২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইরাকে মার্কিন-ইরান প্রতিযোগিতা

  • মুসান্না সাজ্জিল

বিশ্ববাসীর সবার দৃষ্টি এখন সিরিয়ার দিকে। কিন্তু এর পাশের দেশ ইরাকে কি ঘটছে? সেখানে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে। দু’পক্ষই দেখাতে চায় যে ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কে ইরাকীদের অধিকতর শক্তিশালী মিত্র।

ইরাকে কয়েক মাস ধরে অচলাবস্থা বিরাজ করার পর হালে আইএসবিরোধী লড়াই তীব্রতর রূপ ধারণ করেছে। কোয়ালিশন ইরাকী বিমানবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট ইরাকী সেনা, পুলিশ ও কিছু উপজাতীয় যোদ্ধার মিলিত বাহিনী ৭ অক্টোবর বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বাগদাদের পশ্চিমে সুন্নি প্রধান আনবার প্রদেশের রাজধানী শহর রামাদি ঘিরে ফেলে শেষ পর্যন্ত সেটি পুনর্দখল করে নেয়। গত মে মাসে আইএসের হাতে এই নগরীর পতন ঘটেছিল।

গত ১৫ অক্টোবর হাশিদ আল শাবি নামে পরিচিত ইরান সমর্থিত ১০ হাজার শিয়া মিলিশিয়া সদস্যের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ইরাকী সৈন্য ও পুলিশ কোয়ালিশন বাহিনীর কিছু বিমান হামলার ছত্রছায়ায় বাইজি তেল শোধনাগার পুনর্দখলের অভিযান শুরু করে এবং ২৪ অক্টোবর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। শোধনাগারটি নিয়ে কয়েক মাস ধরে লড়াই চললেও এতদিন তার নিষ্পত্তি হচ্ছিল না। এক সময়ের দেশের বৃহত্তম এই শোধানাগারটির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে। তথাপি এটি বাগদাদ এবং আইএস অধিকৃত মসুলের মাঝামাঝি অবস্থিত হওযায় এই শোধনাগার ও নিকটবর্তী শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বলাবাহুল্য, ১৮ মাস আগে উত্তর ও পশ্চিম ইরাকে আইএস-এর ঝটিকা আক্রমণের মুখে ২ ডিভিশন ইরাকী সৈন্য ছত্রখান হয়ে পালিয়েছিল। আইএস দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মসুল দখল করে বাগদাদের কাছাকাছি চলে এসেছিল। হালে সেই বিপর্যস্ত ইরাকী বাহিনীকে পুনর্গঠিত করা হয়েছে। তাছাড়া আক্রমণে নতুন কিছু কৌশলও যুক্ত হয়েছে। যেমন প্রায় আড়াই শ’ কিলোমিটার ব্যবধানে থাকা দুই স্থানে একই সময় বড় ধরনের যুগপৎ হামলা চালানো হয়েছে। এতে আইএস তার শক্তিকে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে তাদের পরাভূত করা সহজতর হয়েছে। তাছাড়া হাশিদ আল শাবি মিলিশিয়া ও সরকারী বাহিনী হামলার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এটাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ইরান সমর্থনপুষ্ট শিয়া মিলিশিয়ারা সেই মে মাসের শেষ ভাগ থেকে বাগদাদের উত্তরে সালাহউদ্দীন প্রদেশে তাদের শক্তি কেন্দ্রীভূত করে চলেছে এবং মোটামুটি স্বাধীনভাবে তৎপরতা চালিয়ে আসছে। কিছু সুন্নি উপজাতিও সেখানে হাশিদ আল শাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে মার্কিনীদের চাপে প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি এই শিয়া মিলিশিয়াদের ভূমিকা সীমিত করার চেষ্টা করছেন।

আমেরিকানরা এখন এমন সামরিক সাফল্য অর্জন করতে চাইছে যেখানে ইরানের কোন কৃতিত্ব দাবি করার উপায় নেই। সেজন্য তারা আনবার প্রদেশে আইএস অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করে তুলেছে। অক্টোবরের তিন সপ্তাহে দেড় শ’ বার বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

পেন্টাগন এবং সেগুলোর বেশির ভাগই নাকি চালান হয়েছে রামাদির আশপাশে। এছাড়া ২২ অক্টোবর আমেরিকার স্পেশাল ফোর্স কুর্দি বাহিনী পেশমার্গারের কয়েকটি ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক দুঃসাহসী অভিযান চালিয়ে উত্তরের হাবিজা শহরের কাছে আইএস’র হাতে বন্দী ৬৯ জনকে মুক্ত করেছে। আইএস নাকি এই বন্দীদের হত্যা করার আয়োজন করেছিল।

স্পষ্টতই ইরাকে আমেরিকার আইএসবিরোধী তৎপরতা বেড়ে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইরাকে কোন পদাতিক সৈন্য না পাঠানোর যে অঙ্গীকার ওবামা করেছিলেন তা এখন সংশোধন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বিমান হামলা চালিয়ে হোক কিংবা স্থলভাগে সরাসরি অভিযান চালিয়ে হোক, আইএসবিরোধী এ ধরনের মিশন পরিচালনায় মার্কিন বাহিনী থাকবে। এ থেকে পিছু হটবে না।

লক্ষ্য করার ব্যাপারে হলো, ইরান ও সিরিয়ার সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা সমন্বয় সেল প্রতিষ্ঠার জন্য গত মাসে বাগদাদে রুশদের আক্রমণের পর থেকে আমেরিকার এই তৎপরতা বেড়ে গেছে। সিরিয়ায় রাশিয়া কি করতে চাইছে না চাইছে এই নিয়ে আমেরিকা এতই ভাবিত যে, সবচেয়ে সিনিয়র মার্কিন অফিসার মেরিন জেনারেল জো ডানফোর্ডকে গত ২০ অক্টোবর ইরাকে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, রাশিয়া যদি নিজ থেকে বিমান হামলা চালান শুরু করে তাহলে আমেরিকা ইরাককে বর্তমান পর্যায়ের সামরিক সাহায্য সমর্থন অব্যাহত রাখতে পারবে না। একথা বলার উদ্দেশ্য ইরাক সরকারকে একথা স্মরণ করিয়ে দেয়া যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন আইএস’র বিরুদ্ধে তাদের অপরিহার্য মিত্র। তবে ইরাকীরাও যে মার্কিন মিত্রতা কামনা করে তার প্রমাণ দেয়ার জন্য ইরাকী বাহিনীকেও আইএস বিরোধী লড়াইয়ে দ্রুত ও চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে হবে। ইরানের প্রক্সি মিলিশিয়ারা যতই রণাঙ্গনে সফল হবে ততই ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর ওপর মার্কিন চাপ বাড়বে।

ইরাকে এখন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মার্কিন সামরিক প্রশিক্ষক রয়েছে। তবে তারা মূলত নিজ নিজ ঘাঁটিতেই আবদ্ধ। তথাপি তাদের হাতে পুনর্গঠিত ইরাকী বাহিনী আইএসবিরোধী অভিযানে সম্প্রতি যে সাফল্য অর্জন করেছে তা তাদের মনোবল রাখতে যেমন সাহায্য করবে তেমনি আমেরিকাও ইরানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠবে।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট