির্যাতিত ও দেশান্তরি রোহিঙ্গারা আশার দিন গুনছে।

এদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর পরিচালিত নিপীড়ন নির্যাতন ও জ্বালা পোড়াওয়ের ঘটনায় দেশান্তরি হয়েছে লাখ লাখ নর-নারী ও শিশু। যার মধ্যে কমপক্ষে ১০ লাখের অবস্থান রয়েছে বাংলাদেশে। আবার এর মধ্যে কমপক্ষে ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থানে। তবে সরকারীভাবে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের দুটি ক্যাম্পে শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত অবস্থায় থাকার সংখ্যা ২৭ হাজার। বিগত ২৪ বছরে এর দুটি শরণার্থী ক্যাম্পে জন্ম নিয়েছে আরও ৮ সহস্রাধিক শিশু। এছাড়া প্রতিনিয়ত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন ফাঁকফোঁকরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হলেও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা যায়নি। ফলে এদের বিশাল একটি অংশ মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসী হতে গিয়ে অনেকে সাগর ডুবে প্রাণ হারিয়েছে, অনেকে বন্দী শিবিরে নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন। আবার কেউ কেউ মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের জেল জীবনে রয়েছেন।

মূলত বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যাটি বড় ধরনের একটি সমস্যা হিসেবে জিইয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকারের এ ব্যাপারে আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। ফলে শরণার্থী হয়ে আসা বৈধভাবে থাকা এবং অবৈধভাবে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের সমস্যা সম্পূর্ণভাবে সমাধান হওয়ার পথ অনেকটা তিরোহিত হয়ে আছে।

গত রবিবার মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এনএলডি বিপুল ভোটে বিজয়ের ঘটনার পর এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে দলটির নেত্রী নোবেল বিজয়ী আউং সান সুচি ক্ষমতায় বসতে পারলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নিয়ে তাঁর সরকারের নীতি কোন পথে পরিচালিত হবে। বর্তমান সামরিক শাসিত সরকার এ বিষয়টিকে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দফায় দফায় আহ্বানের পরও সমাধানে আসেনি। বরঞ্চ উল্টো নির্যাতন নিপীড়ন বাড়িয়ে দিয়ে রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানদের দলে দলে দেশান্তরি হতে বাধ্য করেছে। যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিলেও কার্যকর কোন ফল বয়ে আসেনি। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল ও অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মাঝে একটিই প্রশ্ন-রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সুচির ভূমিকা কি হবেÑ তা নিয়ে।

এদিকে, মিয়ানমারের নির্বাচনে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে বিজয়ের খবরে দেশে ফিরে যাবার প্রত্যাশায় উল্লাস করছে কক্সবাজারে দুটি ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। মিয়ানমারের নির্বাচনে এনএলডি বিপুল বিজয়ের সূচনা দেখে আউং সান সুচি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে এ সাফল্যকে তিনি ‘গণতন্ত্রের জাগরণ’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কোন মন্তব্য দলনেত্রীর পক্ষে আসেনি। নির্বাচন কমিশন এখনও ফল ঘোষণা না করলেও গণতন্ত্রপন্থী এনএলডি আশা করছে অর্জিত বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার। দীর্ঘকাল সেনা সমর্থনে ক্ষমতায় থাকা ইউনিয়ন সলিডারিটি এ্যান্ড ডেমোক্রেটিক পার্টির (ইউএসডিপি) ইতোমধ্যে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছে। এনএলডি বিপুল ভোটে জয়ের পথে খবরে সোম ও মঙ্গলবার দু’দিন ধরে টেকনাফ-উখিয়ার দুইটি শরণার্থী ক্যাম্প ও বস্তিতে বসবাসরত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষরা উল্লাস করে চলছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, রাখাইন প্রদেশেও সুচির এনএলডি প্রার্থী জয়লাভ করেছে। যেখানে মুসলমান ভোটারদের আধিক্য রয়েছে।

এদিকে, আরএসও জঙ্গীরা নিরীহ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরে না যেতে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে শুরু করেছে বলে একাধিক সূত্রে খবর পাওয়া গেছে। উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের শরণার্থী মোঃ জুবায়ের, মৌলভী ইউনুছ ও আবদুল গণিসহ অনেকে জানান, অনেক বছর হয়ে গেছে আমাদের শরণার্থী জীবন। এভাবে আর থাকতে ইচ্ছা নেই মোটেও। নিজ ভুমে অর্থাৎ বাপ-দাদার ভিটায় আমরা ফিরে যেতে অপেক্ষার প্রহর গুনছি। আশা করি আউং সান সুচি ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারলে আমাদের সে আশা পূরণ হবে। তবে বড় বাধা আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) ক্যাডার ও ক্যাম্পে ঘাপটি মেরে থাকা তাদের সহযোগীদের। মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে আগ্রহীদের আরএসও ক্যাডাররা প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে থাকে। অতীতেও বহু শরণার্থীকে লাঞ্ছিত করেছে তারা।

