১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আঠারোর আগেই দেশের ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়

  • প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা রিপোর্টে তথ্য

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই দেশের ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে বিয়ে হয় ২৭ শতাংশ মেয়ের। ছেলেদের ক্ষেত্রে একই হার মাত্র ২.৮ শতাংশ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার বেশ উদ্বেগজনক। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মেয়ে শিশুসহ অন্য সকলের বাল্যবিবাহ এলাকাবাসী, মেয়ের বাবা-মা এবং এমনকি মেয়ে শিশু নিজেও সমর্থন করছে। বাল্যবিবাহের বিদ্যমান এই উচ্চহারের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মেয়েদের ক্ষেত্রে শিক্ষার সুযোগ, অর্থনৈতিক সুযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব এবং সেই সঙ্গে চরম দারিদ্র্য, দুর্বল বিচার ব্যবস্থা ও আইনপ্রয়োগ প্রক্রিয়া। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো জরিপ এলাকায় পুরুষের দ্বারা যৌন নির্যাতন ও চরম জেন্ডার অসমতাকে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা ও যৌক্তিক বলে মেনে নেয়া বাল্যবিবাহের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বেসরকারী সংস্থা ‘প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল’ আয়োজিত ‘বাল্যবিবাহের অন্তর্নিহিত কারণ ও প্রভাবক’ বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনের ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়।

‘প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালে’র কান্ট্রি ডিরেক্টর সেনেত গ্যাব্রিজিবারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি প্রধান অতিথি এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম, ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার বেনুত পিরে লারামি ও ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ আর্জেন্টিনা পিনতো মেটাভাল পিছিন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানে ড. মিজানুর রহমান বলেন, বাল্যবিবাহ আমাদের সমাজ জীবনে একটা অভিশাপ। আজকের এই গবেষণা প্রতিবেদন নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এটা প্রমাণ করে দেশে শিশুদের অধিকার কিভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। তবে গবেষণায় পশ্চিমা প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, গবেষণার নামে কোন কিছুকে চাপিয়ে দিলেই হবে না। তাহলে সেটা আমাদের সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার পথ আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলবে। প্রতিটা সমাজেই কিছু নৈতিক, সামজিক মূল্যবোধ থাকে। কোন গবেষণায় যদি সেই সমাজের মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো না হয় তবে এমন গবেষণা দরকার নেই।

ড. মিজান বলেন, রাষ্ট্রকে তার প্রতিটা নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে হবে। যদি কোন মেয়ে রাস্তায় বের হতে না পারে, স্কুল-কলেজে যেতে না পারে, বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকার হতে হয় তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে না। আর এসবের কারণে মেয়ে শিশুদের দ্রুত বিয়ে হয়। সরকার যদি এগুলো বন্ধ করতে না পারে তবে বলতে হবে শিশু বিয়ে রোধে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বাল্যবিবাহের মাধ্যমে মেয়েদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়। বাল্যবিবাহ রোধে তৃণমূল পর্যায়ে নারী শিক্ষা প্রসার ঘটাতে হবে। ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে মানুষকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে বাল্যবিবাহসহ সমাজের সব ধরনের সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক মার্ক পিয়ার্স বলেন, সমাজে বিরাজমান বাল্যবিবাহের পেছনে রয়েছে গভীরভাবে বদ্ধমূল লিঙ্গবৈষম্য। কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়, মেয়েদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বাল্যবিবাহের ঘটনায় শক্ত ভূমিকা রাখে। বাল্যবিবাহের গ্রহণযোগ্যতা ও এর প্রতি সমাজের মনোভাব পরিবর্তন কোন দূরবর্তী বা অসম্ভব চ্যালেঞ্জ নয়; শিক্ষা, আর্থিক ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং আরও কঠোর ও জোরদার আইনী কাঠামো মিলিতভাবে বাল্যবিবাহের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যাপকতার মাত্রায় একটি বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

অনুষ্ঠানের আয়োজকরা জানান, আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোর‌্যাম ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় এই গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তিনটি দেশের বাবা-মা, সামাজিক নেতৃবৃন্দ ও শিশুদের মধ্যে পরিচালিত অসংখ্য সমীক্ষা ও সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে বাল্যবিবাহের অন্তর্নিহিত কারণসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রতিবেদনে সুপারিশমালা তুলে ধরা হয়েছে। এ প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার নির্দিষ্ট কিছু স্থানে দুই হাজার ৭৪২ জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৭৯০, ইন্দোনেশিয়ায় ৭৭১ ও পাকিস্তানে ১১৮১ জরিপ করা হয়। জরিপে অংশ নেয়া সকলেই ১৮ বছরের নিচে তরুণ-তরুণী।

গবেষণায় দেখা গেছে, এখনও সমাজের গভীরের প্রচলিত প্রাচীন ও সনাতন ধারণার কারণে বেশিরভাগ মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার গ্রামাঞ্চলে বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের হার বেশ উদ্বেগজনক। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সের মেয়ে শিশু-সহ অন্য সকলের বাল্যবিবাহ এলাকাবাসী, মেয়ের বাবা-মা এবং এমনকি মেয়েশিশু নিজে সমর্থন করছে।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী ১৭ বছর বয়সী বাংলাদেশী একজন মেয়ে বলেছেন, যদি একটি মেয়ে বিয়ে না করে তবে আশপাশের মানুষ তার স¤পর্কে নানা বাজে কথা ছড়াতে শুরু করে। মেয়েটি একসময় তার সামাজিক সম্মান হারায় এবং মানুষ মনে করে নিশ্চয়ই তার প্রেমঘটিত কোন বিষয় রয়েছে। কিন্তু একটি ছেলের ক্ষেত্রে এটি তেমন কোন বিষয়ই নয়, সে ইচ্ছে করলেই বিয়ে না করে একা থাকতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৮ শতাংশ বিবাহিত মেয়েদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হার ৩.৭ শতাংশ। তিন দেশের মধ্যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে সবনিম্ন স্তরে রয়েছে পাকিস্তানে। ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে ৩৪.৮ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় এবং ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগে ১৫.২ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। পাকিস্তানে ছেলেদের ক্ষেত্রে শিশুবিবাহের হার ১৩ শতাংশ এবং এই হার যথেষ্ট উদ্বেগজনক। গবেষণায় একটি জনগোষ্ঠীতে শিক্ষার হার (সন্তান ও বাবা-মা উভয়ের), উপার্জন, অর্থনৈতিক সুযোগ, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির সুযোগ এবং সামাজিকভাবে বাল্যবিবাহে সমর্থন প্রদানের প্রবণতা- এসবের মধ্যে সরাসরি সংযোগ খুঁজে পাওয়া গেছে। উল্লিখিত সুযোগগুলো প্রাপ্তির হার বৃদ্ধি পেলে তা বাল্যবিবাহের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করে। তিনটি দেশেই বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সরকার এবং প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি, সমাজ ও পারিবারের সঙ্গতিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদী হস্তক্ষেপ বাল্যবিবাহের গ্রহণযোগ্যতার মাত্রায় একটি ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।