১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাঁটগার পঞ্চরতেœর ইতিকথা

  • রুমেল খান

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। সেখানকার কাজী দেউরিতে অবস্থিত এমএ আজিজ স্টেডিয়াম। সেখানে বরাদ্দ করা কয়েকটি রুম নিয়ে সপরিবারে বাস করেন এক ক্রীড়াপ্রেমী ব্যক্তি। নাম সৈয়দ সরওয়ার আলম। তিনি চাকরি করেন চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রশাসনিক অফিসার পদে। তার দৃঢ়বিশ্বাস- খেলাধুলা হচ্ছে সবচেয়ে নির্দোষ বিনোদন। আরও মানেন- যে খেলাধুলা পছন্দ করে না, সে কোন পূর্ণাঙ্গ মানুষ নয়। স্বপ্ন দেখেন- খেলাধুলার মাধ্যমেই দূর হবে দেশের নেতিবাচক, কলুষিত, অপসংস্কৃতিসহ সব অন্ধকার দিক। গড়ে উঠবে সুস্থ সমাজ। খেলাধুলার সাফল্য দিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।

সরওয়ার সাহেব চাইলেই তো দেশের সব ছেলেমেয়েকে খেলাধুলায় এনে বিপ্লব ঘটাতে পারবেন না। তা না পারুন, যতটা সম্ভব, ততটাই করে যাচ্ছেন তিনি। সেটা কিভাবে? তার কাছে আছে অপার সম্ভাবনাময় পাঁচ প্রতিভাবান মানুষ। যারা তার সন্তান। এদের ঘঁষে মেজে তিনি পরিণত করতে চান মূল্যবান হীরায়। কার্বন দিয়ে যেভাবে হীরা তৈরি করা যায়, তেমনি খেলাধুলায় দীক্ষিত করে, তার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করে দেশ ও জাতিকে কিছু দিয়ে তাদের তৈরি করতে চান একেক জন খ্যাতিমান ক্রীড়াবিদ হিসেবে।

সরওয়ার সাহেবের গৃহিণী স্ত্রী কাজী সালেহা বেগম নিঃসন্দেহে একজন গর্বিত মা। তার পাঁচ সন্তানের সবাই খেলোয়াড়। তিন ছেলে খেলে ব্যাডমিন্টন (শাটলার), বাকি দুই মেয়ে শূটার। প্রথমজন সৈয়দ সালেহ মোঃ সাজ্জাদউল্লাহ্। সে আন্তর্জাতিক ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। দ্বিতীয়জন সৈয়দা সাদিয়া সুলতানা, আন্তর্জাতিক শূটার। তৃতীয়জন সৈয়দা সায়মা সুলতানা, জাতীয় শূটার। চতুর্থজন সৈয়দ শাকের মোঃ সিবগাতউল্লাহ্, আন্তর্জাতিক জুনিয়র ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়। পঞ্চমজন সৈয়দ সাদিক মোঃ সিফাতউল্লাহ গালিব, ব্যাডমিন্টন খেলায় কিছুদিন হলো হাতেখড়ি হয়েছে তার।