সোমবার সকালে ইয়াঙ্গুনে এনএলডির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সমবেত নেতা-কর্মী-সমর্থকদের সামনে এনএলডি মিয়ানমারবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে আউং সান সুচি বলেন, নির্বাচনে ভোটযুদ্ধ শেষ হয়েছে। এতে জনগণ যেভাবে জেগে উঠেছে, তাতে গণতন্ত্রের জাগরণ ঘটেছে। গণতন্ত্রের লড়াইয়ের গৃহবন্দী থাকা নোবেল বিজয়ী সুচির বিজয়ের ঘোষণা দিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলেন, মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত ভোটে প্রায় তিন কোটি ভোটারের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে এনএলডি তথা আউং সান সুচির ভোটের বাক্সে। তাই দ্রুত সরকারী ফলাফল ঘোষণা করার দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

প্রসঙ্গত, বিএনপি সরকার ক্ষমতা থাকাকালীণ ১৯৯১/৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে এদেশে। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে উখিয়া-টেকনাফে ২টি শরণার্থী ক্যাম্পে প্রত্যাবাসন না হওয়ায় পড়ে থাকে প্রায় ২৭ হাজার উদ্বাস্তু। ২৪ বছরে ২টি শরণার্থী ক্যাম্পে জন্মগ্রহণ করেছে আরও ৮ হাজার শিশু। তাছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশ ও নতুন নতুন ঝুপড়ি তৈরি করে বসবাস করছে প্রায় লক্ষাধিক অবৈধ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু। কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম। অন্তত ৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সমস্যা বিরাজ করছে বান্দরবান ও কক্সবাজার ২টি জেলায়। এ পর্যন্তও রোহিঙ্গা সমস্যাটি জিইয়ে রয়েছে দেশে।

সূত্র আরও জানায়, সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বাংলাদেশে অবস্থানকারী একাধিক এনজিও সংস্থার প্রতিনিধির ইন্দনে রোহিঙ্গা সমস্যাটি জিইয়ে রয়েছে দুই যুগ যুগ ধরে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর্যন্ত রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার আমজনতা নীরবে সহ্য করে চলছে রোহিঙ্গাদের নানা অত্যাচার। বর্মীরা স্বদেশে যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেনি, তা এদেশে ভোগ করছে বাংলাদেশী নাগরিকের মতো। চলাফেরা করছে যত্রতত্র। রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার ও বিভিন্ন স্থানে কেউ চ্যালেঞ্জও করে না তাদের। রোহিঙ্গারা কোথাও অন্যায় করেও পার পেয়ে এসে উল্টো নালিশ করে থাকে এনজিও সংস্থায়। শরণার্থী ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী রোহিঙ্গা দরদী এনজিও প্রতিনিধিরা তাদের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে থাকে পুলিশ বিভাগে। হয়রানির ভয়ে দেশীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারা নীরবে সহ্য করে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের অত্যাচার। এনজিও প্রতিনিধিগণ তাদের চাকরি দীর্ঘ মেয়াদী করতে এবং নিয়মিত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গা সমস্যাটি এদেশে জিইয়ে রেখেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

রোহিঙ্গাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ কক্সবাজার জেলার অধিবাসীদের অনেকের মতে, শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘকার ধরে বন্ধ থাকায় বেপরোয়া অবস্থায় রয়েছে রোহিঙ্গারা। এরা বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের অপকর্মে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়ও জড়িয়ে পড়ার ঘটনা রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে অব্যাহত সহিংসতায় বিগত জোট সরকার এবং তত্ত্বাবাধয়ক সরকারের আমলে পুনরায় ঢালাওভাবে অনুপ্রবেশ করে রোহিঙ্গারা। তারা শরণার্থী শিবিরের পাশের পাহাড়ে বস্তি/ঝুপড়ি তৈরি করে অবস্থান নেয়।

ওই সময় কতিপয় মৌলবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ওপার থেকে পালিয়ে আসা পরিবারদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থায় এগিয়ে আসে। এ খবর মিয়ানমারে পৌঁছলে আরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে এদেশে। রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে দাবি রয়েছে, সেদেশে নির্যাতিত হয়ে তারা পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। তবে এসব রোহিঙ্গাদের কারণে এ অঞ্চলের উখিয়া-টেকনাফের আমজনতা যে বিভিন্ন নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন, এ খবর রাখার যেন কেউ নেই।