২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুসলিমদের মন্দের ভাল

  • আউং সান সুচির বিজয়;###;মিয়ানমার নির্বাচন

হাসান নাসির ॥ প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের নির্বাচনে বিপুল জয় অনেকটাই সুনিশ্চিত আউং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি)। ইতোমধ্যেই পরাজয় মেনে নিয়েছে সামরিক সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি ডেভেলপমেন্ট পার্টি। নির্বাচনে সুচির জয়-পরাজয়ে সেদেশে বসবাসকারী ভোটাধিকারবিহীন মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভূমিকায় যদিও তেমন কিছু যায়-আসেনি, তথাপি বেশ উল্লসিত তারা। কারণ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের নাগরিক স্বীকৃতি কিংবা জীবনমান উন্নয়নে কোন সুস্পষ্ট আশ্বাস না মিললেও তারা মানবিক আচরণ আশা করছে গণতান্ত্রিক এই নেত্রীর কাছ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে দলিত এই জনগোষ্ঠী ফিরে পাবে কি তাদের নাগরিক অধিকার? সেই আশায় হয়ত গুড়েবালি। কিন্তু তারপরও আশা করতে দোষ কী? শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের নির্বাচিত নতুন সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তরিক হবে কিনা তা নিয়ে বাংলাদেশেও রয়েছে নানা আলোচনা। শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিতসহ ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বসতি গেড়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার অঞ্চল শীর্ষে।

মিয়ানমারের মুসলিমদের একটি বিশাল অংশের ভোটাধিকার না থাকলেও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সাধারণ নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। এটি অনেকটা অথৈ জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচতে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। জান্তা সরকার আমলে দীর্ঘসময় নিপীড়িত এবং অধিকারবঞ্চিত এই জনগোষ্ঠী আউং সান সুচির কাছ থেকে অধিকার ফিরে পাওয়ার আশ্বাস পায়নি। এরপরও ভোটে সম্ভব না হলেও সুচির দলকে মনেপ্রাণে চাওয়া মূলত মন্দের ভাল হিসেবে সমর্থন জানানো। তবে সুচির বিজয়ে তাদের আদৌ কোন লাভ হলো কিনা তা বোঝা যাবে অল্প সময়ের মধ্যেই।

বাংলাদেশের মতো ভারত ও মিয়ানমারেও ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম একটি ফ্যাক্টর। এই তিন দেশে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেয়া বক্তব্যে ভোটের হেরফের হয়। ফলে নির্বাচনী এলাকা বুঝে বক্তব্য রাখেন প্রার্থী ও নেতারা। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো মিয়ানমারে নির্বাচনের ফলাফলে সংখ্যালঘু ভোট ততটা নিয়ামক নয়। সেখানে সংখ্যালঘু অর্থাৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী খুবই ছোট। আর ভোটাধিকার বিবেচনায় সংখ্যালঘুরা এতটাই নগণ্য যে, তারা ভোটের ফলাফলে প্রভাব রাখার মতো নয়। তারপরও সুচির জয়ে আশান্বিত সংখ্যালঘুরা, যারা মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা চার ভাগেরও কম। অধিকার বঞ্চিত রোহিঙ্গাদের আশার কারণ শুধু সুচির বক্তব্যের একটি অংশ, যেখানে তিনি জাতিগত সংঘাত ও ধর্মীয় বঞ্চনার হাত থেকে দেশের জনগণকে রক্ষা করার ওপর জোর দিয়েছেন। সেই আশ্বাসও কেবলই ভোটের রাজনীতি কিনা তা পরিষ্কার হতে বেশি সময় লাগবে না।

এনএলডি নেত্রী আউং সান সুচি রাখাইন প্রদেশে এক নির্বাচনী জনসভায় বলেছেন, জাতিগত ও ধর্মীয় বঞ্চনার হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করা জরুরী। শান্তি ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে সব মানুষকে এক হতে হবে। একে অপরের প্রতি ঘৃণা ও ভীতি প্রদর্শন কোন সফলতা বয়ে আনবে না। নেত্রীর দীর্ঘ বক্তব্যে সংখ্যালঘুদের জন্য আশার বাণী শুধু এটুকুই।

মিয়ানমার বৌদ্ধ প্রধান দেশ। সঙ্গতকারণেই ভোটের রাজনীতিতে অসুবিধা হবে ভেবে নেতা-নেত্রীদের মুখ থেকে অধিকারবঞ্চিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্য কল্যাণকর কোন আশ্বাসবাণী শোনা যায় না। নোবেল বিজয়ী নেত্রী আউং সান সুচিকে অত্যন্ত প্রগতিশীল হিসেবে মনে করা হলেও তিনিও ছিলেন এক্ষেত্রে বেশ হিসাবী। দীর্ঘ ২৫ বছর পর অনেক প্রতীক্ষার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। সামরিক সমর্থিত এতদিনকার সরকারী দলটি সাম্প্রদায়িক আচরণের মাধ্যমে সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। মুসলিম জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে এমন কোন উল্লেখ করার মতো সম্প্রদায় নয় যে, এর পক্ষে বক্তব্য রেখে ভোট বাড়ানো যাবে। ফলে গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে বিশ্বে পরিচিত সুচিও সেদিকে যাননি। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপরে নির্যাতন এবং একান্ত বাধ্য হয়ে সাগরপথে হাজার হাজার রোহিঙ্গার নিদারুণ কষ্টকর অভিবাসন প্রচেষ্টা সারাবিশ্বকে নাড়া দিলেও নিশ্চুপ ছিলেন এই নেত্রী।

মিয়ানমারে নির্বাচনে আউং সান সুচির দল এনএলডি থেকে কোন মুসলমান প্রার্থীকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। যদিও অনেক আগে থেকে মিয়ানমারে বসবাসকারী মুসলিমদের মধ্যে এনএলডির বেশ ক’জন নেতাও রয়েছেন, যারা সামরিক সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে জেল-জুলুম সহ্য করেছেন। বিশেষ করে মিয়ানমারে ইয়াঙ্গুনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম ভোটারের বসবাস। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, সিটু মং নামের দীর্ঘ কারাভোগকারী মুসলিম নেতাকে নিয়ে আশান্বিত ছিল মুসলমানরা। ইয়াঙ্গুন আসনে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি নিশ্চিত জয়লাভ করবেন এমন দৃঢ় বিশ্বাস ছিল এই নেতার, যা তিনি বিদেশী গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন। কিন্তু তাকেও মনোনয়ন দেয়া হয়নি শুধু পুরো দেশের ভোটের রাজনীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে। এতে আশাহত সংখ্যালঘুরা।