সাজ্জাদকে দিয়েই একে একে সংক্ষেপে বয়ান করা যাক চাঁটগার এই পঞ্চরতেœর ইতিকথার। ব্যাডমিন্টন খেলাটা সে শুরু করে ২০০৩ সাল থেকে। জাতীয় পর্যায়ে প্রথম খেলে ২০০৫ সালে। এত খেলা থাকতে ব্যাডমিন্টন কেন? মালয়েশিয়ার বিশ্বখ্যাত শাটলার লি চং ওয়েকে আদর্শ মানা সাজ্জাদের জবাব, ‘এ খেলাটকে মনে হয়েছে হাই-সোসাইটির গেম, যা সবাই খেলতে পারে না। তাছাড়া আমাদের এখানে ব্যাডমিন্টন খেলার পরিবেশ-আবহ সবসময়ই ছিল, ফলে এ খেলাটিতে আকৃষ্ট হই।’ ১৯৯১ সালের ১৯ মে জন্ম নেয়া সাজ্জাদের এ খেলায় আসার নেপথ্যে ছিল তার মা-বাবার শতভাগ সমর্থন-উৎসাহ। তবে একটা পর্যায়ে এই খেলার ব্যয় সামলাতে না পেরে ছেলেকে খেলাটা ছেড়ে দিতেও বলেছিলেন বাবা! সেটা ২০০৭ সাল। তখন সাজ্জাদের কোচরা তার বাবাকে অনুরোধ করেন একটা বছর সময় দিতে। ভাগ্যিস সরওয়ার দিয়েছিলেন, নইলে সাজ্জাদের সাফল্যগুলো কি এভাবে আসত এবং তার বাবার মতের পরিবর্তন হতো? ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে গিয়ে খেলা সাজ্জাদের সাফল্যগুলো হচ্ছে এ রকম : ২০০৫ সালে জাতীয় অনুর্ধ ১২ চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন (একক), ২০০৬ সালে অনুর্ধ ১৪ তে চ্যাম্পিয়ন (একক), ২০০৭ সালে অনুর্ধ ১৮ তে রানার্সআপ (দ্বৈরথে), ২০০৮ সালে অনুর্ধ ১৯ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে এককে চ্যাম্পিয়ন ও মূলপর্বে দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত খেলা, একই বছর বিজয় দিবস টুর্নামেন্টে এককে চ্যাম্পিয়ন ও দ্বৈরথে রানার্সআপ, ২০১১ সালে জাতীয় সিনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে দ্বৈরথে চ্যাম্পিয়ন, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ গেমসে মিশ্র দ্বৈরথে স্বর্ণপদক, এককে ও দ্বৈরথে তাম্রপদক এবং ২০১৫ সালে জাতীয় লীগে এককে রানারআপ হওয়া।

সাজ্জাদের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য দুই দফায় (২০১০ ও ২০১৩) মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত দেওয়ান নিউ ভিশন ব্যাডমিন্টন একাডেমিতে যাওয়া। তবে সেটা শুধু শাটলার হিসেবেই নয়, একজন জুনিয়র কোচ হিসেবেও! এটা সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশের নিট কনসার্ন গ্রুপের কল্যাণে। ‘ওখানে আমার ব্যাপক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যা শিখেছি, তা কাজে লাগিয়ে নিজের খেলাকে আরও শাণিত তো করবই, সেই সঙ্গে এদেশের জুনিয়র শাটলারদেরও সবকিছু শেখাতে চাই।’ নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানায় সাজ্জাদ। শূটার সাদিয়া। চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টের বন্দুকধারী। জন্ম ৫ ডিসেম্বর, ১৯৯৩। কীর্তির বিচারে সে ছাপিয়ে গেছে বাকি ভাই-বোনদের। শূটিংয়ের বদৌলতে সে শুধু চট্টগ্রামেরই নয়, পুরো বাংলাদেশেরই গর্ব। তার সাফল্য শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিম-লেও বিস্তৃত। শূটিং অঙ্গনে ‘ভদ্র ও শান্ত মেয়ে’ খ্যাত সাদিয়ার সাফল্যের সূচনা ২০০৮ সালে জাতীয় শূটিং চ্যাম্পিয়নশিপের জুনিয়র বিভাগে তাম্রপদক জিতে। সে বছরই জাতীয় শূটিয়ে জুনিয়র বিভাগে স্বর্ণপদক জেতে সে। তারপর ২০০৯ সালে সাফ শূটিং চ্যাম্পিয়নশিপে দলগত স্বর্ণ, জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়শিপে রৌপ্য, ২০১০ ঢাকায় অনুষ্ঠিত এসএ গেমসে এককে রৌপ্য এবং দলীয়ভাবে স্বর্ণ (সঙ্গে ছিলেন শারমিন আক্তার রতœা ও তৃপ্তি দত্ত) জেতেন। শেষের সাফল্যটি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ক্লাস সেভেনের ইংরেজী (ইংলিশ ফর টুডে) পাঠ্যবইয়ে সাদিয়া-রতœা-তৃপ্তির এই সাফল্যের প্রতিবেদনের একাংশ এবং তাদের ছবি ছাপা হয়। এমন বিরল সৌভাগ্য আর কজনার হয়?

এখানেই থেমে যায়নি সাদিয়া। আরও সাফল্য আছে তার। ২০১০ সালেই জেতে আরেকটি দলীয় স্বর্ণপদক (ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শূটিং চ্যাম্পিয়নশিপে) এবং এককে রৌপ্যপদক। সেবারই জাতীয় শূটিং চ্যাম্পিয়নশিপে জুনিয়র বিভাগে লাভ করে রৌপ্যপদক। জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে পায় তাম্র। ২০১২ সালে জাতীয় শূটিং চ্যাম্পিয়নশিপে রৌপ্য এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ গেমসে স্বর্ণ।

ভারত, সিঙ্গাপুর, কাতার, কুয়েত, চীন, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইরান, স্কটল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে সবমিলিয়ে শূটিংয়ের সুবাদে ১৪ বার যাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাদিয়া আগামীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সাফল্য পাবে বলেই দৃঢ়বিশ্বাস সরওয়ার দম্পত্তির।

সাদিয়ার পর আরেক বন্দুককন্যা সৈয়দা সায়মা সুলতানা। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। এই প্রতিভাময়ী শূটারের গোলাবারুদের খেলাটিতে অভিষেক ২০০৪ সালের ২৩ জুন, বড় বোন সাদিয়ার সঙ্গেই, চট্টগ্রাম রাইফেল ক্লাবের হয়ে। ১৯৯৫ সালে জন্ম নেয়া সায়মার-ও ইভেন্ট ১০ মিটার এয়ার রাইফেল। এই ইভেন্টে তার উল্লেখযোগ্য ফলগুলো হলো : ২০১২ সালে আন্তঃস্কুল শূটিংয়ে চতুর্থ, ওই বছরই জাতীয় শূূটিং প্রতিযোগিতায় (জুনিয়র) তাম্র, ২০১৪ সালে জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে (জুনিয়র) সপ্তম এবং ২০১৫ সালে জাতীয় শূটিং প্রতিযোগিতায় অষ্টম স্থান অধিকার করা। শূটিংয়ে তার আদর্শ? সাদিয়া।

পরের জন সিবগাত। পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম জেলা অনুর্ধ ১৬ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা করায়ত্ত করেছে একক ও দ্বৈরথে উভয় বিভাগেই। শুধু তাই নয়, ওই বছরই সে নেপালে অনুষ্ঠিত অনুর্ধ ১৫ আন্তর্জাতিক জুনিয়র ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় এককে জিতেছে তাম্রপদক। সর্বশেষ জিতেছে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ছাত্র ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতার একক শিরোপাও।

সর্বকনিষ্ঠজন ভারি মিষ্টি চেহারার এবং অসম্ভব লাজুক। গালিব। সে-ও বড় দুই ভাইকে দেখে তাদের পথেই হাঁটছে। লাজুক হলেও র‌্যাকেট হাতে অবশ্য তেমনটা মনে হয় না। পড়ে ক্লাস থ্রিতে। সবেমাত্র খেলা শুরু করেছে। নিচ্ছে প্রশিক্ষণ। যখনই কোচিংপর্ব শেষ হবে, তখনই হয় তো গালিবকেও দেখা যাবে অগ্রজদের মতোই বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এবং তাতে শীর্ষস্থান অধিকার করতে।

সরওয়ার-সালেহার এই প্রতিভাবান, মেধাবী পাঁচ খেলোয়াড় ছেলেমেয়ে তাদের স্বীয় নৈপুণ্যে প্রজ্বলিত হয়ে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্বল করুক, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিক ... এটাই ক্রীড়ানুরাগীদের একান্ত নিগূঢ় প্রত্যাশা।